চীনের উদ্যোগে গঠিত নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংস্থার সহযোগিতা, অন্তর্ভুক্তি ও বৈশ্বিক দক্ষিণের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু এর প্রতিষ্ঠা চুক্তিতে নাগরিক সমাজ, শ্রমজীবী মানুষ কিংবা এআইয়ের প্রভাবে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আসন রাখা হয়নি।
সাংহাইয়ের মঞ্চে ২৯টি দেশের প্রতিনিধিরা এমন একটি নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিলেন, যার লক্ষ্য ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শাসনব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করা। সরকারগুলোর আসন ছিল। কূটনীতিকদের স্বাক্ষর ছিল। জাতিসংঘ মহাসচিবও উপস্থিত ছিলেন।
কিন্তু একটি চেয়ার স্পষ্টতই অনুপস্থিত ছিল: নাগরিক সমাজের চেয়ার।
এই অনুপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের বিষয় নয়। এআই এমন শ্রমিকের জীবনে প্রভাব ফেলছে, যাঁর কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যেতে পারে; এমন নারীর নিরাপত্তায় হুমকি তৈরি করছে, যিনি প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার শিকার; এমন শিশুকে প্রভাবিত করছে, যে অস্বচ্ছ অ্যালগরিদমের মুখোমুখি; এমন সাংবাদিককে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলছে, যিনি কৃত্রিমভাবে তৈরি অপতথ্য শনাক্ত করছেন; এবং এমন জনগোষ্ঠীর ভাষা ও জ্ঞান ব্যবহার করছে, যাদের মতামত ছাড়াই বাণিজ্যিক মডেল প্রশিক্ষিত হচ্ছে।
এই মানুষগুলো যদি এআইয়ের নিয়ম তৈরির টেবিলে না থাকেন, তবে ‘মানবকেন্দ্রিক শাসন’ শেষ পর্যন্ত মানুষের নামে পরিচালিত হলেও মানুষের অংশগ্রহণহীন শাসনে পরিণত হতে পারে।
একটি নতুন প্রতিষ্ঠান, একটি নতুন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা:
বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা সংস্থা বা ওয়াইকো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬ জুলাই সাংহাইয়ে। পরদিন শুরু হয় ২০২৬ সালের বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলন ও বৈশ্বিক এআই শাসনবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক। ২৯টি দেশ ওয়াইকোর প্রতিষ্ঠা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। সংস্থাটির সদর দপ্তর হবে সাংহাইয়ে।
১৭ থেকে ২০ জুলাই অনুষ্ঠিত বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলনে শতাধিক দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সরকারি প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, গবেষক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়েছেন। ‘উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য এআই অংশীদারত্ব’ প্রতিপাদ্যটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, উন্মুক্ত উৎস প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের সক্ষমতা বৃদ্ধিকে সামনে এনেছে।
এগুলো জরুরি ও যৌক্তিক অগ্রাধিকার। উন্নত কম্পিউটিং সক্ষমতা, মানসম্মত ডেটা, দক্ষ গবেষক এবং শক্তিশালী এআই মডেল এখনো অল্প কয়েকটি দেশ ও প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত। এ বৈষম্য কমানো না গেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অসমতাকে আরও গভীর করতে পারে।
ওয়াইকোর প্রতিষ্ঠা চুক্তিতে এআই বিভাজন কমানো, প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার বাড়ানো, সক্ষমতা উন্নয়ন, জাতীয় কৌশল সমন্বয়, কারিগরি মানদণ্ড, উন্মুক্ত উৎস ইকোসিস্টেম এবং জাতিসংঘের আওতাধীন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে।
উদ্দেশ্যগুলো প্রশংসনীয়। কিন্তু একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু তার ঘোষিত লক্ষ্য দিয়ে বিচার করা যায় না। দেখতে হয়, তার কাঠামোয় কারা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং কারা পারেন না।
ওয়াইকো দ্বিপক্ষীয় নয়, কিন্তু বহুপক্ষীয় অংশীজনভিত্তিকও নয় ওয়াইকোকে দ্বিপক্ষীয় নাকি বহুপক্ষীয় অংশীজনভিত্তিক প্রক্রিয়া বলা হবে, এই প্রশ্নে প্রথমেই একটি ধারণাগত পার্থক্য পরিষ্কার করা দরকার।
ওয়াইকো দ্বিপক্ষীয় নয়। দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা মূলত দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে হয়ে থাকে। ওয়াইকো একাধিক সার্বভৌম রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে গঠিত একটি বহুপাক্ষিক আন্তঃসরকারি সংস্থা।
কিন্তু বহুপাক্ষিকতা আর বহুপক্ষীয় অংশীজনভিত্তিক শাসন এক বিষয় নয়।
বহুপাক্ষিকতা সাধারণত রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতাকে বোঝায়। বহুপক্ষীয় অংশীজনভিত্তিক শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, বেসরকারি খাত, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি সম্প্রদায়, শ্রমিক সংগঠন এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরাও একটি কাঠামোবদ্ধ ও ধারাবাহিক ভূমিকা রাখেন।
ওয়াইকোর প্রতিষ্ঠা চুক্তি অনুযায়ী এটি বর্তমানে প্রথম ধরনের প্রতিষ্ঠান।
চুক্তিতে দুটি প্রধান অঙ্গের কথা বলা হয়েছে- পরিষদ ও সচিবালয়। প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্র পরিষদের সদস্য হবে এবং একটি করে ভোট পাবে। পরিষদই নীতিমালা, বাজেট, সদস্যপদ, নিয়োগ, কর্মপরিকল্পনা ও কার্যকরী দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেবে।
অসদস্য রাষ্ট্র ও আন্তঃসরকারি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে পর্যবেক্ষক করা যেতে পারে। কিন্তু নাগরিক সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাধীন গবেষক, শ্রমিক সংগঠন, কমিউনিটি প্রতিনিধি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য সমতুল্য পর্যবেক্ষক মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়নি।
চুক্তিতে সরকার, কোম্পানি, ব্যক্তি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অনুদান গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। কিন্তু অর্থ দেওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা হয়নি।
অতএব, বর্তমান কাঠামোয় ওয়াইকো বহুপাক্ষিক হলেও অর্থবহভাবে বহুপক্ষীয় অংশীজনভিত্তিক নয়।
‘সবার জন্য’ এআই, কিন্তু সবাই কি টেবিলে আছে?
এই পার্থক্য কেবল পরিভাষার বিষয় নয়। সাংহাই সম্মেলনের ঘোষণায় মানবকেন্দ্রিকতা, ন্যায়সংগততা, অন্তর্ভুক্তি, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, শ্রমিকের অধিকার, ডেটা নিরাপত্তা এবং সহযোগিতামূলক শাসনের কথা বলা হয়েছে। এআইকে মানবনিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বৈশ্বিক দক্ষিণকে প্রযুক্তি উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণে সমান সুযোগ দেওয়ার কথাও উঠে এসেছে।
এসব প্রতিশ্রুতি গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি প্রতিষ্ঠানকে শুধু তার ভাষা দিয়ে নয়, কে তার এজেন্ডা নির্ধারণ করে, কে কাজ পর্যালোচনা করে এবং কে সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে, তা দিয়েও বিচার করতে হয়। শুধু সরকারকেন্দ্রিক কাঠামো কয়েকটি ঝুঁকি তৈরি করে।
প্রথমত, সরকারের কাছে সব ধরনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান থাকে না। এআই ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত মূল্যায়নের দক্ষতা গবেষক, প্রকৌশলী, কোম্পানি এবং স্বাধীন পরীক্ষাগারের কাছেও থাকে। সামাজিক ক্ষতির বাস্তব প্রমাণ অনেক সময় সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন, নারী সংগঠন এবং স্থানীয় কমিউনিটির হাতে থাকে।
দ্বিতীয়ত, সরকার এআইয়ের নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক নয়। সরকার নিজেই এআই ক্রয়, উন্নয়ন ও ব্যবহার করে। আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক সুরক্ষা, অভিবাসন, শিক্ষা ও নজরদারিতে অ্যালগরিদম ব্যবহৃত হতে পারে। কেবল সরকার নিয়ে গঠিত একটি সংস্থা সদস্যরাষ্ট্রের নিজস্ব অপব্যবহার বা ব্যর্থতা নিয়ে কতটা স্বাধীনভাবে প্রশ্ন তুলবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব সব সময় মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে না। একটি সরকার আন্তর্জাতিকভাবে একটি দেশের পক্ষে কথা বলতে পারে, কিন্তু দেশের ভেতরে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, সংখ্যালঘু ভাষাভাষী মানুষ, শ্রমিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা অ্যালগরিদমিক বৈষম্যের শিকার নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত নাও করতে পারে।
চতুর্থত, কোনো সম্মেলনে উপস্থিত থাকা আর প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা থাকা এক নয়। ব্যবসায়ী, গবেষক বা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলনে বক্তব্য দিতে পারেন। কিন্তু তাতে তাঁরা ওয়াইকোর এজেন্ডা প্রস্তাব, বাজেট পর্যালোচনা, মানদণ্ড যাচাই বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারবেন, এমন নিশ্চয়তা তৈরি হয় না।
আমন্ত্রণনির্ভর অংশগ্রহণ নিরাপদ অংশগ্রহণ নয়। সমালোচনামূলক কণ্ঠকে বাদ দেওয়া কিংবা কেবল অনুগত সংগঠনকে আমন্ত্রণ জানানোর সুযোগ সেখানে থেকেই যায়।
আন্তঃসরকারি কাঠামো নিজেই সমস্যা নয় এখানে একটি ভারসাম্য জরুরি। আন্তঃসরকারি প্রতিষ্ঠান মানেই অগণতান্ত্রিক বা অগ্রহণযোগ্য, এমন নয়।
চুক্তি করা, আর্থিক দায় গ্রহণ এবং জাতীয় স্বার্থ প্রতিনিধিত্ব করার আইনগত ক্ষমতা রাষ্ট্রের রয়েছে। বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ছাড়া কার্যকর হতে পারে না। বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোরও যৌক্তিক উদ্বেগ আছে, যাতে আন্তর্জাতিক এআই শাসনব্যবস্থা কেবল বড় প্রযুক্তি কোম্পানি কিংবা কয়েকটি ধনী দেশের নিয়ন্ত্রণে না যায়।
বহুপক্ষীয় অংশীজনভিত্তিক মডেলও সব সময় সমান বা ন্যায়সংগত হয় না। বড় কোম্পানিগুলো বৃহৎ প্রতিনিধিদল, অর্থ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সরাসরি যোগাযোগের সুবিধা নিয়ে হাজির হয়। অন্যদিকে, ছোট নাগরিক সংগঠন অনেক সময় কেবল প্রতীকী উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ থাকে।
তাই সমাধান সরকারকে সরিয়ে কোম্পানি বা এনজিওকে বসানো নয়। সমাধান হলো রাষ্ট্রের আইনগত কর্তৃত্ব বজায় রেখে নাগরিক সমাজ, বিজ্ঞানী, শ্রমিক ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকে প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। প্রশ্নটি সরকার নেতৃত্ব দেবে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো সরকার একাই শাসন করবে কি না।
জাতিসংঘের প্রক্রিয়ার সঙ্গে পার্থক্য: ওয়াইকোর প্রতিষ্ঠা চুক্তিতে জাতিসংঘের আওতাধীন এআই শাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ওয়াইকো জাতিসংঘের কোনো অঙ্গ নয়। জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানে উপস্থিতি সংস্থাটিকে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠানেও পরিণত করে না।
জাতিসংঘের বৈশ্বিক এআই শাসন সংলাপে ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, বেসরকারি খাত, একাডেমিয়া ও প্রযুক্তি সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণের ব্যবস্থা রয়েছে। এই অংশগ্রহণ নিখুঁত নয় এবং সবার সমান ভোটাধিকারও নেই। তবু সেখানে একটি নীতি স্বীকৃত হয়েছে: এআই শাসন শুধু সরকারি মন্ত্রণালয়ের জ্ঞান ও বৈধতার ওপর নির্ভর করতে পারে না।
ওয়াইকো যদি সত্যিই বৈশ্বিক সহযোগিতাকে শক্তিশালী করতে চায়, তবে তাকে জাতিসংঘের সর্বজনীন প্রক্রিয়ার পরিপূরক হতে হবে, প্রতিদ্বন্দ্বী বলয় তৈরির মাধ্যম নয়।
ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি: ওয়াইকোর জন্ম এমন এক সময়, যখন চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা, চিপ, ক্লাউড অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিয়ে প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে।
চীন নিজেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত অংশীদার হিসেবে তুলে ধরছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপও নিজেদের প্রযুক্তি অংশীদারত্ব ও নীতিগত কাঠামো বিস্তৃত করছে।
এই প্রতিযোগিতা বৈশ্বিক দক্ষিণের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। দেশগুলো প্রশিক্ষণ, বিনিয়োগ, কম্পিউটিং সুবিধা এবং দর-কষাকষির নতুন ক্ষেত্র পেতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ব প্রতিদ্বন্দ্বী প্রযুক্তি বলয়ে বিভক্ত হওয়ার ঝুঁকিও আছে।
এখানেই নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ জরুরি। সরকার হয়তো কোনো প্রযুক্তি অংশীদারত্বকে বিনিয়োগ, কূটনীতি বা জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিতে দেখবে। নাগরিক সমাজ ভিন্ন প্রশ্ন তুলতে পারে: এই প্রযুক্তি কি নজরদারি বাড়াবে? তথ্যের মালিক কে হবে? নাগরিক কি স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার পাবেন? স্থানীয় গবেষকরা কি সক্ষমতা অর্জন করবেন, নাকি দেশটি বিদেশি সরবরাহকারীর ওপর আরও নির্ভরশীল হবে?
এসব প্রশ্ন বাদ পড়লে ওয়াইকো বৈশ্বিক সহযোগিতার বদলে ভূরাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণের প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে।
করণীয়: নাগরিক সমাজকে কাঠামোর ভেতরে আনতে হবে। ওয়াইকোর কার্যপ্রণালি স্থায়ীভাবে গড়ে ওঠার আগেই এই ঘাটতি পূরণের সুযোগ রয়েছে।
প্রথমত, পরিষদের অধীনে একটি স্থায়ী নাগরিক সমাজ ও জনস্বার্থ ফোরাম গঠন করতে হবে। এটি যেন সম্মেলনের পার্শ্ব-অনুষ্ঠান না হয়। ফোরামকে সুপারিশ জমা, এজেন্ডা প্রস্তাব, প্রকাশ্য নথি পর্যালোচনা এবং পরিষদের বৈঠকে বক্তব্য দেওয়ার অধিকার দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, অংশগ্রহণ শুধু বড় আন্তর্জাতিক এনজিওতে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। স্থানীয় সংগঠন, কমিউনিটি মিডিয়া, ট্রেড ইউনিয়ন, নারী অধিকার সংগঠন, যুব নেটওয়ার্ক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন, ভোক্তা অধিকারকর্মী এবং ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রতিনিধি নির্বাচনে স্বচ্ছতা, আঞ্চলিক ভারসাম্য, লিঙ্গসমতা এবং অংশীজন বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সরকারপন্থী সংগঠন বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
চতুর্থত, স্বাধীন বৈজ্ঞানিক, মানবাধিকার ও সামাজিক প্রভাববিষয়ক পরামর্শক ব্যবস্থা গঠন করতে হবে। সদস্যরাষ্ট্র বা প্রযুক্তি কোম্পানির সমালোচনা থাকলেও তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।
পঞ্চমত, খসড়া মানদণ্ড ও নীতিগত সুপারিশ গ্রহণের আগে জনপরামর্শ করতে হবে। বৈঠকের এজেন্ডা, বাজেট, বড় অনুদান, স্বার্থের সংঘাত এবং বাস্তবায়ন প্রতিবেদনও প্রকাশযোগ্য হতে হবে।
ষষ্ঠত, এআই ব্যবস্থার ক্ষতি, বৈষম্য বা অপব্যবহারের অভিযোগ জানানোর একটি আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকতে হবে। জবাবদিহির পথ ছাড়া অংশগ্রহণ অর্থহীন।
বাংলাদেশেরও প্রশ্ন তোলা উচিত: বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি শুধু ওয়াইকোতে যোগ দেওয়া হবে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কেমন একটি ওয়াইকো দেখতে চায় এবং সেখানে কী পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নেবে।
সদস্যপদ বিবেচনার আগে সরকারকে জাতীয় পর্যায়ে বহুপক্ষীয় অংশীজন পরামর্শ আয়োজন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, কমিউনিটি মিডিয়া, শ্রমিক, নারী, তরুণ ও স্বাধীন গবেষকদের এতে যুক্ত করতে হবে।
চুক্তির আইনি বাধ্যবাধকতা, আর্থিক চাঁদা, ভোটব্যবস্থা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জাতিসংঘের সঙ্গে সম্পর্ক পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বাংলাদেশকে নির্ধারণ করতে হবে, সদস্যপদের বিনিময়ে দেশ কী চাইবে: সাশ্রয়ী কম্পিউটিং সুবিধা, বাংলা ও আঞ্চলিক ভাষার এআই, গবেষণা সহযোগিতা, জনস্বার্থভিত্তিক অবকাঠামো, শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা এবং কৃষি, স্বাস্থ্য, জলবায়ু ও দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সহায়তা।
বাংলাদেশ ওয়াইকোর ভেতরে বৈশ্বিক দক্ষিণের নাগরিক সমাজের জন্য আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ কাঠামোর প্রস্তাবও দিতে পারে। এতে দেশটি শুধু সক্ষমতা সহায়তার সম্ভাব্য গ্রহীতা নয়, প্রতিষ্ঠানের নকশা গঠনের অংশীদার হিসেবেও আবির্ভূত হবে।
দ্রুত সদস্য হওয়া কূটনৈতিক দৃশ্যমানতা দিতে পারে। কিন্তু চিন্তাশীল শর্ত ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে যোগদান দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সৃষ্টি করতে পারে।
‘সবার জন্য এআই’-এর প্রকৃত পরীক্ষা: ওয়াইকো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারে। উন্নয়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিতে অসম প্রবেশাধিকারের প্রশ্নকে সামনে আনার মধ্যে এর বড় সম্ভাবনা রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর শুধু নৈতিক ঘোষণা নয়, কম্পিউটিং শক্তি, দক্ষ জনবল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রভাব প্রয়োজন।
কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানের বৈধতা শুধু প্রতিষ্ঠা চুক্তির পেছনে কতটি দেশের পতাকা রয়েছে, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষকে শ্রেণিবিন্যাস করে, তাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্তের সুপারিশ দেয়, আচরণ পূর্বানুমান করে এবং তথ্য ও সুযোগে প্রবেশাধিকার প্রভাবিত করে। তাই সেই মানুষদেরও এর শাসনে অংশ নিতে হবে।
নাগরিক সমাজের জন্য একটি চেয়ার কোনো অলংকার নয়। এটি প্রমাণ করবে, ‘সবার কল্যাণে এআই’ বলতে মানুষকে শুধু সুবিধাভোগী, ব্যবহারকারী কিংবা ডেটার উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অধিকারসম্পন্ন অংশীদার হিসেবেও স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।
ওয়াইকো রাষ্ট্রগুলোর জন্য টেবিল তৈরি করেছে। এখন তার সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: সমাজের জন্য কি সেখানে জায়গা হবে?
লেখক:ডিজিটাল গণতন্ত্র, তথ্যের অখণ্ডতা ও গণমাধ্যম উন্নয়ন নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ, দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সবিষয়ক অ্যাম্বাসেডর।