প্রতিষ্ঠার ৩২ বছরেও মেলেনি সরকারি একাডেমিক ভবন

চলনবিল অঞ্চলের অসংখ্য নারীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে ১৯৯৪ সালে নাটোরের গুরুদাসপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় রোজী মোজাম্মেল মহিলা কলেজ। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি হাজারো শিক্ষার্থীর জন্য উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করলেও প্রতিষ্ঠার ৩২ বছর পরও একটি সরকারি পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক ভবন পায়নি। নিজস্ব অর্থায়নে গড়ে ওঠা সীমিত অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করেই চলছে পাঠদান, পাবলিক পরীক্ষা এবং নারী শিক্ষার বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম।

সরেজমিনে দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষের সংকটের কারণে একই কক্ষে একাধিক শিফটে ক্লাস নিতে হচ্ছে। অনেক সময় একটি বেঞ্চে চার থেকে পাঁচজন শিক্ষার্থীকে বসে পাঠ গ্রহণ করতে হয়। পরীক্ষার সময় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তবু সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই নিয়মিত পাঠদান, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, বিজ্ঞান শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি চর্চা অব্যাহত রেখেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।

কলেজ সূত্রে জানা যায়, বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য এম. মোজাম্মেল হক প্রায় এক একর জমির ওপর নিজস্ব অর্থায়নে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। উদ্দেশ্য ছিল চলনবিল অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া নারীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। ১৯৯৮ সালে কলেজটি এমপিওভুক্ত হয়। ২০০১ সালে ডিগ্রি (পাস) এবং ২০১৫ সালে পাঁচটি বিষয়ে চার বছর মেয়াদি অনার্স কোর্স চালুর অনুমোদন পায়। বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক, ডিগ্রি ও অনার্স মিলিয়ে প্রায় ৮০০ শিক্ষার্থী এখানে অধ্যয়ন করছেন। শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন শতাধিক। একই সঙ্গে কলেজটি উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি পাবলিক পরীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। 

প্রতিষ্ঠার পর থেকে অধিকাংশ অবকাঠামো নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হলেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রেণিকক্ষের সংকট প্রকট হয়েছে। সরকারি একাডেমিক ভবনের অভাবে পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণ এবং একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনায় নিয়মিত সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।

একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সানজিদা সিথি বলেন, আমরা অনেক দূর থেকে এসে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করি। পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় স্বাভাবিক পরিবেশে ক্লাস করা যায় না। একটি আধুনিক সরকারি একাডেমিক ভবন আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি।

ডিগ্রি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সুস্মিতা রানী ও অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মাইশা বলেন, আমাদের পরিবারের পক্ষে শহরে থেকে পড়াশোনা করানো সম্ভব নয়। এই কলেজে বিনা বেতনে পড়াশোনা ও স্বল্প খরচে আবাসিক সুবিধা থাকায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছি। সরকারি ভবন হলে শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত হবে।

গুরুদাসপুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বিদ্যুৎ কুমার সরকার বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ের অনেক কলেজে সরকারি ভবন হয়েছে। অথচ উপজেলা সদরের একমাত্র নারী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ৩২ বছরেও একটি সরকারি একাডেমিক ভবন পায়নি, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।

কলেজটিতে শিক্ষার্থীরা বিনা বেতনে লেখাপড়ার সুযোগ পান। পাশাপাশি নামমাত্র খরচে আবাসিক সুবিধাও রয়েছে। ফলে গুরুদাসপুর ছাড়াও সিংড়া, তাড়াশ, বড়াইগ্রাম, ভাঙ্গুড়া ও চাটমোহরসহ চলনবিলের বিভিন্ন এলাকার কৃষক, দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের পরিবারের মেয়েরা এখান থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন।

প্রতিষ্ঠানটিতে সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, বিজ্ঞান ল্যাবরেটরি, আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব এবং সিসিটিভিভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় একাডেমিক ভবন ও পর্যাপ্ত আসবাবপত্রের অভাবে শিক্ষার পরিবেশ কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাতে পারছে না।

বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক মাহাবুবুর রহমান বলেন, শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখা হলেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে শ্রেণিকক্ষের সংকট তীব্র হচ্ছে। একটি আধুনিক একাডেমিক ভবন নির্মিত হলে শিক্ষার গুণগত মান আরও উন্নত হবে।

উপাধ্যক্ষ মো. আবুল কালাম বলেন, একসময় চলনবিল অঞ্চলে মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। যোগাযোগ ও নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেক পরিবার মেয়েদের বাইরে পাঠাতে চাইত না। এই কলেজ প্রতিষ্ঠার পর সেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হয়েছে।

অধ্যক্ষ মাহাতাব উদ্দিন বলেন, সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কলেজটি ধারাবাহিকভাবে ভালো ফলাফল করছে। সরকারের সহযোগিতায় একটি পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক ভবন নির্মিত হলে নারী শিক্ষার প্রসারে প্রতিষ্ঠানটি আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।

গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, কলেজটির অবকাঠামোগত সংকট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। 

স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজ বলেন, রোজী মোজাম্মেল মহিলা কলেজের সরকারি একাডেমিক ভবনের বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনায় বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের মতে, চলনবিল অঞ্চলে নারী শিক্ষার প্রসারে রোজী মোজাম্মেল মহিলা কলেজ দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও শিক্ষার চাহিদা যেভাবে বাড়ছে, তাতে দ্রুত একটি সরকারি পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক ভবন নির্মাণ এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।