মানুষের জীবন বৈচিত্র্যময়। কখনো সুখের, কখনো দুখের, কখনো প্রাচুর্যের, কখনো সংকটের। এই পরিবর্তনশীল জীবনব্যবস্থাই মহান আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। পৃথিবী স্থায়ী সুখের আবাস নয়। এটি পরীক্ষা ও কর্মের ক্ষেত্র। তাই একজন মুমিন জানেন, বিপদাপদ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব পরিস্থিতিতেই প্রকৃত ইমান, ধৈর্য, আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা এবং মানবিকতার পরিচয় প্রকাশ পায়।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘(তিনি সেই সত্তা) যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করেন, কে আমলের দিক থেকে সর্বোত্তম।’ (সুরা মুলক ২)
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করব। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।’ (সুরা বাকারা ১৫৫)
এই আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, বিপদ-মুসিবত একজন মুমিনের জীবনে আকস্মিক নয়, বরং তা মহান আল্লাহর নির্ধারিত পরীক্ষার অংশ।
বিপদের সময় একজন মুমিনের প্রথম পরিচয় হলো, সে আল্লাহর দিকে ফিরে যায়। হতাশা, অভিযোগ কিংবা নৈরাশ্যে ভেঙে পড়ার পরিবর্তে সে বেশি বেশি দোয়া, ইস্তেগফার, তওবা ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য কামনা করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।’ (সুরা বাকারা ৪৫)
ধৈর্য মুমিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। ধৈর্য মানে শুধু কষ্ট সহ্য করা নয়, বরং বিপদের মধ্যেও আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে সঠিক পথে অবিচল থাকা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের অবস্থা বিস্ময়কর। তার প্রতিটি বিষয়ই কল্যাণকর। সুখ এলে সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে, এটি তার জন্য কল্যাণ। আর দুঃখ এলে সে ধৈর্য ধারণ করে, এটিও তার জন্য কল্যাণ।’ (সহিহ মুসলিম) এটাই একজন মুমিনের স্বতন্ত্র পরিচয়।
বিপদের সময় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তাওয়াক্কুল তথা আল্লাহর ওপর নির্ভরতা। তবে তাওয়াক্কুল মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। ইসলাম শিক্ষা দেয়, সাধ্যমতো সব ধরনের বৈধ চেষ্টা করতে হবে, তারপর ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে। তাই দুর্যোগে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া, চিকিৎসা গ্রহণ করা, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া এবং সতর্কতা অবলম্বন করা ইসলামের নির্দেশনারই অংশ।
একজন প্রকৃত মুমিন শুধু নিজের কথা ভাবেন না, অন্যের কষ্টকেও নিজের কষ্ট হিসেবে অনুভব করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতির উদাহরণ একটি দেহের মতো। দেহের একটি অঙ্গ ব্যথিত হলে পুরো দেহ জ্বর ও নিদ্রাহীনতায় কষ্ট পায়।’ (সহিহ বুখারি) তাই বন্যা, অগ্নিকাণ্ড, ঝড়, দুর্ঘটনা বা অন্য যেকোনো দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো একজন মুমিনের ইমানি দায়িত্ব।
বিপদের সময় দান-সদকার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া, তৃষ্ণার্তকে পানি দেওয়া, অসুস্থের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, আশ্রয়হীনকে আশ্রয় দেওয়া এবং এতিম-অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।’ (সহিহ মুসলিম) মানুষের সেবা করা শুধু সামাজিক কাজই নয়, এটি আল্লাহর নৈকট্য লাভেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
একজন মুমিন বিপদে আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন। তিনি জানেন, প্রতিটি ঘটনার পেছনে আল্লাহর অসীম হেকমত রয়েছে। তাই তিনি কখনো আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা পোষণ করেন না। বরং আত্মসমালোচনা করেন, নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা চান এবং ভবিষ্যৎ জীবনকে আরও সুন্দর করার সংকল্প গ্রহণ করেন।
লেখক : মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ