এই বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল শুধু আর্জেন্টিনা বনাম স্পেনের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়, এটি আসলে ফুটবল বিশ্বের সেরা সব ‘ট্যালেন্ট ফ্যাক্টরি’র মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধও বটে। দুই দলের ২৬ জন করে মোট ৫২ ফুটবলারের পেছনের গল্পটা ঘাঁটলে দেখা যায়, শৈশবের ধুলোবালি মাখা মাঠ থেকে বিশ্বমঞ্চের মহাতারকা হয়ে ওঠার পেছনে কাজ করেছে দুই দেশের ঐতিহ্যবাহী সব ফুটবল একাডেমি। বিশেষ করে স্পেনের ‘লা মাসিয়া’ এবং আর্জেন্টিনার ‘রিভার প্লেট’ ও ‘বোকা জুনিয়র্স’-এর মতো ফুটবলার তৈরির কারখানাগুলোই এবারের ফাইনালের মূল চালিকাশক্তি।
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে প্রভাবশালী একাডেমি বলা হয় বার্সেলোনার ‘লা মাসিয়া’কে। এবারের স্পেন স্কোয়াডে লা মাসিয়ার সরাসরি জয়জয়কার। স্পেনের ২৬ জনের দলে ৮ খেলোয়াড়ই এসেছেন এই একাডেমি থেকে। স্প্যানিশ ফুটবলের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ লামিনে ইয়ামাল, মাঝমাঠের জেনারেল গাভি, রক্ষণের তরুণ তুর্কি পাউ কুবারসি, এরিক গার্সিয়া, মার্ক কুকুরেয়া এবং লেভারকুসেন কাঁপানো আলেহান্দ্রো গ্রিমালদোর মতো তারকারা লা মাসিয়ারই প্রোডাক্ট। শৈশবে লা মাসিয়া মাতানো দানি ওলমোও আছেন এই তালিকায়।
তবে লা মাসিয়াই স্পেনের একমাত্র জোগানদার নয়। বাস্ক অঞ্চলের বিখ্যাত একাডেমি ‘জুভিয়েতা’ (রিয়াল সোসিয়েদাদ) থেকে এসেছেন মার্টিন জুবিমেন্দি, মিকেল ওয়ারসাবাল ও মিকেল মেরিনোর মতো মাঝমাঠের প্রধান অস্ত্ররা। অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের বিখ্যাত ‘লেজামা’ একাডেমি উপহার দিয়েছে এক নম্বর গোলরক্ষক উনাই সিমন ও গতিময় উইঙ্গার নিকো উইলিয়ামসকে। এছাড়া স্পেনের মাঝমাঠের প্রাণভোমরা রদ্রি উঠে এসেছেন আতলেতিকো মাদ্রিদের একাডেমি থেকে।
ইউরোপের মতো স্পেনে ক্লাবভিত্তিক একাডেমির ছড়াছড়ি থাকলেও, আর্জেন্টিনার শক্তি তাদের খাঁটি দেশীয় ও ঐতিহ্যবাহী একাডেমিগুলো। আলবিসেলেস্তেদের বর্তমান স্কোয়াডের সবচেয়ে বড় জোগানদার তাদের ঘরোয়া ফুটবলের সফলতম ক্লাব রিভার প্লেটের একাডেমি। বর্তমান দলের গোলমেশিন হুলিয়ান আলভারেজ, মাঝমাঠের ইঞ্জিন এনজো ফার্নান্দেজ, রক্ষণভাগের গঞ্জালো মন্তিয়েল ও এজেকিয়েল পালাসিওস সবাই রিভার প্লেটের ‘ট্যালেন্ট ফ্যাক্টরি’ থেকে উঠে আসা।
রিভার প্লেটের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বোকা জুনিয়র্সও পিছিয়ে নেই। বোকার একাডেমি থেকে বিশ্বকাপে এসেছেন মাঝমাঠের চালিকাশক্তি লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও রাইট-ব্যাক নাহুয়েল মলিনা। ডিয়েগো ম্যারাডোনার স্মৃতিধন্য ক্লাব ‘আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স’ উপহার দিয়েছে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও নিকোলাস গঞ্জালেসের মতো আধুনিক ফুটবলের প্রতিভাদের। আর ‘রেসিং ক্লাব’ থেকে উঠে এসেছেন দলের অন্যতম দুই স্তম্ভ লাউতারো মার্তিনেজ ও রদ্রিগো ডি পল। এছাড়া বাজপাখি খ্যাত এমিলিয়ানো মার্তিনেজ এসেছেন ইন্ডিপেনডিয়েন্তে একাডেমি থেকে।
আর্জেন্টিনা দল লাতিন আমেরিকার নিজস্ব একাডেমির ওপর ভর করে ফাইনালে উঠলেও, তাদের স্কোয়াডে স্প্যানিশ একাডেমির ছোঁয়াও রয়েছে। বর্তমান আর্জেন্টিনা স্কোয়াডে বার্সেলোনার কোনো খেলোয়াড় না থাকলেও, লা মাসিয়ার ইতিহাসের সর্বকালের সেরা সৃষ্টিটি কিন্তু আলবিসেলেস্তেদের আর্মব্যান্ড পরেই মাঠে নামবেন তিনি লিওনেল মেসি। শৈশব ও কৈশোর লা মাসিয়াতে কাটিয়ে ফুটবল ঈশ্বর হয়ে ওঠা মেসিই আর্জেন্টিনার লা মাসিয়া প্রতিনিধি। অন্যদিকে, দলের তরুণ তুর্কি নিকো পাজ কিন্তু বড় হয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের বিখ্যাত ‘লা ফাব্রিকা’ একাডেমিতে।
এছাড়া ক্রিস্টিয়ান রোমেরো বেলেগ্রানো একাডেমি, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ, গুইদো রদ্রিগেজ রিভার প্লেট একাডেমি, ভ্যালেন্টিন বার্কো স্পোর্ট ডন বস্কো ও বোকা জুনিয়র্স, জেরোনিমো রুলি এস্তুদিয়ান্তেস একাডেমি, ওয়াল্টার বেনিতেজ কিলমেস একাডেমি, ভালেন্টিন কার্বোনি লানুস ও ইন্টার মিলান একাডেমি, নিকোলাস পাজ তেনেরিফে ও রিয়াল মাদ্রিদ একাডেমি
আর স্পেনের ফেরান তোরেস ভ্যালেন্সিয়া একাডেমি, পেদ্রি জুভেন্টুদ লাগুনা ও লাস পালমাস একাডেমি, ফ্যাবিয়ান রুইজ রিয়াল বেতিস একাডেমি, ডেভিড রায়া কর্নেয়া ও ব্ল্যাকবার্ন রোভার্স একাডেমি, হুয়ান গার্সিয়া এস্পানিওল একাডেমি, আলেক্স বায়েনা ভিয়ারিয়াল একাডেমি, পুবিল ভিয়ারিয়াল ও লেভান্তে একাডেমি, আইয়োজে পেরেজ তেনেরিফে একাডেমি।