রক্ষণ সামলে আক্রমণে পোরোর চমক

ফুটবল মাঠে রাইট-ব্যাক বা রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের প্রথাগত ভূমিকা হলো প্রতিপক্ষকে আটকে রাখা। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন কিছু চরিত্র উঠে আসে, যারা মাঠের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে লেখেন অনন্য সব গল্প। স্পেনের ছোট্ট শহর দন বেনিতোর রাস্তা থেকে উঠে আসা এই ফুটবলারটি কেবল রক্ষণভাগ সামলানো নয়, বরং প্রতিপক্ষের রক্ষণকে তছনছ করে দেওয়ার এক অদ্ভুত জাদুকরী ক্ষমতার অধিকারী। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের রাতে টেক্সাসের সেই উত্তাল স্টেডিয়ামে পেদ্রো পোরো এটাই প্রমাণ করলেন, তিনি কেবল রক্ষণভাগের খেলোয়াড় হিসেবে নয়, বরং ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক বিধ্বংসী সেনানী হিসেবেও তিনি অনন্য।

তরুণ বয়সে একবার এক সাক্ষাৎকারে পোরো বলেছিলেন, ‘আমাকে কোনো কারাগারে ছেড়ে দাও, আমি শেষ পর্যন্ত ওই জায়গাটার মালিক হয়ে উঠব।’ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের রাতে ফ্রান্সের আক্রমণভাগকে নিজের এলাকায় যেভাবে বন্দি করে রেখেছিলেন তিনি, তা ছিল সেই উক্তিরই বাস্তব রূপ। রক্ষণভাগে এমবাপ্পে বা দেম্বেলের মতো আক্রমণকারীদের নিপুণ ট্যাকলে ব্যস্ত রাখা পোরো, সুযোগ বুঝে আক্রমণে উঠে দানি ওলমোর নিখুঁত পাসে বল জড়িয়ে দেন জালে। এই গোলটি কেবল স্কোরলাইনে ২-০ ব্যবধান গড়েনি, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি স্পেনের হাতে তুলে দিয়েছিল। লা রোহাদের জার্সিতে এখন পর্যন্ত পোরো করেছেন দুটি গোল, দুটিই এবারের বিশ্বকাপের নকআউটে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে স্পেনের দাপুটের জয়ের ম্যাচে গোল করার পর দ্বিতীয়টি ফ্রান্সের চিরচেনা দাপট চূর্ণ করে দেওয়া গোল।

পোরোর এই উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। স্পেনের ছোট্ট শহর দন বেনিতোতে তার শৈশব কেটেছিল চরম দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার মধ্যে। তার বাবা কাজ করতেন নানান জায়গায়, আর মা সুপারমার্কেটে। সেই দিনগুলোতে পোরোর একমাত্র ছায়াসঙ্গী ছিলেন তার দাদু আন্তোনিও। কড়া রোদ, প্রচণ্ড বৃষ্টি কিংবা হাড়কাঁপানো শীতেও নাতিকে অনুশীলনে নিয়ে যেতেন তিনি। ছোট্ট পোরো যখনই গোল করত, দাদু তাকে লজেন্স কিনে দিতেন। সেই মিষ্টি স্বাদই যেন তার মনে গেঁথে গিয়েছিল গোল করার নেশায়। যেই দন বেনিতোর যে মাঠটিতে তিনি ধুলো মেখে বড় হয়েছেন, সেই মাঠের নাম এখন ‘পেদ্রো পোরো স্টেডিয়াম’। আর দাদু আন্তোনিওর জন্মদিনের পরদিন নাতির এই বীরত্ব তো যেন হার মানিয়ে দিল রূপকথার গল্পকেও।

একজন ফুটবলার হিসেবে পোরোর বেড়ে ওঠার পথে তার ‘প্রতিযোগিতামূলক জিন’ বা জেতার নেশা ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি। তার শৈশবের কোচ কার্লোস মোরেনো তাকে নিয়ে বলেছিলেন, ‘সে এমন এক খেলোয়াড় ছিল যে, ছয় গোল করেও যদি দল হেরে যেত, তবে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরত।’ এই জেদই তাকে রায়ো ভায়েকানো থেকে জিরোনা, এরপর ম্যানচেস্টার সিটি এবং স্পোর্টিং সিপি হয়ে আজকের টটেনহ্যাম পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। পর্তুগালের লিসবনে রুবেন আমোরিমের অধীনে খেলার সময়ই তিনি বুঝেছিলেন, আধুনিক ফুটবলে কেবল দৌড়ালেই হয় না, রক্ষণ এবং আক্রমণ দুটোর ভারসাম্য বজায় রাখাই আসল কাজ। যার নজির সেমিতে ফ্রান্সের ম্যাচে।

সেমিফাইনালের এই ঐতিহাসিক জয়ের পর পোরো বলেন, ‘এমনটা ঘটবে, তা আমার কল্পনাতেও কখনো ভাবিনি।’ তার এই পারফরম্যান্স কেবল ট্যাকটিক্যাল নয়, বরং মানসিক এক দৃঢ়তার বহিঃপ্রকাশ। গ্যালারিতে বসে থাকা জাভি, ক্যাসিয়াস বা রামোসের মতো কিংবদন্তিরা নিশ্চয়ই এই রাতে নিজেদের ছায়া দেখছিলেন পোরোর মধ্যে। ২০১০ সালে যখন স্পেন প্রথম বিশ্বজয়ের স্বাদ পায়, দন বেনিতোর সেই ১০ বছর বয়সী ছেলেটি আনন্দ মিছিলের ভিড়ে যেন স্বপ্ন দেখেছিল একদিন সেও বিশ্বকাপে এমন কিছু করবে। আজ সেই স্বপ্ন বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে।