চীনের নতুন এআই জোট

প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণে বাড়ছে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) প্রযুক্তিতে বৈশ্বিক সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষে নতুন একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠন করেছে চীন। দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং শুক্রবার (১৭ জুলাই) সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সম্মেলনে এআই প্রযুক্তি উন্নয়নে সব দেশকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।

শি জিনপিং বলেন, কোনো একটি দেশের একক আধিপত্যের পরিবর্তে এআই উন্নয়ন হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে। তার এই বক্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি পরোক্ষ বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। বর্তমানে এআই ও আধুনিক প্রযুক্তি খাতে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে।

MixCollage-17-Jul-2026-08-47-PM-9774

নতুন জোট ‘ওয়াইকো’

চীন ১৬ জুলাই ‘ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন’ (ওয়াইকো) নামে নতুন একটি জোট গঠন করেছে।

এই জোটের লক্ষ্য হলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে এআই প্রযুক্তি নিয়ে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা এবং এমন নীতিমালা তৈরি করা, যাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিরাপদ ও মানবকল্যাণে ব্যবহার করা যায়।

সাংহাইভিত্তিক এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ২৯টি দেশ। এর মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সেনেগাল, রাশিয়া ও পাকিস্তানের মতো গ্লোবাল সাউথভুক্ত দেশ।

জোট গঠনের অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

বিশ্ব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সম্মেলনে শি জিনপিং বলেন, উন্মুক্ত উৎসভিত্তিক (ওপেন সোর্স) এআই প্রযুক্তি বিশ্বের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, এআই উন্নয়ন কোনো একটি দেশের একক প্রদর্শনী হওয়া উচিত নয়, এটি হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বিত প্রচেষ্টা।

শি আরও বলেন, এআই খাতে জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাকে অতিরিক্ত বিস্তৃত করা বা একটি দেশের নিরাপত্তাকে অন্য দেশের ওপর প্রাধান্য দেওয়া উচিত নয়।

তিনি মানবকেন্দ্রিক এআই ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ সবসময় মানুষের হাতে থাকা প্রয়োজন। এজন্য প্রয়োজন কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত নজরদারি, আগাম সতর্কতা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার ব্যবস্থা।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রযুক্তি লড়াই

এআই প্রযুক্তি বর্তমানে চীনের শিল্পনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চীন চিপ উৎপাদন থেকে শুরু করে এআই ব্যবহারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজস্ব প্রযুক্তি অবকাঠামো গড়ে তুলতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে।

অন্যদিকে, উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও এআই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলছে ‘চিপ যুদ্ধ’।

যদিও সবচেয়ে আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর ব্যবহারের ক্ষেত্রে চীন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় পিছিয়ে আছে, তবে বড় ডেটা সেন্টার পরিচালনা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিরল খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে দেশটির বড় সুবিধা রয়েছে।

চীন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ রেয়ার আর্থ মিনারেল বা বিরল খনিজের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যা আধুনিক প্রযুক্তি ও চিপ তৈরিতে প্রয়োজন হয়।

যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ এ জোট

বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াইকো জোটের মাধ্যমে চীন শুধু এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন নয়, বরং ভবিষ্যতের বৈশ্বিক এআই নীতিমালা তৈরিতেও প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে।

তাদের ধারণা, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এআই নিয়ন্ত্রণের নিয়ম-কানুন তৈরিতে এই জোট চীনের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে।

চীন দীর্ঘদিন ধরে ইন্টারনেট ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। এবার এআই প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে বিস্তারের আগেই নিজেদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে বেইজিং।

এআই নীতিতে নতুন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা

বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে এর নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। বিশেষ করে সামরিক ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এ অবস্থায় চীনের নেতৃত্বে ওয়াইকো জোট গঠন এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নীতিমালা নির্ধারণে নতুন এক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সূচনা করতে পারে।