গ্রাহকের টাকা আত্মসাৎ ও নানা অনিয়মের কারণে দেশের বিপর্যস্ত বীমা খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে চান নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটির (আইডিআরএ) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনে অভিযুক্ত বীমা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়াসহ অনিয়মে জড়িত শেয়ারহোল্ডার পরিচালক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) অপসারণ এবং পুনরায় ফিরতে না দেওয়ায় আইডিআরএর স্থায়ী ক্ষমতা চান তিনি।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া বলেন, মাত্র সাতটি জীবন বীমা কোম্পানির কাছে গ্রাহকের দাবিকৃত সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা রয়েছে। ওই কোম্পানিগুলোর সম্পদ নগদায়ন করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এক থেকে দুই মসের মধ্যে গ্রাহকের দাবিকৃত টাকা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। সরকারের নির্দেশে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মতিঝিলে আইডিআরএ প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় আইডিআরএর নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন এ কথা বলেন। তিনি জানান, বীমা খাতে গ্রাহক দাবির মোট ৭ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা অভিযুক্ত সাতটি কোম্পানিতে। কোম্পানিগুলোর নাম তিনি প্রকাশ করেননি।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, বীমা খাতে এ মুহূর্তে বড় সংকট হলো গ্রাহকদের আস্থা ভেঙে পড়েছে। বীমা খাতে লাইফ ও নন-লাইফ মিলিয়ে ৮২টি কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে কিছু কোম্পানি গ্রাহকদের মেয়াদোত্তীর্ণ বিমা স্কিমের বিপরীতে দাবিকৃত অর্থ ফেরত দেয়নি। এ অর্থ কোথায় গেছে, কী অবস্থায় আছে কিংবা আদৌ আছে কি না, তা জানতে অভিযুক্ত ওই সাত কোম্পানির সঙ্গে ওয়ান-টু-ওয়ান কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। তারা তাদের সম্পদের বিদ্যমান অবস্থার বিবরণ দিয়েছে এবং ওই সম্পদ নগদায়ন করে গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে সম্মত হয়েছে।
তিনি জানান, অভিযুক্ত সাত বীমা কোম্পানির সম্পদের হিসাবে রয়েছে জমি, এফডিআর ও ট্রেজারি বিল-বন্ড। ওই সম্পদ নগদায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা নেওয়া হবে। প্রত্যেক বিমা কোম্পানির সম্পদ নগদায়ন করে পৃথক ব্যাংক হিসাবে রাখা হবে; যেন সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কেউ এ অর্থ স্থানান্তর করতে না পারে। এ জন্য ব্যাংক হিসাবও খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যেসব বীমা কোম্পানি গ্রাহকের টাকা আত্মসাৎ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি আত্মসাৎকৃত বা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া অর্থও পুনরুদ্ধার করা হবে। তবে, রাতারাতি নয়; এ জন্য সময় লাগবে। অনুসন্ধান, তথ্য যাচাই-বাছাই এবং প্রমাণাদি জোগাড় করা ছাড়াও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রস্তাবিত আইডিআরএর সংস্কার-সংক্রান্ত সুপারিশমালা আরও বিশদভাবে পর্যালোচনা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আইডিআরএ কোনো বিমা কোম্পানির পরিচালক বা পর্ষদ কিংবা এমডিকে সরাসরি অপসারণ করতে পারে না। এ ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা সাময়িকভাবে নিলেও বিদ্যমান বিধিমালার আওতায় তারা আবারও স্ব-পদে একই কোম্পানিতে ফিরে আসার সুযোগ পায়। এ কারণে সংশ্লিষ্টরা আইডিআরএকে অতটা গুরুত্ব দেয় না এবং এটি অনিয়ম প্রতিরোধ ও আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরানোর পথে বড় ধরনের বাধা। এ জন্যই এমডি বা পর্ষদ অপসারণ এবং পুনরায় তাদের ফিরতে না দিতে আইডিআরএর স্থায়ী ক্ষমতা প্রয়োজন।’
আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, ‘সরকার আমাকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকেও সহযোগিতা পাচ্ছি। এখানকার সহকর্মী এবং এ খাতের স্টেকহোল্ডারদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি। এসবই আমার কাজে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে। উন্নত বিশে^ বীমা একটি বিস্বস্ত খাত। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা তৈরিতে এ খাতের ভূমিকা অনেক। সরকারের পক্ষ থেকে আমাকে এ খাতটিকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে এখানে বসানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাকে আগে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট করতে হবে। তারপর স্ট্যাবিলিটি ফেরানোর কাজে হাত দেব। যারা দীর্ঘদিন ধরে বীমা খাতে শীর্ষ পর্যায়ে কাজ করছেন, তাদের মধ্যে বিতর্কিত ব্যক্তিদের ব্যাপারে বিশদ অনুসন্ধান করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আইডিআরএতে জনবলের সংকট রয়েছে। সরকারের কাছে এ সম্পর্কিত একটি প্রস্তাবও অনুমোদনের জন্য দেওয়া আছে।’