বর্তমান বিশ্বে ‘উদ্যোক্তা’ শব্দটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। তরুণদের অনেকেই চাকরির পরিবর্তে নিজস্ব উদ্যোগ গড়ে তুলতে আগ্রহী হচ্ছেন। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু ইসলাম উদ্যোক্তা হওয়াকে কীভাবে দেখে? ব্যবসা-বাণিজ্য ও উদ্যোগ কি কেবল দুনিয়াবি সফলতার বিষয়, নাকি এর সঙ্গে ইবাদত ও আখেরাতেরও সম্পর্ক রয়েছে?
ইসলামের দৃষ্টিতে উদ্যোক্তা হওয়া প্রশংসনীয়। সততা, আমানতদারিতা ও মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হলে এটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি কাজ। ইসলাম অলসতা, পরনির্ভরতা ও ভিক্ষাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করেছে। অন্যদিকে হালাল উপার্জন, আত্মনির্ভরশীলতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে উৎসাহিত করেছে।
হালাল উপার্জন ইবাদত : পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা বাকারা ২৭৫)
এই আয়াত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, বৈধ ব্যবসা ইসলামে স্বীকৃত। তবে সেই ব্যবসা হতে হবে সুদ, প্রতারণা, মিথ্যা, ঘুষ ও অন্যায় থেকে মুক্ত।
হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও নবুয়ত লাভের আগে একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। তার সততা, বিশ্বস্ততা ও আমানতদারিতার জন্য সমাজ তাকে ‘আল-আমিন’ (বিশ^স্ত) উপাধিতে ভূষিত করেছিল। এটি প্রমাণ করে যে, একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় মূলধন শুধু অর্থ নয়, বরং বিশ্বাসযোগ্যতাও।
ব্যবসায় সততার গুরুত্ব : হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘সৎ, বিশ্বস্ত ও আমানতদার ব্যবসায়ী কেয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।’ (সুনানে তিরমিজি ১২০৯)
এটি ব্যবসায়ীদের জন্য এক বিরাট সুসংবাদ। তবে এই মর্যাদা লাভের শর্ত হলো লেনদেনে সততা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, প্রতারণা থেকে বিরত থাকা এবং মানুষের হক আদায় করা।
অপর এক হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম) অতএব, ইসলামে সফল উদ্যোক্তা হওয়ার প্রথম শর্ত হলো নৈতিকতা।
আত্মনির্ভরশীলতার শিক্ষা : ইসলাম মানুষকে কর্মক্ষম হতে উৎসাহিত করেছে। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কেউ যদি নিজের হাতে উপার্জন করে খায়, তবে তার চেয়ে উত্তম খাদ্য আর কেউ কখনো খায়নি।’ (সহিহ বুখারি)
এই হাদিসে শুধু শ্রমের মর্যাদা নয়, বরং আত্মনির্ভরশীল জীবনের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়েছে। একজন উদ্যোক্তা নিজের জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেন। ফলে তার উদ্যোগ ব্যক্তিগত লাভের গণ্ডি পেরিয়ে সামাজিক কল্যাণের মাধ্যম হয়ে ওঠে।
উদ্যোক্তার নিয়ত যেমন হওয়া উচিত : ইসলামে কোনো কাজের মূল্যায়ন শুধু ফলাফল দিয়ে নয়, নিয়তের ভিত্তিতেও হয়। একজন উদ্যোক্তার উদ্দেশ্য যদি হয় হালাল উপার্জন করা, পরিবারকে সম্মানজনকভাবে পরিচালনা করা, মানুষের প্রয়োজন পূরণ করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, সমাজের উপকার করা, জাকাত, সদকা ও দান-খয়রাতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা, তাহলে তার ব্যবসাও ইবাদতে পরিণত হতে পারে।
লাভের সঙ্গে মানবিকতাও জরুরি : বর্তমান বিশে^ অনেকেই শুধু মুনাফার কথা ভাবেন। কিন্তু ইসলাম উদ্যোক্তাদের মানবিক হতে শেখায়। দ্রব্যমূল্য অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, ওজনে কম দেওয়া, পণ্যের ত্রুটি গোপন করা কিংবা গ্রাহককে প্রতারণা করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাজারে একবার একটি খাদ্যশস্যের স্তূপে হাত দিয়ে ভেতরে ভেজা অংশ দেখতে পান। তিনি বিক্রেতাকে বলেন, ‘এটি ওপরে রাখলে মানুষ দেখতে পেত। যে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম) এই ঘটনায় ব্যবসায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির এক অনন্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য কিছু শিক্ষা : আজকের যুবসমাজ উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। এটি ইতিবাচক। তবে তাদের বেশ কিছু বিষয় মনে রাখতে হবে। প্রথমত, দ্রুত ধনী হওয়ার লোভে হারাম পথে যাওয়া যাবে না। দ্বিতীয়ত, ব্যবসার শুরু থেকেই সততার সুনাম অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। তৃতীয়ত, গ্রাহকের আস্থা হারালে ব্যবসার প্রকৃত ভিত্তি নষ্ট হয়ে যায়। চতুর্থত, কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন, শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার প্রাপ্য মজুরি পরিশোধ করতে। পঞ্চমত, ব্যবসাকে শুধু নিজের লাভের জন্য নয়, সমাজের কল্যাণের মাধ্যম হিসেবেও দেখতে হবে।
উদ্যোক্তা ও আল্লাহভীতি : একজন মুসলিম উদ্যোক্তা জানেন, পৃথিবীর আদালতকে ফাঁকি দেওয়া গেলেও মহান আল্লাহর আদালতকে ফাঁকি দেওয়া যাবে না। তাই তিনি চুক্তি রক্ষা করেন, করণীয় আদায় করেন, হারাম থেকে দূরে থাকেন এবং প্রতিটি লেনদেনে আল্লাহকে সাক্ষী মনে করেন। এই আল্লাহভীতিই একজন মুসলিম উদ্যোক্তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।
মোট কথা, ইসলামের দৃষ্টিতে উদ্যোক্তা হওয়া কেবল অর্থ উপার্জনের উপায় নয়, এটি একটি আমানত, একটি দায়িত্ব এবং নেক নিয়ত থাকলে একটি ইবাদতও। যে উদ্যোক্তা হালাল উপার্জন করেন, সততার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করেন, মানুষের প্রয়োজন পূরণ করেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সর্বাগ্রে রাখেন, তিনি শুধু একজন সফল ব্যবসায়ী নন, তিনি সমাজের একজন কল্যাণকামী নির্মাতা।
আজ মুসলিম যুবকদের প্রয়োজন এমন উদ্যোক্তা হওয়া, যারা লাভের পাশাপাশি নৈতিকতাকেও সমান গুরুত্ব দেবেন এবং সম্পদের পাশাপাশি আখেরাতের পুঁজি অর্জনের কথাও ভাববেন। কারণ ইসলামে প্রকৃত সফলতা সেই সম্পদে, যা হালাল পথে অর্জিত হয়, মানুষের উপকারে আসে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ হয়।
লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ