ফের ভাঙছে পাকিস্তান!

পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানে বছরের পর বছর অস্থিরতা বিরাজ করছে। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সেই সংকট আরও প্রকট হয়েছে। অঞ্চলটিতে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর ওপর একের পর এক হামলা পাকিস্তানের জন্য যেমন মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে, তেমনি স্বাধীনতার দাবিতে খনিজ সমৃদ্ধ অঞ্চলটি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কাও বাড়ছে। বেলুচিস্তান পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে সম্প্রতি এমন একটি দাবি সংবলিত বিবৃতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’ (বেলুচিস্তান প্রজাতন্ত্র) নামে ভাইরাল ওই বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, প্রদেশটি নিজেদের স্বাধীন বলে ঘোষণা করেছে এবং বর্তমানে তাদের ভূখণ্ডের ৮৫ শতাংশ এলাকার ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ওই বিবৃতিতে বেলুচিস্তানের জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত, নতুন মুদ্রা ও স্বাধীন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও জানানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে পাকিস্তানি কর্র্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য না আসায় জল্পনা-কল্পনাও ডালপালা মেলছে। প্রশ্ন উঠেছে আবারও কি ভাঙছে পাকিস্তান? ফলে একদিকে আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাত, অন্যদিকে বেলুচিস্তানের ক্রমবর্ধমান সংকট পাকিস্তানকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

ডন, জিও নিউজ, আল জাজিরা, রয়টার্স ও এপিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বেলুচিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে গুরুতর। কয়েক দশকের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘাত এখন আরও সংগঠিত, প্রাণঘাতী ও বিস্তৃত রূপ নিয়েছে। ভাইরাল ওই বিবৃতির বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ১৮’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেলুচিস্তান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে এবং নিজেদের জাতীয় সংগীত ‘মা চুকাইন বালুচানি’ ও জাতীয় পতাকা গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে তারা ‘বেলুচি ফালুস’ নামে নিজস্ব মুদ্রা চালু করেছে। নতুন প্রশাসন ওই অঞ্চলের খনিজ সম্পদ, গ্যাসক্ষেত্র এবং কয়লাখনিগুলোর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, ‘এই উন্নয়নগুলো বেলুচিস্তানকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির যোগ্য করে তুলেছে। আমরা এখন বেলুচিস্তান প্রজাতন্ত্রের সোনা ও তামার খনিগুলো, ১৫০টিরও বেশি গ্যাসক্ষেত্র এবং ১ হাজার ২০০টিরও বেশি সচল কয়লাখনি নিয়ন্ত্রণ করছি। তাদের দাবি, এই স্বীকৃতি এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে এবং পাকিস্তানের কয়েক দশকের বৈরিতার অবসান ঘটাবে। বিবৃতিতে আরও বলা হয় পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর অনেক কর্মকর্তা পদত্যাগ করে বেলুচ পক্ষে যোগ দিয়েছেন। নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বাহিনী দিয়ে ‘বেলুচিস্তান রাষ্ট্র’ তারা শাসন করছেন বলেও এতে দাবি করা হয়।

বেলুচ নেতা মীর ইয়ার বেলুচ নিউজ এইটিনের কাছে দাবি করেছেন, ওই অঞ্চলের মানুষ পাকিস্তানে তাদের অন্তর্ভুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধ করছে আর যত দ্রুত সম্ভব তাদের অঞ্চলটি ত্যাগ করতে বলেছে। তিনি বলেন, বেলুচিস্তান প্রজাতন্ত্রের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বালুচদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের পায়ের তলার মাটি হারাচ্ছে এবং এখন তারা কেবল বিমানবাহিনীর ওপর নির্ভর করছে। প্রদেশটিতে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ নতুন কিছু নয়। তবে বেলুচিস্তানের বর্তমান বিদ্রোহ আগের অনেক পর্যায়ের তুলনায় ভিন্ন। একসময় আন্দোলনটি মূলত কয়েকজন প্রভাবশালী উপজাতীয় নেতা ও দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সীমিত ছিল। এখন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণ, শহুরে জনগোষ্ঠী এবং এমনকি নারীরাও আন্দোলনের বিভিন্ন ধারায় যুক্ত হয়েছেন। গত কয়েক বছরে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এবং অন্য বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো হামলার পরিধি বাড়িয়েছে। তারা সামরিক ঘাঁটি, পুলিশ স্টেশন, মহাসড়ক, রেলপথ, সরকারি স্থাপনা এবং চীনা স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্পকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। বড় শহরের বাইরে প্রত্যন্ত এলাকায় সাময়িকভাবে সড়ক অবরোধ, তল্লাশি চৌকি স্থাপন কিংবা ছোট শহরে প্রবেশ করে হামলা চালানোর ঘটনাও ঘটেছে।  ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিএলএ ‘অপারেশন হেরোফ ২.০’ নামে বেলুচিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় সমন্বিত হামলা চালানোর দাবি করে।

বেলুচিস্তান কি আসলেই স্বাধীন

বেলুচিস্তানের ভূখণ্ড বিশাল। এটি পাকিস্তানের মোট আয়তনের প্রায় ৪৪ শতাংশ। কিন্তু সেখানে দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশ মানুষ বাস করে। ভূখণ্ডের দিক থেকে প্রদেশটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও জনসংখ্যা কম এবং বসতি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বেলুচিস্তান পাকিস্তান থেকে কার্যকরভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে কিংবা বিএলএ প্রদেশটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ নেই। বরং বেলুচিস্তানের ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনার বড় অংশের উৎস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু বিবৃতি, পোস্ট ও অযাচাইকৃত দাবি। এগুলোর সঙ্গে বিএলএর সশস্ত্র তৎপরতা এবং দীর্ঘদিনের স্বাধীনতাকামী আন্দোলনকে মিলিয়ে এই ধারণা তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। চলতি বছর জুলাইয়ে বেলুচিস্তানে কয়েকটি বড় হামলার পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ভাষ্য, ৬ জুলাই থেকে কয়েক দিনের মধ্যে ৩টি বড় হামলায় অন্তত ৪২ জন পুলিশ ও সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে জিয়ারাত অঞ্চলের মাঙ্গি বাঁধের কাছে একটি পুলিশ পোস্টে হামলা চালিয়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে অপহরণ করা হয়। পরে অপহৃত ১৮ পুলিশ সদস্যের মরদেহ পাওয়া যায়। পৃথক আরেক হামলায় নিহত হন ১১ সেনা সদস্য।

পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী এরপর বেলুচিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের অভিযান শুরু করে। সেনাবাহিনী, ফ্রন্টিয়ার কোর ও পুলিশ যৌথভাবে এসব অভিযানে অংশ নেয়। পাকিস্তানি কর্র্তৃপক্ষ দাবি করেছে, কয়েক দিনের অভিযানে বহু সশস্ত্র যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। তবে সংঘাতপূর্ণ ও দুর্গম এলাকায় স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের প্রবেশ সীমিত হওয়ায় উভয় পক্ষের হতাহতের দাবি আলাদাভাবে যাচাই করা কঠিন। পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমদ শরিফ চৌধুরী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উদ্দেশে কঠোর ভাষায় বলেছেন, ‘আমরা তোমাদের ধাওয়া করব, আমরা তোমাদের আঘাত করব।’ তার বক্তব্যে স্পষ্ট, ইসলামাবাদ বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের কর্র্তৃত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে।

কিন্তু বর্তমান আন্দোলন কেবল ইতিহাসের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদের মালিকানা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামরিক উপস্থিতি, নিখোঁজ ব্যক্তি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ। বেলুচিস্তানে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, তামা ও সোনার মজুদ রয়েছে। আরব সাগরের তীরে অবস্থিত গভীর সমুদ্রবন্দর গদরও এই প্রদেশে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর বা সিপেকের অন্যতম কেন্দ্র গদর বন্দর। বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের অভিযোগ, তাদের ভূখণ্ডের সম্পদ ব্যবহার করে পাকিস্তানের অন্য অঞ্চল উন্নত হয়েছে, কিন্তু স্থানীয় জনগণ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, বিশুদ্ধ পানি ও অবকাঠামোর ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। অনেকের অভিযোগ, বড় উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ সীমিত এবং প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তার নামে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। বেলুচ মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি গত দুই দশকে বহু ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক ও সন্দেহভাজন বিচ্ছিন্নতাবাদীকে নিরাপত্তা বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে। অনেকের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। আবার কারও মরদেহ পরে প্রত্যন্ত এলাকায় পাওয়া গেছে।

পাকিস্তান কী বলছে

এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেয়নি পাকিস্তান সরকার। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এখনো প্রদেশটির বড় শহর, সরকারি প্রতিষ্ঠান, সীমান্ত, বিমানবন্দর, বন্দর ও প্রধান অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। কোয়েটায় প্রাদেশিক সরকার কার্যকর রয়েছে। পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে, প্রাদেশিক সরকার বিলুপ্ত হয়েছে কিংবা বিএলএ স্থায়ীভাবে বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে এমন প্রমাণও পাওয়া যায়নি।