রমনায় পানকৌড়ির বাসা

দুবছর আগের ঘটনা। বড় ভাই মো. মিজানুর রহমান বেইলি রোড থেকে বাসায় ফিরছিলেন। ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফরেন সার্ভিস একাডেমির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ তার গায়ে চুনের মতো সাদা কিছু একটা পড়ল। আশপাশে তাকিয়ে কিছু না দেখতে পেয়ে ওপরের দিকে তাকালেন। আর তাকিয়েই তার চোখ ছানাবরা! উঁচু ইউক্যালিপটাস গাছের পুরোটায় লম্বা গলার কালো কালো পাখি ও তাদের বাসা। পাশের আরও দু-একটি গাছেও একই অবস্থা। মাঝে মাঝে বাসাসহ নিশিবকও দেখা যাচ্ছে। গাছের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মাটির দিকে তাকাতেই ফুটপাত ও রাস্তার খানিকটা সেই চুনের মতো পদার্থে ছেয়ে আছে।

তার সঙ্গে ক্যামেরা ছিল। দ্রুত কিছু ছবি তুলে নিলেন। তিন-চার দিন পর চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে একটি কাজে গিয়েছিলাম। কাজ সেরে ফেরার পথে বেইলি রোডের ওই জায়গায় গিয়ে অটোরিকশা থামালাম। দুটি গাছে কমপক্ষে ৬০-৭০টি বাসা। খোদ ঢাকা শহরের কেন্দ্রস্থলে পাখিগুলোকে দেখে বড়ই ভালো লাগল। সপ্তাহ দুয়েক আগে বড় ভাই আবারও ওখান থেকে পাখিগুলোর ছবি তুলে আনলেন। গত ৯ জুন আমি আবারও চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর থেকে ফেরার পথে পাখিগুলোকে দেখলাম। তবে সঙ্গে ক্যামেরা না থাকায় ছবি তুলতে পারিনি। কিন্তু ঢাকার পাখিগুলোকে বংশবৃদ্ধি করতে দেখে মনে অত্যন্ত শান্তি পেলাম।

বেইলি রোডের ইউক্যালিপটাস গাছে দেখা এই পাখিগুলো এদেশের বহুল দৃশ্যমান আবাসিক পাখি পানকৌড়ি। পানি কাউর, পানি কাক বা ছোট পানকৌড়ি নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম খরঃঃষব ঈড়ৎসড়ৎধহঃ। জলকাম গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম চযধষধপৎড়পড়ৎধী হরমবৎ (ফ্যালাক্রোকোরাক্স নিগার)। বাংলাদেশ ছাড়াও এশিয়ার বহু দেশেই পাখিটির দেখা মেলে।

পানকৌড়ির দেহের দৈর্ঘ্য ৫০-৫৫ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা গড়ে ৯০ সেন্টিমিটার ও ওজন ৩৬০-৫২০ গ্রাম। একনজরে পানকৌড়ি কালো রঙের পাখি। লম্বাটে দেহ। মাথার ঝুঁটি খাটো ও স্পষ্ট। মাথার চাঁদির সামনে ও মাথার পাশে রেশমি সাদা পালক রয়েছে। হাঁসের মতো পা দুটোর অবস্থান দেহের পেছন দিকে। পা ও পায়ের পাতা কালো। চোখের রঙ সবুজ। চঞ্চু ধূসর-ছাই। স্ত্রী ও পুরুষ দেখতে একই রকম। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের ওপরটা বাদামি ও নিচটা তুলনামূলকভাবে ফ্যাকাশে। গলা ও অবসারণীর মাঝখানটা সাদা। পানকৌড়ি সারা দেশের হাওর, বিল, নদী, মোহনা, খাল, পুকুর, হ্রদ, জলাভূমি প্রভৃতিতে একাকী, জোড়ায় বা দলে বিচরণ করে। মরা নদী, খাল বা বিলে দাঁড়িয়ে থাকা মরা গাছের ডাল, পোঁতা বাঁশ বা খুঁটি এবং পানির মধ্যে জেগে থাকা এক টুকরো মাটি বা চরে ডানা মেলা অবস্থায় কুচকুচে কালো পানকৌড়ির দেখা পায়নি নৌকা ভ্রমণকারী এমন লোক বোধহয় এদেশে খুঁজে পাওয়া ভার!

সারা দেশের সব জলাকীর্ণ এলাকায়ই আমি ওদের এভাবে ডানা মেলে থাকতে দেখেছি। এরা পানিতে ডুব দিয়ে ও সাঁতার কেটে মাছ, ব্যাঙ ও চিংড়িজাতীয় প্রাণী শিকার করে খায়। পানি থেকে উঠে প্রায়ই ডানা ও লেজ মেলে ধরে রাখে। এরা সচরাচর নীরব, তবে প্রজননকালে চঞ্চু দিয়ে খটখট শব্দ করে।

মে থেকে জুলাই প্রজননকাল। এ সময় এরা পানির ধারে বড় গাছে দল বেঁধে উপনিবেশ বা কলোনি তৈরি করে বাসা বানায়। গাছের শাখায় শুকনো সরু ডালপালা দিয়ে পাতি কাকের মতো বাসা বানায়। ডিম পাড়ে ২-৬টি, রঙ সাদা। ডিম ফোটে ১৫-২১ দিনে। আয়ুষ্কাল ৮-৯ বছর।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ