মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে বসবাস করতে গিয়ে মানুষ একে অপরের সঙ্গে মিশে, সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং পরস্পরের ভালো-মন্দ সম্পর্কে অবগত হয়। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, অন্যের দোষ খুঁজে বের করা এবং তা নিয়ে আলোচনা করা অনেকের কাছে যেন এক ধরনের বিনোদনে পরিণত হয়েছে। অথচ নিজের দোষত্রুটি সংশোধন এবং আত্মশুদ্ধির প্রতি মনোযোগী মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। ইসলাম মানুষকে অন্যের দোষ চর্চা থেকে বিরত থেকে নিজের চরিত্র ও আত্মার পরিশুদ্ধির দিকে মনোযোগী হতে শিক্ষা দিয়েছে। কারণ যে ব্যক্তি নিজের সংশোধনে ব্যস্ত থাকে, সে সাধারণত অন্যের সমালোচনা করার অবকাশ পায় না।
অন্যের দোষ চর্চা মানুষের একটি পুরনো দুর্বলতা। কেউ কারও সামান্য ভুল দেখলেই তা নিয়ে আলোচনা শুরু করে, অন্যের কাছে বলে বেড়ায় এবং কখনো কখনো সেই ভুলকে বাড়িয়ে উপস্থাপন করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে এ প্রবণতা আরও বেড়েছে। কারও একটি ভুল, একটি বক্তব্য কিংবা একটি ব্যক্তিগত বিষয় মুহূর্তেই হাজারো মানুষের আলোচনার বিষয় হয়ে যায়। অথচ যারা এসব আলোচনা করে, তারা অনেক সময় নিজেদের ভুল ও সীমাবদ্ধতার কথা একেবারেই ভুলে যায়।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা একে অপরের দোষ অনুসন্ধান কোরো না এবং কেউ কারো গিবত কোরো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তা ঘৃণা করো।’ (সুরা হুজুরাত ১২)
এই আয়াতে অন্যের দোষ খোঁজা এবং গিবত করাকে অত্যন্ত জঘন্য কাজ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কারণ এর মাধ্যমে মানুষের সম্মানহানি ঘটে, সমাজে বিদ্বেষ সৃষ্টি হয় এবং পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হয়।
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) অন্যের দোষ অনুসন্ধানের ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ গোপন রাখে, মহান আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন। (সহিহ মুসলিম)
অন্য হাদিসে তিনি বলেছেন, ‘তোমরা মুসলমানদের দোষ অনুসন্ধান কোরো না। কেননা যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের দোষ অনুসন্ধান করে, মহান আল্লাহ তার দোষ অনুসন্ধান করেন। আর মহান আল্লাহ যার দোষ অনুসন্ধান করেন, তাকে তার ঘরের ভেতরেও অপদস্থ করে ছাড়বেন।’ (সুনানে আবু দাউদ)
আসলে অন্যের দোষ চর্চা মানুষের আত্মিক রোগের বহিঃপ্রকাশ। অহংকার, হিংসা, আত্মতৃপ্তি এবং আত্মসমালোচনার অভাব মানুষকে এ পথে পরিচালিত করে। কেউ যখন নিজের সম্পর্কে অতিমাত্রায় ভালো ধারণা পোষণ করে, তখন সে অন্যের ভুল খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অথচ একজন প্রকৃত মুমিন সর্বদা নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে চিন্তিত থাকে। সে প্রতিনিয়ত ভাবতে থাকে, আমার ইবাদতে কোথায় ঘাটতি রয়ে গেল, আমার চরিত্রে কোথায় দুর্বলতা আছে, আমি কীভাবে মহান আল্লাহর আরও নিকটবর্তী হতে পারি।
ইসলামের ইতিহাসে আমরা আত্মশুদ্ধির অসংখ্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ছিলেন এ ক্ষেত্রে অন্যতম আদর্শ। তারা নিজেদের আমল সম্পর্কে এতটাই চিন্তিত থাকতেন যে, অন্যের দোষ নিয়ে আলোচনা করার সুযোগই পেতেন না। একজন সাহাবি বলতেন, ‘আমি যদি জানতাম মহান আল্লাহ আমার একটি সেজদা কবুল করেছেন, তাহলে পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে সেটিকে বেশি মূল্যবান মনে করতাম।’ এই অনুভূতি মানুষকে বিনয়ী করে এবং আত্মশুদ্ধির পথে পরিচালিত করে।
প্রখ্যাত তাবেয়ি হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন, ‘আমি এমন অনেক মানুষকে দেখেছি, যারা নিজেদের দোষ নিয়ে এত ব্যস্ত থাকতেন যে, অন্যের দোষ দেখার অবকাশই তাদের ছিল না।’
তিনি আরও বলেন, ‘মুমিন ব্যক্তি নিজের হিসাব নিজেই নেয়, আর মুনাফিক ব্যক্তি অন্যের হিসাব নিতে ব্যস্ত থাকে।’
এই কথার মধ্যে গভীর শিক্ষা নিহিত রয়েছে। কারণ যে ব্যক্তি নিজের ভুলের হিসাব নেয়, সে ধীরে ধীরে পরিশুদ্ধ হয়। আর যে ব্যক্তি শুধু অন্যের ভুল খোঁজে, সে নিজের উন্নতির সুযোগ হারায়।
নিজ পবিত্রতা বা আত্মশুদ্ধি ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আত্মশুদ্ধি বলতে শুধু বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা বোঝায় না, বরং অন্তরের অহংকার, হিংসা, লোভ, রিয়া, কৃপণতা ও বিদ্বেষ দূর করে হৃদয়কে আল্লাহভীতি, বিনয়, ভালোবাসা ও আন্তরিকতায় সুশোভিত করাকেও বোঝায়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই সে সফল হয়েছে, যে নিজেকে পবিত্র করেছে। আর সে ব্যর্থ হয়েছে, যে নিজেকে কলুষিত করেছে।’ (সুরা শামস ৯-১০)
একজন মানুষ যখন নিজের পরিশুদ্ধির কাজে মনোনিবেশ করে, তখন তার চরিত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। সে মানুষের ভুল দেখলেও তা প্রকাশ না করে সংশোধনের চেষ্টা করে। সে গিবত, অপবাদ ও পরনিন্দা থেকে দূরে থাকে। অন্যের ত্রুটি দেখে বলে বেড়ায় না, বরং নিজের দুর্বলতার কথা স্মরণ করে মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। এ ধরনের মানুষ সমাজে শান্তি ও সৌহার্দ্যরে পরিবেশ সৃষ্টি করে।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের ভুল নিয়ে সমালোচনা, বিদ্রƒপ ও কটূক্তি যেন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কোনো ব্যক্তি ভুল করলেই তাকে সংশোধনের পরিবর্তে নিন্দা ও অপমানের বন্যায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো, অন্যের ভুল গোপন রেখে উত্তম পন্থায় সংশোধনের চেষ্টা করা। কারণ একজন মানুষের সম্মান নষ্ট করা সহজ, কিন্তু সেই সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন।
আমাদের মনে রাখা উচিত, প্রত্যেক মানুষই ভুল করে। কেউই সম্পূর্ণ নির্ভুল নয়। আজ আমরা অন্যের দোষ নিয়ে হাসাহাসি করছি, কিন্তু আগামীকাল হয়তো একই ধরনের ভুল আমরা নিজেরাই করতে পারি। তাই অন্যের ভুল দেখে উপহাস না করে শিক্ষা গ্রহণ করা এবং নিজের সংশোধনে মনোযোগী হওয়াই একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
অন্যের দোষ চর্চা সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে, সম্পর্ক নষ্ট করে এবং মানুষের অন্তরকে কঠিন করে তোলে। পক্ষান্তরে আত্মশুদ্ধি মানুষকে বিনয়ী করে, আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সহায়তা করে এবং সমাজে ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা করে। যে ব্যক্তি নিজের সংশোধনে ব্যস্ত থাকে, সে মানুষের প্রতি দয়ালু হয় এবং তাদের জন্য কল্যাণ কামনা করে।
অন্যের দোষ চর্চা নয়, বরং নিজের আত্মশুদ্ধিই একজন মুমিনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। মানুষের বিচার করার দায়িত্ব আল্লাহর, আর নিজের সংশোধনের দায়িত্ব আমাদের নিজেদের। তাই অন্যের ত্রুটি অনুসন্ধান না করে নিজের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করতে হবে। যে ব্যক্তি নিজের দোষ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সে অন্যের দোষ দেখার সময় পায় না। আর যে ব্যক্তি নিজের আত্মাকে পবিত্র করতে পারে, সে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতেই সফলতা লাভ করে।
তাই আসুন, আমরা অন্যের সমালোচনায় নয়, বরং নিজের সংশোধন ও আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে যাই, এতেই রয়েছে ব্যক্তিগত শান্তি, সামাজিক সৌহার্দ্য এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি। মহান আল্লাহর আমাদের সকলকে সেই তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর