আল্লাহর দুই মহান নাম

আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ০১:১৬ এএম

আপনারা নিয়তকে একনিষ্ঠ করুন, সফল হবেন। নবীজির সুন্নতকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করুন, হেদায়াতপ্রাপ্ত হবেন। নেক আমলে সচেষ্ট হোন, লাভবান হবেন। পাপ থেকে দূরে থাকুন, নিরাপদে থাকবেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সেই দিনকে ভয় করো, যেদিন তোমাদের আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। অতঃপর প্রত্যেককে তার কর্মের ফল পুরোপুরি প্রদান করা হবে এবং তাদের প্রতি কোনো অবিচার করা হবে না।’ (সুরা বাকারা ২৮১)

নিশ্চয়ই আল্লাহর নামসমূহ, তার গুণাবলি এবং তার কর্মসমূহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা সর্বাধিক উপকারী ও সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন জ্ঞান। কারণ জ্ঞানের মর্যাদা নির্ভর করে যার সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা হচ্ছে তার মর্যাদার ওপর। আর মহান আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞানের চেয়ে মহৎ ও মর্যাদাপূর্ণ অন্য কোনো জ্ঞান নেই। বান্দা যত বেশি আল্লাহর নাম ও গুণাবলি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করবে, তত বেশি সে তাকে চিনবে, তাকে ভয় করবে, তার কাছেই বেশি প্রার্থনা করবে, তার অধিক নিকটবর্তী হবে, তার সন্তুষ্টির ব্যাপারে অধিক আশাবাদী হবে এবং তার অসন্তুষ্টিকে অধিক ভয় করবে।

মহান আল্লাহর সুন্দরতম নামসমূহের মধ্যে অন্যতম দুটি হলো ‘আল হাইয়্যু’ এবং ‘আল কাইয়্যুম’। এই দুটি নাম আল্লাহর সব সুন্দরতম নামের অর্থকে ধারণ করে। মহান আল্লাহর অন্যান্য নাম ও উচ্চতম গুণাবলির মূল ভিত্তি এই দুটি নাম। ‘আল-হাইয়্যু’ নামটি আল্লাহর পরিপূর্ণ গুণাবলির সমষ্টিকে নির্দেশ করে এবং ‘আল-কাইয়্যুম’ নামটি তার কর্মসম্পর্কিত গুণাবলির সমষ্টিকে নির্দেশ করে।

অনেক আলেমের মতে, এই দুটি নামই আল্লাহর ‘ইসমে আজম’ তথা সেই মহান নাম, যার মাধ্যমে তাকে ডাকা হলে তিনি সাড়া দেন এবং যার মাধ্যমে তার কাছে কিছু চাওয়া হলে তিনি তা দান করেন।

আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে এক মজলিসে বসে ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি নামাজ আদায় করছিলেন। তিনি রুকু ও সিজদা সম্পন্ন করে তাশাহহুদ পড়লেন। অতঃপর দোয়ায় বললেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি। সব প্রশংসা আপনারই। আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। হে পরম অনুগ্রহকারী! হে আসমান ও জমিনের অতুলনীয় স্রষ্টা! হে মহিমা ও সম্মানের অধিকারী! হে চিরঞ্জীব! হে সব সৃষ্টির ধারক ও পালনকর্তা! হে চিরঞ্জীব! হে সব সৃষ্টির ধারক ও পালনকর্তা! আমি আপনার কাছেই প্রার্থনা করছি।’

তখন নবীজি (সা.) বললেন, ‘তোমরা কি জানো, তিনি কী নামে আল্লাহকে ডেকেছেন?’ সাহাবিরা বললেন, ‘আল্লাহ ও তার রাসুলই ভালো জানেন।’ তখন তিনি বললেন, ‘সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! তিনি আল্লাহকে তার সেই মহান নামে ডেকেছেন, যে নামে তাকে ডাকা হলে তিনি সাড়া দেন এবং যে নামে তার কাছে কিছু চাওয়া হলে তিনি তা দান করেন।’ (মুসনাদে আহমদ)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর মহান নাম কোরআনের তিনটি সুরায় রয়েছে। সুরা বাকারা, সুরা আলে ইমরান এবং সুরা তাহা।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ)

হাদিসের বর্ণনাকারী আবু হাফস বলেন, ‘আমি এই তিনটি সুরা পর্যবেক্ষণ করে দেখলাম, সেখানে এমন একটি বিষয় রয়েছে, যা অন্য কোথাও এভাবে নেই। সুরা বাকারায় রয়েছে, ‘আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব ও সব সৃষ্টির ধারক।’ (সুরা বাকারা ২৫৫) সুরা আলে ইমরানে রয়েছে, ‘আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব ও সব সৃষ্টির ধারক।’ (সুরা আলে ইমরান ২) আর সুরা তাহায় রয়েছে, ‘চিরঞ্জীব ও সব সৃষ্টির ধারকের সামনে সবাই অবনত হবে।’ (সুরা তাহা ১১১)

হে ইমানদার ভাইয়েরা! আল্লাহর ‘আল-হাইয়্যু’ নামটি তার পরিপূর্ণ, চিরস্থায়ী ও অবিনশ্বর জীবনের প্রমাণ বহন করে। তার জীবন কখনো অস্তিত্বহীনতার পরে শুরু হয়নি। কখনো তা বিলুপ্ত হবে না। মৃত্যু বা ধ্বংস তাকে স্পর্শ করবে না। ক্লান্তি বা অবসাদ তার কাছে পৌঁছায় না। এমন জীবন, যা তার জ্ঞান, ক্ষমতা, শ্রবণ, দর্শন, ক্ষমাশীলতা, দয়া এবং অন্য সব পরিপূর্ণ গুণের দাবিদার। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর সেই চিরঞ্জীব সত্তার ওপর ভরসা করো, যিনি কখনো মৃত্যুবরণ করেন না।’ (সুরা ফুরকান ৫৮)

যে জীবিত সত্তা একদিন মৃত্যুবরণ করবে, সে কখনো ইবাদতের উপযুক্ত হতে পারে না। এটাই সব সৃষ্টির অবস্থা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবই ধ্বংস হয়ে যাবে। অবশিষ্ট থাকবে কেবল তোমার প্রতিপালকের মহান ও সম্মানিত চেহারা।’ (সুরা আর-রহমান ২৬-২৭)

এই সত্যের মাধ্যমেই আবু বকর সিদ্দিক (রা.) দলিল পেশ করেছিলেন। যখন নবীজি (সা.) ইন্তেকাল করলেন, তখন ওমর (রা.) বলছিলেন, ‘আল্লাহর কসম! রাসুলুল্লাহ (সা.) ইন্তেকাল করেননি।’

তখন আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মুখমণ্ডল থেকে কাপড় সরিয়ে তাকে চুম্বন করে বললেন, ‘আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক। আপনি জীবিত অবস্থায়ও পবিত্র ছিলেন এবং ইন্তেকালের পরও পবিত্র রয়েছেন।’

অতঃপর তিনি বাইরে এসে বললেন, ‘হে শপথকারী! একটু থামুন।’ আবু বকর সিদ্দিক (রা.) কথা বলা শুরু করলে ওমর (রা.) বসে পড়লেন। এরপর আবু বকর (রা.) আল্লাহর প্রশংসা করে বললেন, ‘শুনে রাখো সবাই, যে মুহাম্মদ (সা.)-এর ইবাদত করত, সে জেনে রাখুক, মুহাম্মদ (সা.) ইন্তেকাল করেছেন। আর যে আল্লাহর ইবাদত করে, সে জেনে রাখুক, আল্লাহ চিরঞ্জীব, তিনি কখনো মৃত্যুবরণ করবেন না।’

এরপর তিনি এই আয়াত তেলাওয়াত করলেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মরণশীল এবং তারাও মরণশীল।’ (সুরা জুমার ৩০) আরও তেলাওয়াত করেন, ‘মুহাম্মদ কেবল একজন রাসুল। তার আগে বহু রাসুল অতিবাহিত হয়েছেন। তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে কি তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে? আর যে পশ্চাদপসরণ করবে, সে কখনো আল্লাহর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহ শিগগিরই কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেবেন।’ (সুরা আলে ইমরান ১৪৪, সহিহ বুখারি ৩৬৬৭)

হে মুসলিম জাতি! মহান আল্লাহর ‘আল-কাইয়্যুম’ নামের অর্থ হলো, তিনি স্বয়ং প্রতিষ্ঠিত এবং সমগ্র সৃষ্টিজগতের সব বিষয়ের তত্ত্বাবধায়ক। সমস্ত সৃষ্টি তারই মুখাপেক্ষী। নবীজি (সা.) যখন রাতের বেলা তাহাজ্জুদের জন্য দাঁড়াতেন, তখন বলতেন, ‘হে আল্লাহ! সব প্রশংসা আপনারই। আপনি আসমানসমূহ, জমিন এবং তাতে যারা আছে, তাদের সবার প্রতিপালক। আপনি আসমানসমূহের, তাতে থাকা ফেরেশতাদের, নক্ষত্রমণ্ডলী ও জ্যোতিষ্কসমূহের প্রতিপালক। আপনি জমিনের এবং তাতে থাকা জিন, মানুষ, পাখি, বন্যপ্রাণী এবং আমরা যা জানি ও যা জানি না, সবকিছুরই প্রতিপালক।’ (সহিহ বুখারি)

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনকে ধারণ করে রেখেছেন, যাতে তারা স্থানচ্যুত না হয়। যদি তারা স্থানচ্যুত হয়ে যায়, তবে তিনি ছাড়া আর কেউ তাদের ধরে রাখতে পারবে না। নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত সহনশীল, পরম ক্ষমাশীল।’ (সুরা ফাতির ৪১)

তিনি জীবন দান করেন। মৃত্যু দেন। দান করেন। বঞ্চিত করেন। সংকুচিত করেন। প্রশস্ত করেন। যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন। যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন। তিনি পথভ্রষ্টকে হেদায়েত দেন। বিপদ দূর করেন। আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দেন। রোগীকে সুস্থতা দান করেন। প্রবাসীকে ফিরিয়ে আনেন। বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করেন। ক্ষুধার্তকে আহার দেন। দুঃখ দূর করেন। অনুগত বান্দার আমল গ্রহণ করেন। তওবাকারীর তওবা কবুল করেন। ভীত ব্যক্তিকে নিরাপত্তা দেন। ভগ্নহৃদয়কে সান্ত্বনা দেন। মজলুমকে সাহায্য করেন। জালেমকে দমন করেন। তিনি প্রত্যেক ব্যক্তির কর্মের ওপর পূর্ণ তত্ত্বাবধায়ক। তিনি তাদের অবস্থা, কথা ও কাজ সম্পর্কে সম্যক অবগত। তিনি সবকিছু হিসাব করে রাখেন। অতঃপর কেয়ামতের দিন তাদের হিসাব গ্রহণ করবেন এবং তাদের প্রতিফল প্রদান করবেন।

কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সব সৃষ্টির ধারক ও পালনকর্তা। তাকে তন্দ্রা স্পর্শ করে না, নিদ্রাও নয়। আসমানসমূহে যা কিছু আছে এবং জমিনে যা কিছু আছে, সবই তার। কে আছে, যে তার অনুমতি ছাড়া তার কাছে সুপারিশ করতে পারে? তিনি জানেন, মানুষের সামনে যা আছে এবং তাদের পেছনে যা আছে। আর তার জ্ঞানের কোনো অংশই তারা আয়ত্ত করতে পারে না, তবে যতটুকু তিনি চান। তার সিংহাসন আসমানসমূহ ও জমিনকে পরিব্যাপ্ত করে আছে। আর এগুলোকে সংরক্ষণ করা তাকে মোটেও ক্লান্ত করে না। তিনি সর্বোচ্চ, মহান।’ (সুরা বাকারা ২৫৫)

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোনো কঠিন বিপদের সম্মুখীন হতেন, তখন বলতেন, ‘হে চিরঞ্জীব! হে সব সৃষ্টির ধারক ও পালনকর্তা! হে চিরঞ্জীব! হে সব সৃষ্টির ধারক ও পালনকর্তা! আপনার রহমতের মাধ্যমে আমি সাহায্য প্রার্থনা করছি।’ (সুনানে তিরমিজি)

১৭ জুলাই শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত