বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) শীর্ষ পদের নির্বাচন পদ্ধতিতে আবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২০২৫ সালের বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালায় ফেডারেশনের সভাপতি, সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সহ-সভাপতি পদে নির্বাচনের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ভোটার তালিকাভুক্ত চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপের সব ভোটারের ভোট প্রদানের বিধান ছিল। তবে এই বিধানে পরিবর্তন এনে বিধিমালাটি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংশোধিত বিধিমাল প্রকাশ করে এবং আগামী ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামত চেয়েছে।
খসড়ায় বলা হয়েছে ফেডারেশনের সভাপতি, সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সহ-সভাপতি পদে নির্বাচনের ক্ষেত্রে চেম্বার গ্রুপের প্রার্থী চেম্বার গ্রুপের ভোটার দ্বারা নির্বাচিত হবেন। একই সঙ্গে অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপের প্রার্থী অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপের ভোটার দ্বারা নির্বাচিত হবেন।
এফবিসিসিআই সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের আগের বিধিমালা অনুযায়ী চেম্বার গ্রুপ ও অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে নির্ধারিতসংখ্যক পরিচালক নির্বাচিত হতেন। সেই পরিচালকরা আবার ভোট দিয়ে সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি ও সহ-সভাপতি পদের বিপরীতে প্রার্থী নির্বাচন করতেন, যেখানে এখন সরাসরি ভোটের মাধ্যমেই এফসিসিআইয়ের এই শীর্ষ পদগুলোয় নির্বাচিত হতে হবে। তবে অন্যান্য বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাচনপ্রক্রিয়া নিয়ে এখনো কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে বলে জানা গেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা ২০২৫ এ নির্বাচন পদ্ধতিসহ আরও কিছু বিষয়ে পরিবর্তন আনতে একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে। এর ওপর সংগঠনসহ বিশেষজ্ঞ মহলের কাছ থেকে মতামত চাওয়া হয়েছে। মতামত পাওয়ার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বিধিমালাটির সংশোধন করা হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক এবং রিকন্ডিশন গাড়ি আমদানিকারকদের সংগঠন আবদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন যে বিধিমালার খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনের আলাদা ভোট পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। নতুন প্রস্তাবিত পদ্ধতিটিকে আমি সঠিক বলে মনে করি।
ভোট ব্যতিত শীর্ষ পদে প্রার্থী নির্বাচনের বিষয়ে তিনি বলেন, বাণিজ্য সংগঠনগুলো আসলে কোম্পানি আইন দ্বারা পরিচালিত। এ ক্ষেত্রে শীর্ষ পদে নির্বাচনের বিষয়ে কোম্পানি আইনে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। ফলে এসব পদে নির্বাচন সরাসরি বা মনোনিত হতে পারে।
তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে যে সংশোধনী আনা হয়েছে, সেটি বাস্তবায়ন করতে হলে এর চূড়ান্ত রূপ দিতে হবে। খসড়াটি ঝুলে থাকলে এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচনে অনিশ্চয়তা থেকে যাবে। বলা হচ্ছে, বেসরকারি খাত থেকে একজন প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে নির্বাচনের আয়োজন করা হবে। কিন্তু এ বিধিমালা চূড়ান্ত না হলে সেটি সম্ভব হবে না। আশা করছি, সরকার ও ব্যবসায়ী নেতারা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।
জানা গেছে, সংশোধিত নীতিমালায় বাণিজ্য সংগঠনের সদস্যদের ফি নির্ধারণের ক্ষমতা পুনরায় বাণিজ্য সংগঠনের কাছে যেতে পারে। এফবিসিসিআইয়ের অধীনে থাকা বাণিজ্য সংগঠনের বার্ষিক চাঁদার পরিমাণও কমতে পারে।
এ ছাড়া ফেডারেশনে ২ বছরের মেয়াদের জন্য গঠিত সাধারণ পরিষদের প্রত্যেক সদস্যকে এককালীন ২০ হাজার টাকা নিবন্ধন ফি দেওয়ার বিধানের বদলে ১০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে খসড়ায়। একই সঙ্গে এফবিসিসিআইয়ের অধীনে থাকা বাণিজ্য সংগঠনের বার্ষিক চাঁদার হার কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ‘ক’ শ্রেণির চেম্বারের বার্ষিক চাঁদা ১ লাখ থেকে কমিয়ে ৬০ হাজার টাকা এবং ‘ক’ শ্রেণির বাণিজ্য সংগঠনের বার্ষিক চাঁদা ৭৫ হাজারের বদলে ৪৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ‘খ’ শ্রেণিতে চেম্বারের জন্য ৭৫ হাজার থেকে কমিয়ে ৫০ হাজার এবং অ্যাসোসিয়েশনের জন্য ৬০ হাজার থেকে কমিয়ে ৩০ হাজার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা ২০২৫ জারি করার পর থেকেই এই চাঁদার হার কমানোর দাবি করে আসছিলেন ব্যবসায়ী নেতারা।
খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, ৪৮ জনের পর্ষদে সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি, চার সহসভাপতি বাদে ৪২ পরিচালকের মধ্যে ৩০ জন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে নির্বাচিত হবেন। চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে পাঁচজন করে ১০ জন মনোনীত পরিচালক থাকবেন। তার বাইরে নারী চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে একজন করে দুইজন মনোনীত পরিচালক পর্ষদে যুক্ত হবেন। এই ১২ জন মনোনীত পরিচালকের জন্য নির্বাচিত পর্ষদ ২২ জনের নাম সরকারের কাছে পাঠাবে। সরকার মনোনীত পরিচালকদের চূড়ান্ত করবে।
জানা গেছে, ১৯৬১ সালের বাণিজ্য সংগঠন অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০২২ সালে নতুন বাণিজ্য সংগঠন আইন প্রণয়ন করে সরকার। এ আইনের ভিত্তিতে বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা-২০২৫ এর প্রজ্ঞাপন জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। গত বছরের মে মাসে এই প্রজ্ঞাপন জারির পর এফবিসিসিআইয়ের পাশাপাশি ঢাকা চেম্বার, মেট্রোপলিটন চেম্বারসহ বেশ কয়েকটি বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা নিয়ে আপত্তি জানায়। সেই আপত্তির কারণে নতুন করে আবার বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।