ভারতে মেডিকেল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে রাজধানী দিল্লি রণক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। গতকাল সোমবার আন্দোলনস্থল দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে সংসদ অভিযুখে পদযাত্রার আয়োজন করেছিল ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন ও প্রতিবাদী প্ল্যাটফর্ম ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। ভারতীয় পার্লামেন্টের সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনে পুলিশের অনুমতি না থাকায় পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রার সময় সিজেপির কর্মীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করেছে ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী। পার্লামেন্টের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় ব্যারিকেড ভেঙে এগোনোর চেষ্টাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী ও পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। বিক্ষোভ থেকে অসংখ্য বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে পুলিশ। কর্মসূচি থেকে ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকের আটক দাবি করেছে দলটি। এ ছাড়া সমাজবাদী পার্টির এমপি এবং অখিলেশ যাদবের স্ত্রী ডিম্পল যাদবসহ দলটির বেশ কয়েকজন এমপিকেও আটক করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেন্ট্রাল দিল্লির বেশ কিছু এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
‘চলো সংসদ’ নামের ওই পদযাত্রায় যোগ দিতে প্রায় ২০ হাজার সমর্থক জড়ো হয়েছিলেন। ব্যাপকভাবে ব্যারিকেডে ঘেরা যন্তর মন্তরে প্রচুর পুলিশ ও আধাসামরিক নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। বিক্ষোভকারীরা তাদের মিছিল নিয়ে এগিয়ে যেতে চাইলে পার্লামেন্ট থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে সেটি থামিয়ে দেওয়া হয়। বিক্ষোভকারীরা ‘ভাগো, ভাগো’, ‘ধর্মেন্দ্র প্রধান ভাগো’, ‘নরেন্দ্র মোদি ভাগো’ বলে হিন্দিতে স্লোগান দেয়। অনেকেই হাতে সংবিধান ও জাতীয় পতাকা নিয়ে মিছিলে যোগ দেয়। ভারত সরকার এই আন্দোলনকে আমলে না নিলেও, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দুই নেতা কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডার সঙ্গে প্রায় ১০ মিনিট বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে আন্দোলনের প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস সামাজিক মাধ্যম এক্সে জানান, তারা একটি লিখিত স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন। নাড্ডা বিষয়টি অভ্যন্তরীণভাবে আলোচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন। আন্দোলনের মধ্যেই ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর বৈঠক ঘিরে রাজনৈতিক জল্পনা তীব্র হয়েছে। তবে বৈঠকে কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, সেই বিষয়ে সরকারিভাবে কিছু জানানো হয়নি। ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ নিয়ে জল্পনার মধ্যেই এই বৈঠক রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে ককরোচ জনতা পার্টি অভিযোগ করেছে, তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎকে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে। যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। আন্দোলনকারীদের দাবি, তাদের নেতৃত্বকে দমন করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে সংঘাতের মধ্যে সমর্থকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে সিজেপি। দলটি এক বার্তায় বলেছে, ‘আপনাদের কোনো স্থানে আটকে দেওয়া হলেও শান্ত থাকুন এবং শান্তি বজায় রাখুন। আমরা কেবল শান্তি ও ভালোবাসা দিয়ে জয়ী হব।’ এর আগে গত রবিবারই দিল্লির পুলিশ সিজেপিকে এই কর্মসূচির অনুমতি দেয়নি এবং সেখানে বড় ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়। সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দিল্লি পুলিশ জানায় পূর্বানুমতি সাপেক্ষে যন্তর মন্তরের নির্দিষ্ট প্রতিবাদ স্থান ছাড়া অন্য যেকোনো স্থানে প্রতিবাদ পদযাত্রা, মিছিল, বিক্ষোভ বা পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তির জনসমাবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের ‘পরজীবী’ ও ‘তেলাপোকা’ সংক্রান্ত মন্তব্যের জের ধরে গত মে মাসে অভিজিৎ দিপকে একটি ব্যঙ্গাত্মক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ককরোচ জনতা পার্টি শুরু করেছিলেন। কয়েকদিনের মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং লাখ লাখ অনুসারী অর্জন করে। পাশাপাশি বিরোধী দলের রাজনীতিবিদ, অ্যাক্টিভিস্ট, শিল্পী ও ক্রীড়াবিদদের থেকেও এটি সমর্থন পায়। গত ২ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ৩০ বছর বয়সী দিপকে গত জুনে ভারতে ফেরেন এবং দিল্লিতে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে গত ২৮ জুন থেকে যন্তর মন্তরে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন ৫৮ বছর বয়সী অ্যাক্টিভিস্ট সোনাম ওয়াংচুক। তবে শারীরিক অবস্থার অবনতির কথা জানিয়ে গত শনিবার পুলিশ ৫৯ বছর বয়সী ওয়াংচুককে হাসপাতালে ভর্তি করায়। গতকাল হাসপাতাল থেকে দেওয়া এক লিখিত বার্তায় ওয়াংচুক জানান প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষাব্যবস্থার অন্যান্য ব্যর্থতার দায় যদি সরকার নিজ ঘাড়ে নেয় অথবা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্য ও নেতারা যদি আশ্বাস দেন যে তারা এই বিষয়টি সংসদে তুলবেন, তবেই কেবল তিনি অনশন ভাঙবেন।