সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ অদেখা থাকছে

দেশের প্রাচীনতম সংগ্রহশালা বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। প্রতিদিন বিভিন্ন বয়সের দর্শনার্থী ও গবেষক ইতিহাস-ঐতিহ্যের এই ভা-ার ঘুরে দেখেন। তবে এখানে আসা দর্শনার্থীরা যে অংশটুকু দেখতে পান, তা খুবই সামান্য। এখানে সংরক্ষিত অধিকাংশ প্রত্ননিদর্শনই প্রদর্শনের সুযোগ নেই। এর প্রধান কারণ জায়গা ও গ্যালারির অভাব। জাদুঘরের গুদামঘরগুলো প্রত্ননিদর্শনে পরিপূর্ণ। বরেন্দ্র জাদুঘরের বিপুল সংগ্রহের অল্প অংশ দেখেই দর্শনার্থীরা মুগ্ধ হন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংগ্রহে থাকা প্রত্নসম্পদের অন্তত অর্ধেকও যদি সাধারণ মানুষের জন্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে গবেষক ও দর্শনার্থী উভয়েই আরও বেশি উপকৃত হতেন। একই সঙ্গে জাদুঘরে দর্শনার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ত। তবে জাদুঘর পরিচালনাকারী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কিছুটা আশার বাণী শুনিয়েছেন। তারা বলছেন, জাদুঘরের পরিসর বাড়ানোর বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি প্রত্নসম্পদ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিভাগ চালুর বিষয়েও ভাবা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়,  প্রস্তর ও ধাতব ভাস্কর্য, টেরাকোটা, মুদ্রা, পা-ুলিপি, ধাতবসামগ্রী ও শিলালিপিসহ প্রায় ১৯ হাজার প্রত্ননিদর্শন রয়েছে জাদুঘরে। এর মধ্যে মাত্র ১১০০- ১২০০ নিদর্শন প্রদর্শিত হয়। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে বহু প্রাচীন পুথি, যা বিশেষ কক্ষে রাখা হয়েছে। তবে যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে এসব পুথির অনেকগুলোই ক্ষয়ের মুখে। কোনো কোনোটি প্রায় নষ্ট হওয়ার উপক্রম। এসব পা-ুলিপির ডিজিটাল কপিও নেই জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে। ফলে অমূল্য ঐতিহাসিক সম্পদ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দেশের প্রাচীনতম সংগ্রহশালা এবং প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বঙ্গীয় ভাস্কর্যশিল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংরক্ষণাগার বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সূচনা হয় ১৯১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ‘বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। দুই বাংলার ইতিহাসে এ সমিতিই প্রথম জাদুঘর কার্যক্রম শুরু করে। দীঘাপতিয়ার রাজবংশীয় জমিদার ও প্রতœানুরাগী শরৎকুমার রায়, প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় এবং নৃতত্ত্ববিদ ও শিক্ষাবিদ রমাপ্রসাদ চন্দ্র এই সমিতির প্রতিষ্ঠাতা। বরেন্দ্র অঞ্চল ও বাংলার ইতিহাস, শিল্প, সাহিত্য, ধর্ম ও সমাজসংক্রান্ত প্রামাণ্য তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণে শরৎকুমার রায়ের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি নিজ ব্যয়ে জাদুঘর ভবন নির্মাণ করেন। ১৯৪৭ সালের পর জাদুঘরটির রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন হয়ে পড়ে। পরে ১৯৬৪ সালের ১০ অক্টোবর থেকে এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছে।

স্থান সংকুলানের অভাবে ১৯ হাজার প্রত্ননিদর্শনের মধ্যে মাত্র ১১টি গ্যালারিতে প্রায় ১২ শত নিদর্শন প্রদর্শন করা হচ্ছে। বাকিগুলো গুদামঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে দর্শনার্থীরা বিপুল এই সংগ্রহের অধিকাংশই দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান বলেন, জাদুঘরে আমাদের অনেক মূল্যবান নিদর্শন রয়েছে। এর মধ্যে কিছু পা-ুলিপি বিশ্বজুড়েই বিরল। তালপাতা ও পুরনো কাগজে লেখা হওয়ায় এগুলো ক্ষয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই এগুলো দ্রুত ডিজিটাল সংরক্ষণ এবং পর্যায়ক্রমে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের পরিচালক অধ্যাপক ড. কে এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রতিষ্ঠাকাল থেকে আমাদের সংগ্রহ ক্রমেই বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ২০০টি ভাস্কর্য রয়েছে। কিন্তু জায়গার অভাবে সব প্রদর্শন করা সম্ভব হচ্ছে না। মুদ্রার জন্যও আলাদা গ্যালারি নেই। একটি ছোট কক্ষকে মুদ্রা গ্যালারি হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মামুনুর রশিদ বলেন, বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের পাশে ১০ তলা একটি নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। ভবনটি নির্মিত হলে আরও বেশি প্রতœসম্পদ প্রদর্শন করা যাবে।