মানুষ সদকা বলতে অর্থ-সম্পদ দানকেই বোঝে। কারও হাতে কিছু টাকা তুলে দেওয়া, অসহায়কে সাহায্য করা বা মসজিদ-মাদ্রাসায় অনুদান দেওয়াকেই অনেকে সদকার একমাত্র রূপ মনে করেন। অথচ ইসলামের শিক্ষা আরও বিস্তৃত, আরও মানবিক। ইসলাম মানুষের প্রতিটি কল্যাণকর কাজকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। আন্তরিকতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা প্রতিটি সৎকাজই সদকা।
হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘সকল সৎকাজ সদকা হিসেবে গণ্য।’ (সহিহ বুখারি)
এই সংক্ষিপ্ত হাদিসে ইসলামের একটি অসাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে। এখানে সদকার পরিধি শুধু অর্থ ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। বরং মানুষের উপকারে আসে, সমাজে কল্যাণ বয়ে আনে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সম্পাদিত হয়, এমন প্রতিটি কাজকে সদকা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
একজন মানুষের মুখে আন্তরিক হাসি অন্যের মন ভালো করে দিতে পারে। পথে পড়ে থাকা কাঁটা, পাথর বা ক্ষতিকর বস্তু সরিয়ে দেওয়া পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। তৃষ্ণার্ত মানুষকে এক গ্লাস পানি পান করানো, অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ নেওয়া, বৃদ্ধকে রাস্তা পার হতে সাহায্য করা, দুঃখী মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়া কিংবা কাউকে একটি ভালো পরামর্শ দেওয়া, সবই সদকার অন্তর্ভুক্ত। কারণ এসব কাজ মানুষের উপকার করে এবং সমাজে ভালোবাসা ও সহমর্মিতার পরিবেশ সৃষ্টি করে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ সৎকাজে প্রতিযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেন, ‘তোমরা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করো।’ (সুরা বাকারা ১৪৮) এই আয়াত আমাদের শেখায়, ভালো কাজের কোনো সীমা নেই। যে যত বেশি কল্যাণকর কাজ করবে, সে তত বেশি আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবে।
উল্লিখিত হাদিসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, দরিদ্র মানুষও সদকার সওয়াব থেকে বঞ্চিত নয়। যার অর্থ নেই, সে যেন মনে না করে যে তার জন্য সদকার কোনো সুযোগ নেই। সুন্দর আচরণ, মিষ্টভাষা, ক্ষমাশীলতা, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব পালন, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা, মানুষকে উপকারী জ্ঞান দেওয়া কিংবা কারও কষ্ট লাঘবের চেষ্টা, এসব কাজের মাধ্যমেও সে সদকার সওয়াব অর্জন করতে পারে।
তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন। সব সৎকাজ তখনই সদকা হিসেবে কবুল হবে, যখন তা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হবে। লোকদেখানো, প্রশংসা লাভ বা ব্যক্তিগত স্বার্থ অর্জনের উদ্দেশ্যে করা ভালো কাজের প্রতিদান আল্লাহর কাছে পাওয়া যাবে না। তাই প্রতিটি কাজের সঙ্গে বিশুদ্ধ নিয়ত থাকা অপরিহার্য।
বর্তমান সমাজে মানুষ নানা ব্যস্ততায় ডুবে থাকলেও প্রতিদিন অসংখ্য সুযোগ আসে সৎকাজ করার। পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা করা, কর্মস্থলে দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করা, মানুষের অধিকার রক্ষা করা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং সৃষ্টির প্রতি দয়া প্রদর্শন করা, এসবও ইসলামের দৃষ্টিতে মহৎ কাজ।
লেখক : ইসলামি গবেষক