সবিশেষ

সুনীতিকুমারের ‘ওডিবিএল’ : এক শতাব্দীর শ্রদ্ধার্ঘ্য

‘ভাষাতত্ত্ব’ ও ‘ভাষাবিজ্ঞান’—দুটি পরস্পরঘনিষ্ঠ ধারণা হলেও তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে রয়েছে মৌলিক পার্থক্য। ভাষাতত্ত্ব মূলত ভাষার ঐতিহাসিক ও দার্শনিক অনুসন্ধানের প্রাচীন ধারাকে নির্দেশ করে; আর ভাষাবিজ্ঞান ভাষাকে একটি স্বতন্ত্র বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণের আধুনিক শাস্ত্র। অষ্টাদশ শতকে ভাষা-অধ্যয়নে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে। স্যার উইলিয়াম জোন্সের ১৭৮৬ সালে প্রদত্ত ঐতিহাসিক বক্তৃতার মাধ্যমে এই পরিবর্তন ঘটে। কলকাতার রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটিতে প্রদত্ত সেই বক্তৃতায় তিনি সংস্কৃত, গ্রিক, ল্যাটিন ও প্রাচীন পারসিক ভাষার মধ্যে গভীর সাদৃশ্যের প্রমাণ উপস্থাপন করেন। তার এই আবিষ্কার ভাষাগুলোর অভিন্ন উৎস ও পারস্পরিক সম্পর্ক অনুসন্ধানের নতুন পথ উন্মোচন করে। পরবর্তীকালে জার্মান পণ্ডিত ফ্রিডরিখ ভন শ্লেগেল তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি ‘ফেরগ্লাইখেন্দে গ্রামাটিক’ বা তুলনামূলক ব্যাকরণের ধারণাকে সুসংহত করেন এবং সংস্কৃতসহ ইউরোপীয় ভাষাগুলোর ধ্বনিগত ও গঠনগত মিল বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভাষাগুলোর বংশগত ঐক্যের ধারণাকে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। এই ধারাই পরবর্তীকালে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বাংলা ভাষা ও ভাষাচর্চার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি একদিকে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে গভীর পাণ্ডিত্য প্রদর্শন করেছেন, অন্যদিকে আধুনিক বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের পথিকৃৎ হিসেবেও স্বীকৃত। তার রচনাবলিতে বাংলাভাষার গঠন, স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে যে বিশ্লেষণ পাওয়া যায়, তা ছিল সময়ের তুলনায় অনেক অগ্রসর।

বাংলা ভাষার শব্দপ্রয়োগ ও ব্যাকরণ নিয়ে প্রাচীনকালে সুগভীর আলোচনা গড়ে উঠেছিল বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ-এর পত্রিকাকে কেন্দ্র করে। এই পত্রিকায় তৎকালীন খ্যাতিমান পণ্ডিতেরা তাদের গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন উমেশচন্দ্র বটব্যাল, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজেন্দ্রচন্দ্র শাস্ত্রী, ললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, ব্যোমকেশ মুস্তফী, যোগেশচন্দ্র রায় প্রমুখ। এই পরিমণ্ডলের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের ভাষাচিন্তার বিকাশ ঘটে। শৈশব থেকেই বাংলা ভাষার অন্তর্গত রহস্য তাকে আকৃষ্ট করেছিল। তার রচনায় ভাষার ব্যুৎপত্তিগত ইতিহাসের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে প্রয়োগের বৈশিষ্ট্য এবং ভাব বা অর্থপ্রকাশের দিক। ‘বাংলা বহুবচন’, ‘সম্বন্ধে-কার’ ও ‘বাংলা উচ্চারণ’ প্রবন্ধে তিনি ভাষার ব্যবহারিক রূপ বিশ্লেষণ করেছেন সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে।

এছাড়াও সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকায় তাঁর ‘বাংলা শব্দদ্বৈত’, ‘ধ্বন্যাত্মক শব্দ’, ‘বাংলা কৃৎ ও তদ্ধিত’ প্রভৃতি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। অন্যদিকে ‘বাংলা ব্যাকরণ’, ‘ভাষার ইঙ্গিত’, ‘বাংলা ব্যাকরণে তির্যক-রূপ’, ‘বাংলা ব্যাকরণে বিশেষ বিশেষ্য’, ‘বাংলা নির্দেশক’, ‘বাংলা বহুবচন’ ও ‘স্ত্রীলিঙ্গ’ প্রবন্ধগুলি ভারতী, বঙ্গদর্শন এবং বিশেষভাবে প্রবাসী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

পরবর্তীকালে ১৯০৯ সালে এইসব গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধের অনেকগুলি একত্রিত করে শব্দতত্ত্ব গ্রন্থ প্রকাশিত হয়, যা বাংলা ভাষাবিজ্ঞানচর্চায় এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। রবীন্দ্রনাথের এই রচনাগুলোকেই আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান আলোচনার পাথেয় সাব্যস্ত করেছিলেন সুনীতিকুমার। তার যুগান্তকারী গ্রন্থ দি অরিজিন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফ দ্য বেঙ্গলি ল্যাংগুয়েজ (১৯২৬)-এর ভূমিকায় অকুণ্ঠচিত্তে তিনি লিখেছেন : ‘ভাষার সমস্যাগুলোর প্রতি বিশ্লেষণধর্মী ও অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণকারী প্রথম বাঙালি ছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ভাষাতাত্ত্বিকদের জন্য এটি বিশেষভাবে গর্বের বিষয় যে, যিনি বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক, এক মহান কবি ও দার্শনিক দৃষ্টিকোণসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত, তিনি আবার একজন ভাষাতাত্ত্বিকও ছিলেন। ভাষার বাস্তব উপাদানসমূহের প্রতি তার ছিল নিবিড় অনুসন্ধান, পাশাপাশি আধুনিক পাশ্চাত্য ভাষাতত্ত্ববিদদের পদ্ধতি ও গবেষণালব্ধ ফলের প্রতি ছিল তার সুচিন্তিত ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ মূল্যায়ন। রবীন্দ্রনাথের ভাষাতাত্ত্বিক রচনাগুলো মূলত কয়েকটি প্রবন্ধের আকারে রচিত, যা বর্তমানে একটি গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। এসব প্রবন্ধে তিনি বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব, মেটাপোয়েটিকস, বাংলা বিশেষ্য প্রভৃতি নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। এর মধ্যে প্রাথমিক রচনাগুলো ১৮৯০-এর দশকে প্রকাশিত হয়, এবং পরবর্তীকালে আরও কিছু প্রবন্ধ কয়েক বছর আগে প্রকাশিত হয়। এই রচনাগুলো বাংলা ভাষা নিয়ে অনুসন্ধানকারী গবেষকদের জন্য সমস্যাগুলোকে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অনুধাবন ও বিশ্লেষণের একটি সুস্পষ্ট পথনির্দেশ করেছে।’

ওডিবিএল নামে সমধিক পরিচিত গ্রন্থটি বাংলা ভাষার ইতিহাসচর্চায় এক অনন্য মাইলফলক। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ১৯১৯ থেকে ১৯২১ সালের মধ্যে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই গবেষণা সম্পন্ন করেন এবং এর জন্য ডি.লিট উপাধি অর্জন করেন। ১৯২৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে দুই খণ্ডে গ্রন্থটি প্রকাশিত হলে তা দ্রুতই বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়। লন্ডনের ‘জর্জ অ্যালেন অ্যান্ড আনউইন’-এর প্রতিচিত্র সংস্করণ প্রকাশ করে এবং আরও পরে কলকাতার রূপা কোম্পানি একটি ছোট বাড়তি খণ্ডসহ আনউইনদের সংস্করণটির প্রতিমুদ্রণ করে। গ্রন্থটির ভূমিকায় ভাষাবিদ জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সন তাকে ‘নবযুগের পাণিনি’ বলে অভিহিত করেন। এটা তার গবেষণার গভীরতা ও মৌলিকতার স্বীকৃতি বহন করে।

ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে এবং ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত থাকলেও সুনীতিকুমারের চিন্তার কেন্দ্রে ছিল বাংলা ভাষা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ও জার্মান ভাষাতত্ত্ব অধ্যয়নকালে তিনি উপলব্ধি করেন, আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিক পদ্ধতি বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও প্রয়োগযোগ্য; কারণ বাংলা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাপরিবারেরই অন্তর্ভুক্ত। এই ধারণার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল স্যার উইলিয়াম জোন্সসহ ইউরোপীয় পণ্ডিতদের গবেষণায়, যেখানে সংস্কৃত, গ্রিক ও প্রাচীন জার্মান ভাষার তুলনা করে একটি আদিম মাতৃভাষার ধারণা গড়ে ওঠে।

পরবর্তীকালে ইন্দো-ইরানীয় ও আর্যভারতীয় ভাষার বিকাশ নিয়ে ভাষাতাত্ত্বিকরা নিশ্চিত মত প্রকাশ করেন এবং দেখান যে ভারতীয় আর্যভাষাগুলো একই উৎস থেকে উদ্ভূত। ফ্রাৎস বপ ও জার্মান পণ্ডিতদের নির্মিত কাঠামো ভারতীয় ভাষার ইতিহাস রচনার ভিত্তি হয়ে ওঠে। এরপর জন বীমসের আউটলাইনস্ অব ইন্ডিয়ান ফিলোলোজি (১৮৬৭) এবং তার কম্পারেটিভ গ্রামার অব দ্য আরিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস অব ইন্ডিয়া (১৮৭৯), রামকৃষ্ণ গোপাল ভাণ্ডারকরের উইলসন ফিলোলোজিক্যাল লেকচার্স (১৮৭৭), হর্নলের কম্প্যারেটিভ গ্রামার অব গৌড়িয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস উইথ আ স্পেশাল রেফারেন্স টু ইস্টার্ন হিন্দি (১৮৮০) এবং জর্জ গ্রিয়ার্সনের লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে অব ইন্ডিয়া (১৯০৬) এই গবেষণাধারাকে সুসংহত করে।

সুনীতিকুমারের গবেষণার আদর্শ ছিল জুল ব্লখের লা ফরমাসিয়ঁ দ্য লা লাঙ মারাত (১৯০৮)। ইউরোপীয় ভাষাতত্ত্বে ভাষার পরিবর্তনের যে সাধারণ নিয়মাবলি নির্ধারিত হয়েছিল, তা তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ছাত্রাবস্থায় এই নিয়মগুলো আয়ত্ত করে তিনি বাংলা ভাষার বিশ্লেষণে সেগুলো প্রয়োগে আগ্রহী হন এবং ভাষাবিবর্তনের বৈশ্বিক ইতিহাসের অন্তর্নিহিত রহস্য অনুসন্ধানে আত্মনিয়োগ করেন।

এই সুবৃহৎ গ্রন্থটি মূলত তিনটি অংশে বিভক্ত—অংশ-১ : ভূমিকা, ধ্বনিতত্ত্ব; অংশ-২ : রূপতত্ত্ব, বাংলা সূচিপত্র এবং পরবর্তী সংস্করণে (১৯৭১) সংযোজিত অংশ-৩ : পরিশিষ্ট, সংযোজন, সংশোধন ইত্যাদি। এতে বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ভাষার ধ্বনি-প্রকৃতি (বর্ণ ও ছন্দ), রূপতত্ত্ব (শব্দগঠন) এবং ব্যাকরণগত গঠনপ্রণালিকে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা একই সঙ্গে বর্ণনামূলক ও তুলনামূলক পদ্ধতির এক অনন্য সমন্বয়।

এই গ্রন্থে বাংলা ভাষার উৎপত্তি, বিকাশ ও গঠনগত বৈশিষ্ট্য এমন বিস্তৃত পরিসরে আলোচিত হয়েছে, যা অন্য কোনো ভাষার ক্ষেত্রেও বিরল।

প্রায় এক হাজার বছরের ভাষাগত বিবর্তনকে ভিত্তি করে সুনীতিকুমার বাংলা ভাষার বয়স নির্ধারণ করেন এবং চর্যাপদকে প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে গ্রহণ করেন। যদিও পরবর্তীকালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বা অন্যান্য গবেষক ভাষার সূচনাকাল আরও প্রাচীন বলে দাবি করেছেন, তবু সুনীতিকুমারের নির্ধারণ আজও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। ওডিবিএল গ্রন্থটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলা ভাষার বংশপরিচয় নির্ধারণ। তিনি দেখিয়েছেন, বাংলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাপরিবারের অন্তর্গত এবং বিশেষত নব্য ইন্দো-আর্য ভাষার একটি শাখা। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার উৎস মধ্য এশিয়ার প্রাচীন এক ভাষায়, যেখান থেকে ক্রমে বিভিন্ন ভাষার জন্ম হয়—গ্রিক, লাতিন, জার্মানিক প্রভৃতি। অন্যদিকে, পূর্বমুখী শাখা ইন্দো-ইরানীয় হয়ে ভারতে প্রবেশ করে এবং প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষার জন্ম দেয়। এই ভাষা থেকেই ক্রমে প্রাকৃত, অপভ্রংশ এবং পরবর্তীতে আধুনিক ভারতীয় ভাষাগুলোর উদ্ভব ঘটে, যার মধ্যে বাংলা অন্যতম।

সুনীতিকুমার বাংলা ভাষাকে ‘আর্য’ ভাষা হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি দেখিয়েছেন, বাংলা ভাষায় অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় ভাষার প্রভাবও যথেষ্ট গভীর। বাংলায় ক্রিয়াপদ ছাড়া বাক্যের ব্যবহার, বহু দেশজ শব্দ এবং ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য এই বহুমাত্রিক উৎসেরই প্রমাণ। ফলে বাংলা ভাষা এক বিশুদ্ধ বংশধারার নয়, বরং বহু সংস্কৃতি ও ভাষার সম্মিলিত সৃজন—এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি তিনি প্রতিষ্ঠা করেন।

এই গ্রন্থের মাধ্যমে চর্যার বাংলাত্বের দাবি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। চর্যাপদের ভাষাতাত্ত্বিক, শব্দতাত্ত্বিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সুনীতিকুমার দেখান, এর ভাষা ‘তার মূল ভিত্তিতে বাঙালির প্রকৃত লোকভাষা।’ তার মতে, চর্যাপদই বাংলা বুলির প্রথম সাহিত্যিক প্রয়াস। তবে এই প্রাথমিক পর্যায়ের ভাষা স্বরূপে কিছু অনিশ্চয়তা থাকায়, তা পূর্ববর্তী সুপ্রতিষ্ঠিত ভাষা থেকে আংশিক প্রভাব গ্রহণ করেছে। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে গুজরাট থেকে বঙ্গ পর্যন্ত সাহিত্যভাষা হিসেবে শৌরসেনী অপভ্রংশের প্রভাব ছিল। এমনকি মাগধী অপভ্রংশপ্রধান অঞ্চলেও সাহিত্যভাষায় শৌরসেনীর প্রভাব বজায় ছিল, ফলে চর্যাকারেরাও তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে পারেননি। কিছু চর্যায় পশ্চিমবঙ্গীয় উপভাষার প্রভাবও স্পষ্ট। এই গ্রন্থে তিনি বিশ্লেষণ করে দেখান, বৌদ্ধগান ও দোহা গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত সরোহবজ্র ও কৃষ্ণাচার্যের দোহাকোষ পূর্বী অপভ্রংশে এবং ডাকার্ণব পশ্চিমী অপভ্রংশে রচিত, যা বাংলা ভাষার অন্তর্ভুক্ত নয়।

প্রাচীন ভারতে ভাষাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে পাণিনির যে যুগান্তকারী অবদান, আধুনিক ভারতে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় সেই ধারারই এক বিশিষ্ট পথিকৃৎ। বাংলা তথা ভারতীয় ভাষার উৎপত্তি, বিকাশ ও বিবর্তনের ইতিহাস তার গবেষণায় পেয়েছে সুসংবদ্ধ ও বৈজ্ঞানিক রূপ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার বাংলা ভাষা পরিচয় (১৯৩৮) গ্রন্থটি সুনীতিকুমারকে উৎসর্গ করে তাকে ‘ভাষাচার্য’ উপাধিতে সম্মানিত করেন। সুনীতিকুমারের অমর অবদান দ্য অরিজিন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অব দ্য বেঙ্গলি ল্যাংগুয়েজ বাঙালির ভাষিক পরিচয় ও সাংস্কৃতিক আত্মানুসন্ধানের এক মূল্যবান দলিল। শতবর্ষ অতিক্রম করেও এর গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা আজও অম্লান।