২০১০ সালের সেই জোহানেসবার্গ ফাইনালের স্মৃতি কি ফুরিয়েছিল? ঠিক ১৬ বছর পর উত্তর আমেরিকার মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যেন অবিকল সেই চিত্রনাট্যেরই পুনর্মঞ্চায়ন ঘটাল স্পেন। সেবার ছিলেন আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, আর এবার স্প্যানিশদের মুকুট এনে দেওয়ার নেপথ্যে টুর্নামেন্টজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে থাকা ফরোয়ার্ড ফেররান তোরেস। অতিরিক্ত সময়ের লড়াইয়ে গেল বারের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বসেরার সোনালি ট্রফি নিজেদের করে নিল লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।
খেলার মাঠে ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা সুযোগ কাজে লাগানোর হিসাব-নিকাশ ছাপিয়ে এই ফাইনাল ম্যাচটি ছিল মূলত মানসিক দৃঢ়তার এক বড় পরীক্ষা। পুরো টুর্নামেন্টে ফর্মহীনতা ও সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হওয়া তোরেসের জন্য অতিরিক্ত সময়ে করা গোলটি ছিল কেবল একটি জয়সূচক ব্যবধানই নয়, বরং যাবতীয় চাপ ও হতাশা থেকে এক পরম মুক্তির অনুভূতি। ম্যাচ শেষে ফিফা ব্রডকাস্টারদের দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে এবং এই জয় নিজ দেশের সবাইকে উৎসর্গ করে এই ফরোয়ার্ড বলেন, ‘আমার মনে হয় এই গোলটি এসেছে ৪৭ কোটি (স্পেনের জনসংখ্যা) মানুষের হৃদয় থেকে, কেবল আমরা যারা এখানে আছি তাদের একার নয়। আজ আমাদের ভাগ্য আগে থেকেই লেখা ছিল, আমাদেরই জেতাটা নির্ধারিত ছিল। আজ আমরা আমাদের দেশের মানুষের থেকে দূরে থাকলেও মনেপ্রাণে তাদের খুব কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করেছি।’
টুর্নামেন্টজুড়ে দল দাপুটে ফর্মে থাকলেও তোরেস ছিলেন নিষ্প্রভ। আসরে আগের ৭ ম্যাচের প্রত্যেকটিতে খেলেও পাননি জালের দেখা। অবশেষে সেই খরা কাটালেন ফাইনালের মঞ্চে, দলকে জিতিয়ে। সেসব নিয়ে তোরেস যোগ করেন, ‘পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই আমাকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে, কিন্তু ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, তিনি আমাকে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শক্তি দিয়েছেন।’ লিওনেল মেসির মতো লড়াকু প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলার স্নায়ুচাপের কথা স্বীকার করে তিনি আরও যোগ করেন, ‘ফাইনাল ম্যাচ সবসময়ই কঠিন। যখন আপনি মেসির মুখোমুখি হবেন, তখন একটু দুশ্চিন্তা কাজ করবেই, কিন্তু আমরা নিজেদের সেরা খেলাটাই খেলেছি।’
ফাইনালে এই নাটকীয় জয়ের পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেও। ৬৫ বছর বয়সে সবচেয়ে বেশি বয়সী কোচ হিসেবে বিশ্বজয়ের অনন্য এই রেকর্ড গড়ে তিনি জয়ের পুরো কৃতিত্ব দিয়েছেন তার শিষ্যদের। সংবাদ সম্মেলনে ফুয়েন্তে বলেন, ‘অতীতে মানুষ অবাক হতো যখন দেখত ফুটবলাররা প্রতিভাবান ও দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি ভালো মানুষও বটে। আমরাই সবচেয়ে ঐক্যবদ্ধ দল এবং এর কৃতিত্ব এমন মানুষদের, যাদের মধ্যে সংহতি ও মূল্যবোধ রয়েছে। ফুটবলারদের এই প্রজন্ম নিয়ে আমি ভীষণ গর্বিত, যারা একটি দল ও পরিবার হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।’ বিশ্বকাপ জিতে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই কোনো তাড়াহুড়ো করতে চান না ফুয়েন্তে। কেবলই এই মুহূর্ত উপভোগ করতে চান। ‘আমরা যেখানে থাকতে চেয়েছিলাম সেখানেই আছি, আমাদের খেলোয়াড়দের নিয়ে আমরা সৌভাগ্যবান। আমাদের কোনো তাড়াহুড়ো নেই, আমাদের এটি উপভোগ করা উচিত; হয়তো আমরা সেপ্টেম্বর ও পরবর্তী ম্যাচগুলো নিয়ে ভাবছি, কিন্তু এটি ঐতিহাসিক কিছু, চলুন ম্যাচ ধরে ধরে এগিয়ে যাই।’
কোচের সেই বিশ্বাসের মর্যাদা মাঠে শতভাগ দিয়েছেন মিডফিল্ডার ও গোল্ডেন বল জয়ী রদ্রি। প্রায় দুই বছর আগে গুরুতর চোটের ধাক্কা সামলে মাঠে ফিরে দলের মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পাশাপাশি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও জেতেন তিনি। রদ্রি বলেন, ‘এটি নিখুঁত এক স্ক্রিপ্টের মতো। আমি কখনোই এটি আশা করিনি। এই দলটি অবিশ্বাস্য। এটি অর্জন করা সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল, আর আমরা সেটি আর্জেন্টিনার মতো দলের বিপক্ষে করে দেখিয়েছি।’ নতুন প্রজন্মকে বার্তা দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমি চাই নতুন প্রজন্ম দেখুক যে আকাশ ছুঁয়ে আবার মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব।’
স্পেনের এই ঐতিহাসিক সাফল্যের আরেকটি বড় ভিত্তি ছিল তাদের রক্ষণ দেওয়াল। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করে রেকর্ড গড়েছেন গোলরক্ষক উনাই সিমোন। ৭টি ক্লিন শিট রেখে গোল্ডেন গ্লাভস জেতা সিমোন বলেন, ‘আমরা যখন স্পেনে ফিরব, তখন বুঝতে পারব আজ আমরা কত বড় একটা কাজ করেছি। এই সাফল্যের কৃতিত্ব শুধু আমাদের রক্ষণাত্মক পরিশ্রমের ফল। যদি আমার এই গ্লাভসগুলো কথা বলতে পারত, তবে বলত যে অন্য গোলরক্ষকদের মতো ওদের এত কষ্ট করতে হয়নি।’
মাঠের লড়াই শেষে ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেয়াও শুনিয়েছেন সাফল্যের পেছনের সেই মন্ত্র। চেলসি থেকে রিয়াল মাদ্রিদে নাম লেখানো এই লেফট-ব্যাক দলের ঐক্য নিয়ে বলেন, ‘যখন আপনি গোল হজম করবেন না, তখন জেতাটা অনেক সহজ হয়ে যায়। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে আমরা দারুণ কাজ করেছি, আর এটি শুধু ডিফেন্ডার বা গোলরক্ষকের একা নয়, পুরো দলের সম্মিলিত আত্মত্যাগের ফল। আমরা একসঙ্গে আক্রমণ করেছি, একসঙ্গে ডিফেন্স করেছি।’ দীর্ঘ ৫০ দিনের ক্যাম্প শেষে এই শিরোপা জয়ের পর উল্লাসের সুরও ঝরে পড়ে তার কণ্ঠে, ‘এখন সময় এসেছে উদযাপন করার, আমরা মনেপ্রাণে একটি ভালো পার্টি ডিজার্ভ করি।’
মাঠের লড়াই, রেকর্ড গড়া কোচ, সমালোচনার ঝড় পেরিয়ে তোরেসের গোল, রড্রির দুর্দান্ত কামব্যাক আর সিমোন-কুকুরেয়াদের রক্ষণ; সব মিলিয়ে স্পেনের এই বিশ্বকাপ জয় দলগত সংহতি ও ঐক্যের এক দুর্দান্ত দৃষ্টান্ত। মাঠের গণ্ডি পেরিয়ে যা আগামী প্রজন্মের কাছে স্প্যানিশ ফুটবলের অমর সাফল্যের এক সোনালি অধ্যায় হয়ে থাকবে।