জাহাজ ডোবার পর ১৩৩ দিন ভেসে ছিলেন নাবিক

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সমযয়ের কথা। ১৯৪২ সালের নভেম্বরে ব্রিটিশ বাণিজ্যিক জাহাজ বেনলোমন্ডে কর্মরত ছিলেন চীনা নাবিক পুন লিম। আট দশটা সমুদ্রযাত্রার মতোই এটি একটি সাধারণ অভিযান ছিল। কিন্তু হঠাৎ মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় সব।

একটি জার্মান ইউ-বোট জাহাজটিতে টর্পেডো (পানির নিচে চলমান এক ধরনের মিসাইল) দিয়ে হামলা চালায়। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই আটলান্টিক মহাসাগরের তলিয়ে যায়। জাহাজের অধিকাংশ নাবিক প্রাণ হারান। বিশাল সমুদ্রে একা ভেসে থাকেন শুধুমাত্র নাবিক পুন লিম।

চারদিকে শুধু পানি আর পানি। কোথাও স্থলভাগ নেই, নেই কোনো উদ্ধারকারী নৌকা। এমন সময় ভাগ্যক্রমে তিনি একটি ছোট কাঠের লাইফ র‍্যাফট (কাঠের ভেলা) দেখতে পান। সেটিতে উঠে প্রাণে বাঁচলেও তখনও তিনি জানতেন না, সেটিই হতে যাচ্ছে পরবর্তী ১৩৩ দিনের যাত্রা।

শুরুর দিকে র‍্যাফটে কিছু জরুরি খাবার ও পানীয় ছিল। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সেগুলো ফুরিয়ে যেতে শুরু করে। বেঁচে থাকতে হলে নিজের বুদ্ধি ও দক্ষতার প্রয়োজন ছিল। এরপর তিন বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করতে ক্যানভাসের কাপড় ব্যবহার করেন। ধাতব টুকরো দিয়ে বানান মাছ ধরার হুক, দড়ির আঁশ দিয়ে তৈরি করেন সুতা। সেই সরঞ্জাম দিয়ে মাছ ধরেন, সমুদ্রের পাখি ধরে খাদ্যের ব্যবস্থা করেন। এমনকি প্রখর রোদে খাবার সংরক্ষণের উপায়ও বের করে ফেলেন।

প্রতিটি দিন ছিল মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের সমতুল্য। কখনও প্রবল ঝড় র‍্যাফটটিকে উল্টে দিয়েছে প্রায়, কখনও বিশাল ঢেউ তাকে সমুদ্রে ছুড়ে ফেলার উপক্রম করেছে। ক্ষুধা ও তৃষ্ণা ছিল প্রতিদিনের সঙ্গী। তবে সবচেয়ে কঠিন ছিল নিঃসঙ্গতা।

দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, তারপর মাসের পর মাস-চারদিকে শুধু আকাশ আর সমুদ্র। কথা বলার মতো কেউ নেই, সাহায্যের কোনো নিশ্চয়তা নেই।

কয়েকবার দূরে জাহাজ দেখা গেলেও কেউ তাকে উদ্ধার করেনি। একবার একটি বিমানও তাকে দেখতে পেয়েছিল বলে জানা যায়, কিন্তু সেখান থেকেও কোনো সাহায্য আসেনি। অনেকেই হয়তো এতদিনে আশা ছেড়ে দিতেন। কিন্তু পুন লিম তা করেননি। শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও মানসিক দৃঢ়তা হারাননি। তিনি শুধু একটি লক্ষ্যেই অটল ছিলেন- আরও একটি দিন বেঁচে থাকা।

অবশেষে টানা ১৩৩ দিন সমুদ্রে ভেসে থাকার পর তার অবিশ্বাস্যভাবে ব্রাজিল উপকূলের কাছে কয়েকজন জেলে ছোট্ট র‍্যাফটটি দেখতে পেয়ে তাকে উদ্ধার করেন।

চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের অনেকেই প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি যে একজন মানুষ এত দীর্ঘ সময় একা সমুদ্রে থেকে জীবিত থাকতে পারেন। পুন লিমের এই কাহিনি মানব ইতিহাসের অন্যতম একটি গল্প।