আমাকে প্রমাণ করতেই হবে, মেয়েরাও পারে...

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নারী ক্রীড়াবিদদের পথচলা আজ যতটা সহজ, একসময় তা ছিল না। সেই কঠিন সময়ে যিনি নিজের প্রতিভা, পরিশ্রম আর সাহস দিয়ে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন, তিনি জোবেরা রহমান লিনু। টেবিল টেনিসে ১৬ বার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়ে তিনি গিনেস বুকে গড়েছেন অনন্য রেকর্ড। খেলোয়াড় হিসেবে যেমন সফল হয়েছেন, তেমনি সংগঠক, সমাজকর্মী ও লেখক হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সম্প্রতি তার আত্মজীবনী ‘জীবনজালের এপার-ওপার’ প্রকাশের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছেন তিনি। খেলাধুলা, সংগ্রাম, নারীজীবন, সাহিত্যচর্চা ও বাংলাদেশের ক্রীড়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছেন

দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ওমর ফারুক রুবেল

দেশ রূপান্তর : আপনার শৈশবের শুরুটা কেমন ছিল? খেলাধুলার প্রতি আকর্ষণ কীভাবে তৈরি হলো?

জোবেরা রহমান লিনু : আমার শৈশবটা ছিল খুবই প্রাণবন্ত। বাবার চাকরির কারণে দেশের বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হয়েছে। কাপ্তাইয়ের পাহাড়, সিলেটের সবুজ, ঢাকার ব্যস্ততা সব মিলিয়ে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। ছোটবেলা থেকেই খুব চঞ্চল ছিলাম। মেয়েরা যে শুধু ঘরে থাকবে এই ধারণা আমার পরিবারে ছিল না। বাবা বরং উৎসাহ দিতেন। খেলাধুলার প্রতি আগ্রহটা সেখান থেকেই। টেবিল টেনিসের সঙ্গে পরিচয়টা অনেকটা হঠাৎ করেই। প্রথমে মজা করে খেলতাম। পরে বুঝলাম, এই খেলাটার মধ্যে গতি আছে, বুদ্ধি আছে, কৌশল আছে। তখন থেকেই স্বপ্ন দেখা শুরু।

দেশ রূপান্তর : অল্প বয়সেই জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য। তখনকার অনুভূতি কেমন ছিল?

লিনু : সত্যি বলতে, তখন এত কিছু বুঝতাম না। শুধু খেলতে ভালো লাগত। কিন্তু যখন জাতীয় পর্যায়ে খেলতে শুরু করলাম, তখন বুঝলাম দায়িত্বও আছে। দেশের মানুষ আমাকে চিনতে শুরু করল। ছোট্ট একটা মেয়ে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে, এটা তখন বড় খবর ছিল। আমার মনে আছে, প্রথমবার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর বাসায় আত্মীয়স্বজনের ভিড় লেগে গিয়েছিল। সবাই বলছিল, ‘মেয়েটা একদিন অনেক বড় হবে।’ তখন হয়তো বুঝিনি, কিন্তু এখন মনে হয়, মানুষের সেই বিশ্বাসই আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।

দেশ রূপান্তর : নারী ক্রীড়াবিদ হিসেবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?

লিনু : চ্যালেঞ্জ ছিল অনেক। এখনকার মেয়েরা যেসব সুবিধা পায়, তখন তার কিছুই ছিল না। অনুশীলনের জায়গা কম, আন্তর্জাতিক এক্সপোজার কম আর সামাজিক বাধা তো ছিলই। মানুষ অনেক সময় খেলাধুলাকে মেয়েদের জন্য ‘উপযুক্ত’ মনে করত না। অনেকেই বলত, ‘মেয়েমানুষ হয়ে এত খেলাধুলা কেন?’ কিন্তু আমি কখনো এসব কথায় থেমে যাইনি। বরং মনে হতো, আমাকে প্রমাণ করতেই হবে, মেয়েরাও পারে। সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল মানসিক শক্তি ধরে রাখা। কারণ প্রতিভার চেয়ে বেশি দরকার হয় স্থিরতা।

দেশ রূপান্তর : আপনি একই সময়ে সাইক্লিংয়েও জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য পেয়েছিলেন। কীভাবে সম্ভব হয়েছিল?

লিনু : (হাসি) এখন ভাবলে আমিও অবাক হই। আসলে আমি সবসময় নিজেকে চ্যালেঞ্জ দিতে পছন্দ করতাম। শরীরকে ফিট রাখতে সাইক্লিং করতাম। পরে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ এলো। তখন ভাবলাম, চেষ্টা করে দেখি। আমার কাছে খেলাধুলা মানে ছিল স্বাধীনতা। টেবিল টেনিস আর সাইক্লিং, দুটো খেলাই আমাকে সেই স্বাধীনতার অনুভূতি দিয়েছে।

দেশ রূপান্তর : আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলার অভিজ্ঞতা কতটা ভিন্ন ছিল?

লিনু : অনেক ভিন্ন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গিয়ে প্রথম বুঝলাম, খেলাধুলা শুধু প্রতিভা দিয়ে হয় না, এটার সঙ্গে জড়িত বিজ্ঞান, পরিকল্পনা, পুষ্টি, মনস্তত্ত্ব সবকিছু। জাপানে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে গিয়ে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম তাদের শৃঙ্খলা দেখে। খেলোয়াড়রা কীভাবে নিজেদের  তৈরি করে, সেটা আমাদের জন্য বড় শিক্ষা ছিল। একটা সময় মনে হয়েছিল, বাংলাদেশ যদি ঠিকভাবে পরিকল্পনা করে, তাহলে আমাদের মেয়েরাও বিশ্বমানের খেলোয়াড় হতে পারবে।

দেশ রূপান্তর : দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এমন কোনো মুহূর্ত আছে, যা এখনো আপনাকে আবেগপ্রবণ করে?

লিনু : অনেক আছে। তবে জাতীয় পতাকা হাতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়ানোর অনুভূতি আলাদা। তখন মনে হয়, আপনি শুধু একজন ব্যক্তি নন, আপনি পুরো দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। আরেকটা মুহূর্ত কখনো ভুলব না, যখন ছোট ছোট মেয়েরা এসে বলত, ‘আপুকে দেখে আমরা খেলতে শুরু করেছি।’ এই ভালোবাসার কোনো তুলনা নেই।

দেশ রূপান্তর : খেলোয়াড় থেকে সংগঠক হওয়ার যাত্রাটা কেমন ছিল?

লিনু : খেলোয়াড়ি জীবন একসময় শেষ হয়। কিন্তু খেলাধুলার প্রতি ভালোবাসা তো শেষ হয় না। আমি চাইতাম, নতুন প্রজন্ম যেন আরও ভালো সুযোগ পায়। তাই সংগঠক হিসেবে কাজ শুরু করি। সংগঠক হিসেবে বুঝেছি, মাঠের লড়াইয়ের চেয়েও প্রশাসনিক লড়াই কঠিন। এখানে ধৈর্য দরকার, দৃষ্টিভঙ্গি দরকার। খেলোয়াড়দের জন্য অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক এক্সপোজার এসব নিয়ে কাজ করতে হয়েছে।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশের বর্তমান নারী ক্রীড়াবিদদের আপনি কীভাবে দেখেন?

লিনু : আমি খুব আশাবাদী। এখন মেয়েরা অনেক আত্মবিশ্বাসী। ফুটবল, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিকস, শুটিং সবখানেই মেয়েরা ভালো করছে। এটা খুব ইতিবাচক পরিবর্তন। তবে একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, সাময়িক সাফল্য যথেষ্ট নয়। ধারাবাহিকতা তৈরি করতে হবে। খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার নিরাপত্তা দিতে হবে। পরিবারকে আরও সচেতন হতে হবে।

দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি আপনার আত্মজীবনী প্রকাশ হয়েছে। বই লেখার ভাবনা কীভাবে এলো?

লিনু : অনেক দিন ধরেই ভাবছিলাম লিখব। আমার জীবনে এত ঘটনা ঘটেছে, সংগ্রাম, ভ্রমণ, জয়-পরাজয়, সবকিছু যেন ইতিহাসের অংশ। আমি চেয়েছি, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানুক আমরা কীভাবে পথ তৈরি করেছি। বই লিখতে গিয়ে অনেক পুরনো স্মৃতি ফিরে এসেছে। কিছু জায়গায় খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। মনে হয়েছে, জীবনটা আসলে এক বিশাল নদী, কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল।

দেশ রূপান্তর : খেলাধুলা ও সাহিত্য দুটি সম্পূর্ণ আলাদা জগৎ। আপনি কীভাবে ভারসাম্য বজায় রেখেছেন?

লিনু : আমার কাছে দুটোই সৃজনশীলতার জায়গা। খেলাধুলা শরীরকে শক্তিশালী করে, সাহিত্য মনকে সমৃদ্ধ করে। খেলার বাইরে আমি সবসময় বই পড়তাম। ভ্রমণ, মানুষ, সম্পর্ক এসব আমাকে লিখতে অনুপ্রাণিত করেছে। আমি বিশ্বাস করি, একজন ক্রীড়াবিদেরও সংবেদনশীল হওয়া জরুরি।

দেশ রূপান্তর : বর্তমান প্রজন্মের জন্য আপনার বার্তা কী?

লিনু : প্রথম কথা হলো স্বপ্ন দেখতে হবে। ছোট শহর, সীমিত সুযোগ, এসব কোনো বাধা নয়, যদি আপনার ইচ্ছাশক্তি থাকে। দ্বিতীয়ত, শর্টকাটের পেছনে দৌড়ানো যাবে না। সফলতা সময় নেয়। আমি ২৭ বছর ধরে খেলেছি। এই দীর্ঘ পথচলায় অসংখ্য ব্যর্থতা এসেছে। কিন্তু আমি থামিনি। আর একটা কথা বলব নিজের দেশকে ভালোবাসতে হবে। কারণ দেশের জন্য খেলতে পারার আনন্দের চেয়ে বড় কিছু নেই।

দেশ রূপান্তর : আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন কী বলে মনে করেন?

লিনু : ট্রফি বা মেডেল নয়। সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, মানুষের ভালোবাসা। এখনো কেউ যখন বলে, ‘আপনি আমাদের অনুপ্রেরণা; তখন মনে হয়, জীবনটা সার্থক। আমি চাই, মানুষ আমাকে শুধু একজন চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নয়, একজন সংগ্রামী মানুষ হিসেবে মনে রাখুক।

দেশ রূপান্তর : এখনো কি টেবিল টেনিস টেবিলের সামনে দাঁড়ালে পুরনো উত্তেজনা ফিরে আসে?

লিনু : অবশ্যই। ব্যাট হাতে নিলেই মনে হয়, আমি আবার সেই কিশোরী মেয়েটা হয়ে গেছি। খেলাধুলা কখনো মানুষকে ছেড়ে যায় না। এটা জীবনের অংশ হয়ে যায়। আজও যখন নতুন খেলোয়াড়দের দেখি, মনে হয় বাংলাদেশের সম্ভাবনা অনেক। শুধু দরকার সঠিক পরিচর্যা।