ইসরায়েল কি সত্যিই ছেড়ে দিচ্ছে লেবাননের ভূখণ্ড?

যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা একটি বিশেষ ত্রিপক্ষীয় কাঠামো চুক্তির আওতায় দক্ষিণ লেবাননের নির্ধারিত তিনটি গ্রামে নিরাপত্তার পূর্ণ দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে লেবাননের সামরিক বাহিনী। প্রাথমিকভাবে একটি ‘পাইলট প্রজেক্ট’ বা পরীক্ষামূলক সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে এই ব্যবস্থা কার্যকর হতে যাচ্ছে। সোমবার (২০ জুলাই) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এই তথ্য নিশ্চিত করে জানায়, দক্ষিণ লেবাননের ফ্রউন, শ্রিফা এবং জওতার আল-গারবিয়া নামের তিনটি গ্রামকে এই পরীক্ষামূলক এলাকার অংশ হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে।

মার্কিন মধ্যস্থতায় অর্জিত এই পরিকল্পনার মূল শর্ত হলো- ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দক্ষিণ লেবাননের দখলকৃত এলাকাগুলো থেকে ধাপে ধাপে তাদের সৈন্যদের সরিয়ে নেবে। এরপরই লেবাননের সামরিক বাহিনী ওই এলাকাগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নেবে এবং পাশাপাশি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর অস্ত্র সরাতে এবং তাদের সামরিক অবকাঠামো নির্মূলের বিষয়টি সরাসরি তদারকি করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ‘রোমে ইসরায়েল ও লেবাননের প্রতিনিধি দলের মধ্যে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার একটি প্রত্যক্ষ ও ইতিবাচক ফলাফল হলো এই সামরিক চুক্তি।’ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, এই ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তিটি যেন সফলভাবে পূর্ণতা পায়, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশের সরকারের সঙ্গেই অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ চালিয়ে যাবে।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীও এই পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে। ইসরায়েলি সামরিক সূত্র জানায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও লেবাননের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সমন্বয় রেখে এই চুক্তি বাস্তবায়নের কাজ এগোচ্ছে। দীর্ঘ ছয় ধাপের সরাসরি দরকষাকষির পর গত ২৬ জুন লেবানন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এই সমঝোতা কাঠামোয় চূড়ান্ত সম্মতি জানিয়েছিল।

তবে চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও রণক্ষেত্রের বাস্তবচিত্র এখনও বেশ থমথমে ও জটিল। একদিকে ইসরায়েল এখনও লেবাননের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে বিমান ও স্থল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও উত্তর ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট হামলা অব্যাহত রেখেছে। ইরান সমর্থিত এই সশস্ত্র দলটি পুরো চুক্তিকেই সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। হিজবুল্লাহর স্পষ্ট দাবি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত ইসরায়েলকে কোনো প্রকার পূর্বশর্ত ছাড়াই অনতিবিলম্ব লেবাননের ভূখণ্ড ছেড়ে চলে যেতে হবে।

চুক্তির মূল ধারা অনুযায়ী, ইসরায়েল যেসব এলাকা খালি করে দেবে, সেখানে লেবাননের সশস্ত্র বাহিনী নিরাপত্তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেবে। একই সঙ্গে সেই স্থানগুলো যেন হিজবুল্লাহর সামরিক উপস্থিতি, ভারী অস্ত্র কিংবা যেকোনো ধরনের গোপন অবকাঠামো থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকে, তা লেবাননের সেনাবাহিনীকেই নিশ্চিত ও প্রমাণ করতে হবে।

তবে চুক্তি ঘোষণার পরও সোমবার পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী ঠিক কখন লেবাননের ভূখণ্ড থেকে পুরোপুরি পিছু হটবে, তা নিয়ে বড় ধরনের ধোঁয়াশা ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লেবাননের এক ঊর্ধ্বতন সামরিক ও নিরাপত্তা সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, লেবাননের সেনাবাহিনী এখনও জওতার আল-গারবিয়া গ্রামে প্রবেশ করতে পারেনি, কারণ এলাকাটির উপকণ্ঠ থেকে এখনও ইসরায়েলি সেনারা সরে যায়নি।

একই সুর ফুটে উঠেছে স্থানীয় প্রশাসনের জবানীতেও। ফ্রউন গ্রামের মেয়র আল জাজিরাকে বলেন, ‘নতুন কোনো বাস্তবিক পরিবর্তন আমাদের চোখে পড়েনি। মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি আগের মতোই আছে এবং এসব চুক্তির আলোচনা এখন পর্যন্ত শুধু কথার কথা হিসেবেই রয়ে গেছে।’ অন্যদিকে শ্রিফা গ্রামের মেয়র জানান, এই পরীক্ষামূলক এলাকার বিষয়ে তাকে আগে থেকে কোনো কিছুই জানানো হয়নি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পরিস্থিতি বিন্দুমাত্র বদলায়নি। আজ আর কালকের মধ্যে কোনো ফারাক নেই; তাছাড়া পুরো যুদ্ধজুড়েই তো লেবাননের সেনাবাহিনীর কিছু না কিছু উপস্থিতি এই অঞ্চলে ছিলই।’

সমঝোতা চুক্তিতে স্পষ্ট করে বলা হয়নি ঠিক কবে বা কতদিনের মধ্যে ইসরায়েল তাদের দখলে থাকা লেবাননের ভূখণ্ড খালি করবে। উল্লেখ্য, বর্তমানে লেবাননের মোট ভূখণ্ডের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দখলে রয়েছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, লেবাননে হিজবুল্লাহর হাতে অস্ত্র থাকা পর্যন্ত তারা ভূখণ্ডের অন্তত ১০ কিলোমিটার (৬ মাইল) ভেতরে নিজেদের তৈরি করা ‘নিরাপত্তা অঞ্চলে’ অবস্থান করবে। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওস তাদের এক প্রতিবেদনে আভাস দিয়েছে, মঙ্গলবার বিকেলের মধ্যেই হয়তো এই তিনটি পাইলট জোন থেকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাদের সৈন্য প্রত্যাহার শুরু করতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সহিংসতার এই সাম্প্রতিক যুদ্ধটি শুরু হয়েছিল চলতি বছরের মার্চ মাসে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তার জবাবে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে ব্যাপক রকেট হামলা চালায়, যা পরবর্তীতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘ পাঁচ মাসের যুদ্ধে রূপ নেয়।

লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৪,৩২৮ জন লেবানিজ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১০ লাখেরও বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছেন। অন্যদিকে, এই একই সময়ে হিজবুল্লাহর হামলায় অন্তত ৩২ জন ইসরায়েলি সেনা ও ৪ জন সাধারণ ইসরায়েলি নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই প্রাণ হারিয়েছেন দক্ষিণ লেবাননের রণক্ষেত্রে।

সূত্র: আলজাজিরা