আমন রোপণে ধীরগতি

চলতি আমন মৌসুমে উত্তরাঞ্চলের রংপুর কৃষি অঞ্চলে ধীরগতিতে আমন ধানের চারা রোপণ শুরু হয়েছে। প্রকৃতির বৈরী রূপ এবং আকস্মিক বন্যার কারণে আমন চাষে কিছুটা স্থবিরতা থাকলেও আউশ ধানের রেকর্ড আবাদ কৃষকের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। গত বুধবার পর্যন্ত রংপুর, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলায় ২৩ হাজার ৬১৫ হেক্টর জমিতে চারা রোপণ করা হয়েছে। যা মৌসুমের শুরু হিসেবে তুলনামূলক কম। অপরদিকে এ অঞ্চলে ৫৯ হাজার ১৯৫ হেক্টর জমিতে আউশ ধান চাষ করা হয়েছে। যা মধ্য আগস্টে কৃষকরা ঘরে তুলবে।

রংপুর কৃষি অঞ্চলের উপ-পরিচালকের কার্যালয় সূত্র মতে, বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও নদীর পানি ফুলে-ফেঁপে ওঠার কারণে কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলায় কৃষকরা এখন চারা রোপণ শুরু করতে পারেননি। আবার কিছু কিছু এলাকায় অনেক কষ্ট করে আমনের চারা রোপণ করা হলেও, তা আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে চারা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন বিপুলসংখ্যক চাষি, যা সামগ্রিক আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চলতি আমন মৌসুমে রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় ৬ লাখ ২১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে নীলফামারী জেলায় ১ লাখ ১৩ হাজার ২২০ হেক্টর, রংপুর জেলায় ১ লাখ ৬১ হাজার ৯৫০ হেক্টর, লালমনিরহাট জেলায় ৮৬ হাজার ৬৫০ হেক্টর, গাইবান্ধা জেলায় ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩০ হেক্টর ও কুড়িগ্রাম জেলায় ১ লাখ ২১ হাজার ৬০০ হেক্টর। এই পরিমাণ জমিতে ২০ লাখ ৫ হাজার ২৮ মেট্রিকটন চাল (ধান হিসেবে ৩০ লাখ ৭ হাজার ৫৪২ টন) উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

এর মধ্যে ৫ লাখ ২৪ হাজার ৫২০ হেক্টর জমিতে উচ্চ ফলনশীল (এইচওয়াইভি) জাত, ৮৬ হাজার ২০ হেক্টরে হাইব্রিড এবং ১১ হাজার ১০ হেক্টরে স্থানীয় জাতের আমন চাষের পরিকল্পনা রয়েছে কৃষিবিভাগের।

একই সূত্র মতে, গত বছর (২০২৫ সাল) এ অঞ্চলের ৫ জেলায় আমন চাষ করা হয় ৬ লাখ ২০ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে। চালের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৯ লাখ ১৭ হাজার ৬৭২ মেট্রিকটন। সেই হিসাবে গত বছরের চেয়ে এবার ৯০০ হেক্টর জমিতে বেশি আমন চাষ করা হবে। এছাড়া গত বছরের চেয়ে ৮৭ হাজার ৩৫৬ মেট্রিকটন চাল বেশি উৎপাদন হবে।

সূত্র মতে, বুধবার বিকাল পর্যন্ত নীলফামারী জেলায় ১৬ হাজার ৩৯৫ হেক্টর, লালমনিরহাট জেলায় ৬ হাজার ৩২০ হেক্টর ও রংপুর জেলায় ৯০০ হেক্টর জমিতে আমন চারা রোপণ করা হয়েছে। ফসলি জমিগুলো বৃষ্টি ও বন্যার পানিতে তলিয়ে থাকায় গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন উপজেলায় কৃষকরা আমন চারা রোপণে মাঠেই নামতে পারেননি।

ডিমলা উপজেলার বাইশপুকুর গ্রামের কৃষক শফিউদ্দিন জানান, গত দুদিন থেকে বৃষ্টির পানি আবাদি জমিতে ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। পানি নামলেই আমনের চারা রোপণ শুরু করা হবে। একই গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম জানান, জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে মাঠে চারা রোপণের ব্যস্ততা থাকলেও এবার উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে জমিগুলো তলিয়ে গেছে। ফলে হাল চাষ করা যাচ্ছে না।

রংপুরের গঙ্গাচড়ার কচুয়া এলাকার কৃষক সন্তোষ চন্দ্র সেন জানান, গত বছর এই সময়ে বৃষ্টির অভাবে আমন চারা রোপণ করতে পারিনি। শ্যালো দিয়ে পানি তুলে চাষ করতে হয়েছে। এবার এত বৃষ্টি যে জমিতে হাল চাষ ও চারা রোপণ করাই যাচ্ছে না। তিনি বলেন, আগামী দুই-তিনদিনে বৃষ্টি না হলে ও রোদ পাওয়া গেলে জমির পানি নেমে যাবে, তখন হাল চাষ করে চারা রোপণ করতে পারব। নীলফামারী সদরের গোড়গ্রাম হাজিপাড়া গ্রামের কৃষক লিয়াকত আলী বলেন, এলাকার উচু জমিতে আমন চারা রোপণ চলছে। নিচু জমিতে বৃষ্টির পানি ভরাট থাকায় চারা রোপণে বিলম্ব হচ্ছে।

তবে কৃষি বিভাগ আরও জানিয়েছে, আমনের আগেই এ অঞ্চলে ৫ জেলায় জুন মাসে ৫৯ হাজার ১৯৫ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের চারা রোপণ করা হয়েছে। এ ধানটির উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক লাখ ৭৯ হাজার ১৬১ মেট্রিকটন চাল।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার নানা বাস্তবমুখী প্রদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সেইসঙ্গে উৎপাদন বাড়াতে সরকার উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের চাষ সম্প্রসারণ, সারের সুষম ব্যবহার এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে গুরুত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বিনামূল্যে উন্নতমানের আমন বীজ ও সার বিতরণ করা হচ্ছে। ফলে বোরো ধান কাটার পর, আমন ধানের চারা রোপণের মধ্যবর্তী সময় জমির বেশিরভাগ সময় পতিত থাকে। এই সময় কম সেচের পানি ব্যবহার করে স্বল্পমেয়াদি স¤পূরক ফসল হিসেবে আউশ ধানের চাষ বাড়ানো হচ্ছে।