‘সম্পর্কের নাম দিয়েছিলাম স্বামী-স্ত্রী’— লেখে কনস্টেবলের শেষ যাত্রা

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০২:২২ পিএম

রাজধানীর ডেমরা পুলিশ লাইনের বহুতল ভবনের একটি কক্ষ থেকে সাইদুল ইসলাম (২১) নামের এক পুলিশ কনস্টেবলের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মৃত্যুর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া তার কয়েকটি পোস্টে গভীর মানসিক কষ্ট ও একটি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার বেদনার কথা উঠে এসেছে। পরিবার বলছে, পারিবারিক কলহের কারণে কিছুদিন ধরে তিনি বিষণ্নতায় ভুগছিলেন।

শুক্রবার (১৭ জুলাই) ভোর পাঁচটার দিকে অচেতন অবস্থায় সাইদুলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত সাইদুল ফেনী সদর উপজেলার লেমুয়া উত্তর চাঁদপুর গ্রামের মো. সাদেকের ছেলে। তার পুলিশ বিপি নম্বর ০৭২৬২৬৬৪৬৫। তিনি ডেমরা পুলিশ লাইনের ২০ তলা ভবনের নবম তলার একটি কক্ষে থাকতেন। চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে তিনি পুলিশ কনস্টেবল পদে যোগ দেন।

জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ডেমরা পুলিশ লাইনের ওই ভবনের একটি কক্ষে সাইদুলকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেন। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

সাইদুলের চাচা মো. সোহাগ বলেন, পারিবারিক কলহের কারণে কিছুদিন ধরে সাইদুল মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন।

সাইদুলের সহকর্মীদের ভাষ্য, তিনি হাসিখুশি ও উদ্যমী ছিলেন। তার পাশের কক্ষে থাকা এক পুলিশ সদস্যের বরাতে উপপরিদর্শক (এসআই) নজরুল বলেন, সাইদুলের ভেতরে এমন গভীর মানসিক কষ্ট চলছিল, তা সহকর্মীরা বুঝতে পারেননি।

পরিবার ও সহকর্মীদের সূত্রে জানা যায়, গত দুই থেকে আড়াই মাস ধরে সাইদুল মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। একটি মেয়ের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক ছিল। তবে তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে হয়নি। সম্পর্কটি ভেঙে যাওয়ার পর তিনি আরও ভেঙে পড়েন বলে পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য।

মৃত্যুর আগে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া কয়েকটি পোস্টে সাইদুল ওই সম্পর্কের টানাপোড়েন ও মানসিক কষ্টের কথা লিখেছিলেন। গত ২৩ জুন তিনি জীবনের কষ্টের কথা উল্লেখ করে একটি পোস্ট দেন। ৩০ জুনের আরেকটি পোস্টে বিদায়ের ইঙ্গিতপূর্ণ কথা লেখেন।

গত ১৪ জুলাই দেওয়া একটি পোস্টে তিনি লেখেন, ‘দরজাটা তুমি বন্ধ করলা, শাস্তিটা আমি পাইলাম।’ ওই পোস্টে তিনি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার কষ্ট ও দীর্ঘদিনের অভিমানের কথা তুলে ধরেন।

মৃত্যুর আগে দেওয়া আরেকটি পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ‘হারিয়ে ফেলতে চাইনি বলেই সম্পর্কের নাম দিয়েছিলাম স্বামী-স্ত্রী।’ ওই পোস্টে তিনি সম্পর্কের প্রতি নিজের বিশ্বাস, ভালোবাসা ও ভেঙে যাওয়ার কষ্টের কথা তুলে ধরেন।

এ ছাড়া তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের বাবা-মায়ের কাছে ক্ষমাও চেয়েছিলেন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘দুঃখিত আম্মু, আব্বু। আপনাদের ছেলে আর নিতে পারতেছে না।’ এসব পোস্টের বিষয়ে তার পরিবার ও সহকর্মীরা অবগত ছিলেন।

সাইদুলের বাবা মো. সাদেক বলেন, ‘এ বছরের ২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দিয়েছিল আমার ছেলে। অনেক স্বপ্ন ছিল তাকে নিয়ে। আমার এবং আমার ছেলের স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। সব এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল। কী করব, কী বলব—আমি জানি না।’

তিনি বলেন, সাইদুলের ফেসবুকে দেওয়া পোস্টগুলো তিনি দেখেছেন। তবে তার ছেলের মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন আলামত পুলিশ নিয়ে গেছে।

সাইদুলের মৃত্যুর ঘটনায় ডেমরা থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন আলামত পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

ময়নাতদন্ত শেষে সাইদুলের মরদেহ প্রথমে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে নেওয়া হয়। সেখানে সহকর্মীদের উপস্থিতিতে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মরদেহ ডেমরা পুলিশ লাইনে নেওয়া হলে সেখানে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

পরে সাইদুলের মরদেহ ফেনী সদর উপজেলার লেমুয়া উত্তর চাঁদপুর গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত