ওয়াশিংটন পোস্ট-ইপসোসের জরিপ

ইরান ইস্যুতে চাপে ট্রাম্প, ‘ভালো চুক্তি’র প্রতিশ্রুতিতে নেই জনআস্থা

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পক্ষে জনসমর্থন তৈরি করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার একটি যুক্তি তুলে ধরেছেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) ছিল একটি বিপর্যয়, আর তিনি এর চেয়ে অনেক ভালো একটি চুক্তি করতে সক্ষম হবেন।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ট্রাম্প এই চুক্তির প্রসঙ্গ তিন ডজনেরও বেশি বার উল্লেখ করেছেন বলে সিএনএনের এক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। কিন্তু নতুন এক জরিপে দেখা যাচ্ছে, এই প্রচারণা মার্কিন জনগণের বড় অংশকে আশ্বস্ত করতে পারেনি।

ওয়াশিংটন পোস্ট-ইপসোসের নতুন জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ২৩ শতাংশ মার্কিনি মনে করেন ট্রাম্প ২০১৫ সালে ওবামার করা চুক্তির চেয়ে ভালো কোনো ইরান চুক্তি আনতে পারবেন। বিপরীতে ৩৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন ট্রাম্পের সম্ভাব্য চুক্তি ওবামার চুক্তির চেয়েও খারাপ হবে। অর্থাৎ, ভালো চুক্তি হবে বলে বিশ্বাস করা মানুষের চেয়ে খারাপ হবে বলে মনে করা মানুষের সংখ্যা ১৪ শতাংশ বেশি।

আরও ১২ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, দুই প্রেসিডেন্টের চুক্তির মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য থাকবে না। বাকিরা কোনো মতামত জানাননি।

এমনকি রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও ট্রাম্পের ওপর পূর্ণ আস্থা নেই। মাত্র ৫৪ শতাংশ রিপাবলিকান মনে করেন, ট্রাম্প ওবামার চেয়ে ভালো একটি চুক্তি করতে পারবেন। তবে এই সমর্থন মূলত ট্রাম্পের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সমর্থকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ম্যাগা সমর্থকদের ৭০ শতাংশ বিশ্বাস করেন ট্রাম্প ভালো চুক্তি আনবেন। অন্যদিকে নন-ম্যাগা রিপাবলিকানদের মধ্যে মতামত প্রায় সমান ভাগে বিভক্ত, ২৭ শতাংশ মনে করেন ট্রাম্পের চুক্তি ভালো হবে, আর ২৩ শতাংশ মনে করেন ওবামার চুক্তিই তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল।

স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ মনে করেন ট্রাম্প ভালো চুক্তি করতে পারবেন।

এই ফলাফল ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের রাজনৈতিক সমস্যাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। তিনি এমন একটি যুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ার চেষ্টা করছেন, যা ধীরে ধীরে তার জন্য রাজনৈতিক বোঝায় পরিণত হচ্ছে।

অবশ্য অনেক মার্কিনি ২০১৫ সালের যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা এর বিস্তারিত শর্ত সম্পর্কে কতটা জানেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। চুক্তিটি ছিল অত্যন্ত জটিল একটি কূটনৈতিক সমঝোতা। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে প্রায় নয় বছর আগে এই চুক্তি বাতিল করেছিলেন এবং এরপর থেকে এটিকে কঠোরভাবে সমালোচনা করে আসছেন।

তবে বিষয়টি হলো, ওবামার সময়েও জেসিপিওএ চুক্তিটি খুব জনপ্রিয় ছিল না। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা যায়, ৪৯ শতাংশ মার্কিনি চুক্তিটির বিরোধিতা করেছিলেন, আর সমর্থন করেছিলেন মাত্র ২১ শতাংশ। ২০১৬ সালের শুরুতে গ্যালাপের এক জরিপে দেখা যায়, চুক্তির বিরোধিতা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭ শতাংশে, আর সমর্থন ছিল ৩০ শতাংশ।

 

গত কয়েক মাস ধরে ট্রাম্প নিয়মিতভাবে ওবামার চুক্তিকে আক্রমণ করে আসছেন। তিনি এটিকে ইরানের প্রতি অতিরিক্ত ছাড় দেওয়া একটি দুর্বল চুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং দাবি করেছেন, এর ফলে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগিয়ে যাচ্ছিল।

সম্প্রতি মিশরের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানিরা ওবামাকে উপহাস করেছিল। আবার ফক্স নিউজে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জেসিপিওএ-কে যুক্তরাষ্ট্রের করা 'সবচেয়ে খারাপ চুক্তি' বলে মন্তব্য করেন এবং চুক্তির পেছনে ওবামার উদ্দেশ্য নিয়েও কোনো প্রমাণ ছাড়াই প্রশ্ন তোলেন।

ট্রাম্পের জন্য আরও বড় সমস্যা হলো, তিনি নিজের নির্ধারিত মানদণ্ডেই জনসমর্থন হারাচ্ছেন। তিনি ইরানকে ঠেকাতে কূটনীতির পরিবর্তে সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছেন। এই যুদ্ধে এক ডজনের বেশি মার্কিন নাগরিক প্রাণ হারিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যয় করতে হয়েছে কয়েক হাজার কোটি ডলার এবং বিশ্ব অর্থনীতিতেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

এরপরও অনেক মার্কিনি মনে করছেন না যে যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ঠেকানো সম্ভব হবে। বরং জরিপে দেখা গেছে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আমেরিকান মনে করেন এই যুদ্ধ ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে না।

ওয়াশিংটন পোস্ট-ইপসোস এর এই জরিপে আরও দেখা গেছে, ৬৮ শতাংশ মার্কিনি মনে করেন ইরান যুদ্ধ শুরু করাই উচিত ছিল না। এই হার ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের ক্ষেত্রেও দেখা জনঅসন্তোষের চেয়েও বেশি। একই সঙ্গে ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষ বেড়ে ৬৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তার জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সবমিলিয়ে, ট্রাম্প যে লক্ষ্য সামনে রেখে ইরান নীতি পরিচালনা করছেন, সেই লক্ষ্য পূরণের বিষয়ে জনগণের আস্থা কমছে। তিনি দাবি করেছিলেন, ওবামার চুক্তির চেয়ে ভালো একটি সমঝোতা তিনি আনবেন। কিন্তু বর্তমান জনমত বলছে, অনেক আমেরিকান মনে করছেন সেই প্রতিশ্রুতিও পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা কম।