কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থার দ্রুত প্রসারের ফলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়েছে। প্রয়োজনীয় নীতিগত প্রস্তুতি ও দক্ষতা উন্নয়ন না হলে ২০৪১ সালের মধ্যে এ খাতের প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার মানুষ চাকরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে পোশাক খাতে কর্মরত নারী শ্রমিকদের।
গত ১৫ জুলাই রাতে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ‘পরিবর্তনশীল কর্মপরিবেশ : বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলে কর্মপরিবেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দূরদৃষ্টি’ শীর্ষক ভার্চুয়াল ওয়েবিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে ‘ভবিষ্যতের কর্মজগতের জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুত? অটোমেশন, এআই ও কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য শ্রমবাজারকে প্রস্তুত করা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. তৌফিকুল ইসলাম খান। এতে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
মূল প্রবন্ধে তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, অটোমেশনের কারণে তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে ১২ লাখ ২০ হাজার কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ২০৪১ সালের মধ্যে এ খাতে নিয়োজিত নারী শ্রমিকের প্রায় ৬০ শতাংশ কর্মসংস্থান বিলুপ্ত বা স্থানচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও উৎপাদন খাতে মোট কর্মসংস্থান প্রায় ৮১ লাখে স্থবির হয়ে রয়েছে, যা ২০১৩ সালের স্তরেরও নিচে। এ ছাড়া অটোমেশন বা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে যেসব শ্রমিক কর্মহীন বা স্থানচ্যুত হচ্ছেন, তাদের নতুন দক্ষতা অর্জন বা পুনঃদক্ষতা উন্নয়নের পর্যাপ্ত সুযোগ এখনো গড়ে ওঠেনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক সেই সময় অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোর পরিবর্তন দেশের শ্রমবাজারে নতুন চাপ তৈরি করছে।
সিপিডি জানায়, ২০২৪ সালে দেশে প্রায় ১৩ লাখ চাকরি কমেছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই নারী কর্মীদের। অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে এআই ও অটোমেশন ১ কোটি ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেও প্রায় ৯০ লাখ চাকরি বিলুপ্ত হবে। ফলে পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতার ওপরই ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান প্রায় ৮১ লাখে স্থির থাকলেও উৎপাদন বেড়েছে। অন্যদিকে সেবা খাতে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ কাজ করলেও এর বড় অংশ অনিরাপদ ও নিম্ন উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে নিয়োজিত। একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থায় অর্জিত দক্ষতার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার বড় ধরনের অমিল রয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষায় (টিভিইটি) ভর্তি ২০ শতাংশেরও কম এবং শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতে সরকারি ব্যয় জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ।
সিপিডি জানায়, ২৭টি জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিবর্তনশীল উপাদান বিশ্লেষণ করে ২০৩৫ সালের জন্য শ্রমবাজারের চারটি সম্ভাব্য চিত্র তৈরি করা হয়েছে। তবে সব পরিস্থিতিতেই পাঁচটি বিষয় অভিন্ন থাকবে। এগুলো হলো ডিজিটালায়ন অপরিবর্তনীয় হবে, কর্মসংস্থান উচ্চমূল্যের সেবা খাতে স্থানান্তরিত হবে, দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থা পিছিয়ে থাকবে, বৈশ্বিক ধাক্কার ঝুঁকি অব্যাহত থাকবে এবং সফলতা অনেকাংশে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান নীতিমালায় চারটি বড় ঘাটতি রয়েছে। এগুলো হলো প্ল্যাটফর্ম ও গিগ অর্থনীতির শ্রমিকদের জন্য কোনো সমন্বিত কাঠামো নেই; অটোমেশনের প্রভাব নীতিনির্ধারণে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি; দক্ষতা উন্নয়ন পরিকল্পনায় বাস্তব চাহিদার প্রতিফলন কম এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ অনুপস্থিত।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সিপিডি কয়েকটি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে শিল্পের চাহিদাভিত্তিক কারিগরি শিক্ষা সংস্কার; জীবনব্যাপী পুনঃদক্ষতা (রিস্কিলিং) কর্মসূচি চালু; কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিল্প প্রণোদনা যুক্ত করা; শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি; জাতীয় শ্রমবাজার তথ্যব্যবস্থা (এলএমআইএস) গড়ে তোলা; গিগ ও প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কর্মীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং নারী, তরুণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান কৌশল গ্রহণ।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘বিশ্ব পরিবর্তন হচ্ছে। কর্মসংস্থান কাঠামোর পরিবর্তন হচ্ছে। নীতি নির্ধারকদের পরিবর্তনের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে কষ্ট হচ্ছে। দুই কারণে এটা হচ্ছে, একটা হচ্ছে উত্তরাধিকার সূত্র, আর বাজার ও কর্মসংস্থানের ভেতরে মিসম্যাচ আছে। দক্ষতার অভাব, ভৌগোলিক কারণ রয়েছে। অন্যদিকে এআই ও অটোমেশনে বিপ্লব ঘটেছে।’
ওয়েবিনারটি যৌথভাবে আয়োজন করে সিপিডি, জাস্টজবস নেটওয়ার্ক, লার্নএশিয়া, সাউদার্ন ভয়েস এবং সিটিজেনস প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজিস, বাংলাদেশ। এটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন গবেষণা কেন্দ্রের (আইডিআরসি) সহায়তায় পরিচালিত ‘ফিউচারওয়ার্কস এশিয়া’র উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়।