পুঁজিবাজারে মার্জিন ঋণ নীতির বড় সংস্কার

‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫’ এর খসড়া সংশোধনী প্রকাশ করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ বিষয়ে অংশীজন ও সংশ্লিষ্ট সবার মতামত, পরামর্শ ও আপত্তি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে কমিশনে জমা দিতে আহ্বান জানানো হয়েছে। যার মাধ্যমে পুঁজিবাজারে মার্জিন ঋণ সংক্রান্ত বিধিমালা আরও সহজ, বাস্তবসম্মত ও বিনিয়োগকারী বান্ধব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এর আগে বিষয়টি নিয়ে বাজার অংশীজনের আপত্তি থাকায় নতুন এ সংশোধনী প্রকাশ করে কমিশন।

জানা গেছে, গত বছর নভেম্বরের শুরুতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ‘মার্জিন রুলস, ১৯৯৯’ রহিত করে নতুন ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) রুলস, ২০২৫’ জারি করেছে। একই বছর ৩০ অক্টোবর বিধিমালাটি বিএসইসি কর্তৃক অনুমোদিত হয়। তখন কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। ১৯৬৯ সালের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অরডিন্যান্সের ৩৩ ধারা অনুযায়ী প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাশেদ মাকসুদ কমিশন নতুন বিধিটি প্রণয়ন করেছিল। বিধিমালার গেজেট প্রকাশের পর পুঁজিবাজার অংশীজনদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। যা চলতি বছর জুন মাসে কমিশনের নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান যোগদানের পর আরও গতি পায়। পরে বর্তমান কমিশন বিধিমালাটি সংশোধনের উদ্বেগ গ্রহণ করে যা, গত ১৯ জুলাই সংস্থার ওয়েবসাইটে অংশীজনের মতামতের জন্য প্রকাশ করা হয় এবং গতকাল সোমবার কমিশনের পক্ষ থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

তথ্য মতে, পুঁজিবাজারে ব্রোকারেজ হাউজ বা মার্চেন্ট ব্যাংক থেকে নিজের বিনিয়োগকৃত অর্থের বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে ঋণ নিয়ে শেয়ার কেনার সুবিধাই হলো মার্জিন ঋণ।

এদিকে গতকাল কমিশনের বিজ্ঞপ্তিতে বিএসইসি জানিয়েছে, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তারিখ থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও অংশীজনরা কমিশনের কাছে লিখিতভাবে মতামত, পরামর্শ অথবা আপত্তি পাঠাতে পারবেন। এতে কমিশন স্পষ্ট করেছে, সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অরডিন্যান্স ১৯৬৯ এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩ অনুযায়ী যেকোনো বিধিমালা প্রণয়ন বা সংশোধনের আগে অংশীজনদের মতামত গ্রহণ একটি স্বাভাবিক ও বাধ্যতামূলক আইনি প্রক্রিয়া। সেই আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই জনমতের জন্য খসড়া সংশোধনী প্রকাশ করা হয়েছে।

কমিশন জানিয়েছে, প্রাপ্ত মতামত, পরামর্শ ও আপত্তিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন, সংযোজন ও পরিমার্জনের পর বিধিমালার চূড়ান্ত সংস্করণ প্রস্তুত করা হবে। এরপর সরকারি গেজেটে প্রকাশের মাধ্যমে এটি কার্যকর করা হবে।

বিএসইসি আরও বলেছে, বর্তমানে প্রকাশিত নথিটি কেবল একটি খসড়া প্রস্তাবনা, এটি কোনো চূড়ান্ত সংশোধনী নয়। তাই খসড়া সংশোধনী নিয়ে অনুমাননির্ভর ব্যাখ্যা, অপপ্রচার বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে বিভ্রান্ত কিংবা উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। কমিশনের ভাষ্য, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ও সুরক্ষা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তাবিত সংশোধনী তৈরি করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো বিদ্যমান মার্জিন বিধিমালাকে আরও সহজ, বাস্তবসম্মত, ব্যবহারবান্ধব ও কার্যকর করা। অংশীজনদের মতামত বিবেচনায় নিয়ে এমন একটি চূড়ান্ত সংশোধনী প্রণয়ন করা হবে, যা হবে বিনিয়োগকারী বান্ধব এবং পুঁজিবাজারের সার্বিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়ক।

এ প্রসঙ্গে বিএসইসি নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র হলেন মো. আবুল কালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত বছর (২০২৫) সালে বিধিটির গেজেট প্রকাশ করা হয়। যা পরে বাজার অংশীজনদের মধ্যে আপত্তি পরিলক্ষিত হয়। অনেকে সভা-সেমিনার ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা করছিলেন। সে জন্য বর্তমান কমিশন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে, সবার মতামতকে আইনি ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে কমিশন বিধিমালার সংশোধনী প্রস্তাব এনে তা প্রকাশ করেছে এবং এর ওপর সব অংশীজনকে গঠনমূলক সমালোচনার জন্য দুই সপ্তাহের সময় ঠিক করে দিয়েছে। যার ভিত্তিতে বাজার উপযোগী একটি বিধিমালা তৈরি করা হবে।

খসড়া সংশোধনী অনুযায়ী, গ্রাহকের নিজস্ব মূলধন (ইকুইটি) ও মার্জিন ঋণের সর্বোচ্চ অনুপাত সব ক্ষেত্রে ১:১ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এই অনুপাত ১: ১,১: ০.৫ অথবা ১: ০.২৫ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে সব বিনিয়োগকারীর জন্য একই সর্বোচ্চ সীমা প্রযোজ্য হবে। তবে কোনো মার্জিন ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান চাইলে নিজস্ব ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে এর চেয়ে কম ঋণ দিতে পারবে, কিন্তু ১ : ১-এর বেশি অর্থায়ন করতে পারবে না।

মার্জিন কলের নিয়মেও পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। বর্তমানে গ্রাহকের ইকুইটি ৭৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে মার্জিন কল দেওয়া হয়। সংশোধিত খসড়ায় এই সীমা ৭০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে গ্রাহকের ইকুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে বাধ্যতামূলকভাবে শেয়ার বিক্রির বিদ্যমান বিধান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

মার্জিনযোগ্য শেয়ার নির্বাচনের নীতিতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে আর মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) বিবেচনা করা হবে না। এর পরিবর্তে মূল্য-সম্পদ অনুপাত (পিবি রেশিও) ব্যবহার করা হবে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পিবি রেশিও ৩-এর বেশি এবং বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে ১-এর বেশি হলে সেই প্রতিষ্ঠানের শেয়ার মার্জিন সুবিধার আওতায় থাকবে না।

অন্যদিকে অন্য খাতের কোম্পানির ক্ষেত্রে পিই রেশিও বহাল থাকলেও এর হিসাবের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বর্তমানে সর্বশেষ চার প্রান্তিকের আয়ের ভিত্তিতে পিই রেশিও নির্ধারণ করা হলেও নতুন বিধানে সর্বশেষ নিরীক্ষিত বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনের শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) বিবেচনায় নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

চুক্তি নবায়নের নিয়মেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি বছর মার্জিন চুক্তি নবায়ন করতে হয়। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো পক্ষ চুক্তি বাতিল না করলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন হয়েছে বলে গণ্য হবে। এতে বিনিয়োগকারী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক জটিলতা কমবে বলে মনে করছে কমিশন।