পরিকল্পনা ও বাস্তবমুখী কর্মপদ্ধতি

মহান আল্লাহ এই পৃথিবীকে নির্ধারিত নিয়মের ভিত্তিতে পরিচালনা করছেন। সূর্য নির্দিষ্ট সময়ে উদিত হয়, চাঁদ নির্ধারিত কক্ষপথে চলাচল করে, ঋতুর পরিবর্তন ঘটে সুনির্দিষ্ট নিয়মে, এমনকি মানুষের জন্ম, মৃত্যু ও রিজিকও আল্লাহর নির্ধারিত নিয়মের অন্তর্ভুক্ত। সৃষ্টিজগতের প্রতিটি স্তরে যখন আল্লাহর পরিকল্পনার এত সুস্পষ্ট ছাপ বিদ্যমান, তখন মানুষের জীবন কীভাবে পরিকল্পনাহীন হতে পারে?

দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ আমাদের অনেক ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হলো আবেগপ্রবণতা, অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কাজ শুরু করা। আমরা ফল চাই দ্রুত, কিন্তু প্রস্তুতি নিতে চাই না। অথচ ইসলাম আমাদের শেখায়, মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখার পাশাপাশি সর্বোচ্চ পরিকল্পনা, প্রস্তুতি ও বাস্তবমুখী কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সমগ্র জীবনই এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশেষ করে হিজরতের ঘটনায় আমরা পরিকল্পনা, দূরদর্শিতা, গোপনীয়তা, দায়িত্ব বণ্টন এবং বাস্তবমুখী নেতৃত্বের সর্বোৎকৃষ্ট নমুনা দেখতে পাই।

ইসলামে পরিকল্পনার গুরুত্ব : ইসলাম কখনো বিশৃঙ্খলা ও তাড়াহুড়োকে সমর্থন করে না। বরং প্রতিটি কাজে চিন্তা, পরামর্শ ও পরিকল্পনার শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আপনি কাজের ব্যাপারে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করুন।’ (সুরা আলে ইমরান ১৫৯)

এই আয়াত প্রমাণ করে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মতো ওহিপ্রাপ্ত মহান ব্যক্তিত্বকেও আল্লাহতায়ালা পরামর্শের নির্দেশ দিয়েছেন। তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য পরিকল্পনা ও পরামর্শ কত বেশি প্রয়োজন, তা সহজেই অনুমেয়।

অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন, যারা তার পথে এমন সুশৃঙ্খলভাবে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করে, যেন তারা সীসা ঢালা প্রাচীর।’ (সুরা সফ ৪) এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, শৃঙ্খলা, সংগঠন ও পরিকল্পনা আল্লাহর কাছে প্রিয়।

তাড়াহুড়ো শয়তানের কাজ : রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘ধীরস্থিরতা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর তাড়াহুড়ো শয়তানের পক্ষ থেকে।’ (সুনানুল কুবরা)

এ হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, একজন মুমিন কখনো আবেগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নেন না। তিনি পরিস্থিতি বিবেচনা করেন, পরিণতি ভাবেন এবং তারপর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

হিজরতে নবীজির পরিকল্পনা : নবীজি (সা.)-এর হিজরত শুধু স্থানান্তরের ঘটনা নয়, বরং এটি পরিকল্পনা, দূরদর্শিতা এবং বাস্তবমুখী কর্মপদ্ধতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

যখন মক্কার কুরাইশরা তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করল, তখন তিনি আবেগতাড়িত হয়ে শহর ত্যাগ করেননি। বরং আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষা করেছেন। নির্দেশ পাওয়ার পর তিনি ধাপে ধাপে এমন একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন, যা আজও নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনার অনন্য মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়।

গোপনীয়তা ও সঠিক সময় : রাসুলুল্লাহ (সা.) দিনের এমন একটি সময়ে আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর বাড়িতে যান, যখন সাধারণত কেউ বাইরে বের হতো না। উদ্দেশ্য ছিল পরিকল্পনা যেন গোপন থাকে।

এরপর হিজরতের সময়, পথ ও দায়িত্ব বণ্টন অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নির্ধারণ করা হয়। কে সংবাদ পৌঁছে দেবে, কে খাদ্যের ব্যবস্থা করবে, কে উট নিয়ে আসবে, সবকিছু আগেই নির্ধারিত ছিল।

যদিও মদিনা মক্কার উত্তর দিকে অবস্থিত, তবুও শত্রুদের দৃষ্টি এড়ানোর জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) সরাসরি উত্তরমুখী পথ গ্রহণ করেননি। বরং অসাধারণ দূরদর্শিতা ও কৌশলের পরিচয় দিয়ে তিনি প্রথমে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হন এবং সাওর গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করেন।

এটি ছিল অসাধারণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত। কারণ শত্রুরা উত্তর দিকেই অনুসন্ধান চালাচ্ছিল। এই পরিকল্পনা তাদের হতভম্ব করে দেয় এবং রাসুল (সা.)-কে নিরাপদে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।

আমাদের করণীয় : আমাদের অনেক ব্যর্থতার পেছনে অপরিকল্পিত কাজ, আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবতাবিবর্জিত চিন্তাধারা দায়ী। একজন ছাত্র যদি পড়াশোনার পরিকল্পনা না করে, একজন ব্যবসায়ী যদি বাজার বিশ্লেষণ না করে, একজন দাঈ যদি সমাজের অবস্থা না বুঝে দাওয়াত দেন কিংবা একজন অভিভাবক যদি সন্তান লালনে পরিকল্পনা না করেন, তাহলে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া কঠিন।

লেখক : মুদাররিস, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা