শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকা-ের ঘটনায় জড়িত থাকার অপরাধে দীর্ঘ ৪৫ বছর পর মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গত বুধবার মধ্যরাতে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে সেনা আইনে ব্যবস্থা নিতে তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম জানান, বুধবার রাত ১০টার দিকে বনানীর একটি বাসা থেকে মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনকে অবহিত করা হয়। পরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের একটি দলের কাছে আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাকে হস্তান্তর করা হয়েছে। ডিবি সূত্রে জানা যায়, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকা-ের পর থেকে মেজর মোজাফফর হোসেন বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে ছিলেন। বিশ্বস্ত সোর্স ও তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে গোয়েন্দা বিভাগ অবস্থান শনাক্তের পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা হামলা চালিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে। এ হত্যাযজ্ঞে সরাসরি অংশ নেওয়া সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে মেজর মোজাফফর হোসেন ও ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিনও ছিলেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও মামলাসংক্রান্ত বিবরণ অনুযায়ী, মেজর মোজাফফরই প্রথম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শনাক্ত করেন এবং তাকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি ছোড়েন। হত্যা নিশ্চিত করার পর তিনিই চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে টেলিফোন করে জানান, ‘ঞযব চৎবংরফবহঃ যধং নববহ শরষষবফ.’ (প্রেসিডেন্টকে হত্যা করা হয়েছে)।
চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার সময় দায়িত্বরত ছিলেন মেজর মোজাফফর। পরে তিনি পালিয়ে যান। তাকে ধরিয়ে দিতে সে সময় পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল। জিয়া হত্যার ঘটনায় ১৮ জন সেনা কর্মকর্তার বিচার করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১৩ জন সেনা কর্মকর্তার ফাঁসি এবং বাকি পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেওয়া হয়। ওই সময় দায়িত্বে থাকা মেজর মোজাফফর হোসেন ও মেজর এস এম খালেদ পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। দীর্ঘদিন পর মোজাফফরকে গ্রেপ্তার করা হলেও এখনো অধরাই রয়ে গেছেন মেজর খালেদ। ওই সময় তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।
গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মোজাফফর হোসেনকে বনানী ডিওএইচএস থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার ঘটনায় জড়িত। যেহেতু তিনি এতদিন পলাতক ছিলেন, নিয়ম অনুযায়ী আগে তাকে তার বাহিনীতে হস্তান্তর করা হবে। সে হিসেবে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।’
হত্যাকা-ের পর সেনাবাহিনীর অভিযানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরে মঞ্জুর নিহত হন। ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন গ্রেপ্তার হয়ে যাবজ্জীবন কারাদ-ে দ-িত হন। তখন মেজর মোজাফফর ও মেজর খালেদ পালিয়ে যান। এরপর তাদের কোনো খোঁজ ছিল না।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মেজর মোজাফফর হোসেন দীর্ঘ সময় ভারতে আত্মগোপনে ছিলেন। ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করেন। পরে তিনি ছদ্মনাম ব্যবহার করে সীমান্ত অতিক্রম করে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতেন।
৪৫ বছর আত্মগোপনে থাকার পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তাকে আটক করতে সক্ষম হয়। তার গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে দেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক হত্যাকা-ের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত অধ্যায়ে নতুন অগ্রগতি এলো। সেনাবাহিনীর নিজস্ব বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এখন তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর তার লাশ পাহাড়ে মাটিচাপা দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে ১ জুন জিয়াউর রহমানের মৃতদেহ খুঁজতে বের হয়েছিলেন ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ ও কয়েকজন সিপাহি। তারা সঙ্গে একটি ওয়্যারলেস সেট এবং একটি স্ট্রেচার নিয়ে যান। তাদের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যও ছিলেন। গ্রামবাসীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী হান্নান শাহ সৈন্যদের নিয়ে গিয়ে নতুন মাটিতে চাপা দেওয়া একটি কবর দেখতে পান। সেখানে মাটি খুঁড়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং আরও দুই সেনা কর্মকর্তার মৃতদেহ দেখতে পান তারা। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃতদেহ তুলে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নেওয়া হয়। সেখান থেকে হেলিকপ্টারে করে জিয়াউর রহমানের মৃতদেহ ঢাকায় আনা হয়।