গভীর জঙ্গল। কাঁটাঝোপ আর লতাগুল্মের ছড়াছড়ি। জঙ্গলের পাশ কেটে বয়ে গেছে ঝিরি। ঝিরি ধরেই জলপ্রপাতের জল গড়িয়ে মিশে যায় হাকালুকি হাওরে। ঝিরি-জঙ্গলের সন্ধিক্ষণে পাকা পথ ধরে হাঁটলে শোনা যায় পোকামাকড়ের ‘ক্রির.. ক্রির..’ আওয়াজ। সুনসান নীরবতার মধ্যে সেই আওয়াজ তীক্ষèভাবে কানে পৌঁছায়। ছড়ার ওপর উঁচু উঁচু গাছগাছালি। বলছি মাধবকুন্ড- ঝরনার কথা। যা বাংলাদেশের সুউচ্চ জলপ্রপাত গুলোর একটি। অনেক দিন ধরে পরিকল্পনা করছিলাম মাধবকুন্ড জলপ্রপাত দেখতে যাব। কিন্তু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত আমার পরিকল্পনা সফল হতে চলছে। আমরা চলছি সিলেট থেকে বড়লেখার অভিমুখে মাধবকুন্ড- জলপ্রপাতের দিকে। সঙ্গে আছে ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে সানন্দা। বর্ষাকাল তাই সকাল হতেই আকাশের মন ভালো নেই । মুখ কালো করে বসে আছে, এই বুঝি অঝোর ধারায় নেমে পড়ল। আমরা বের হয়ে পড়লাম চার চাকার বাহনে করে। একটু পরেই শুরু হলো মুষলধারায় বৃষ্টি। প্রবল বৃষ্টির ফলে সামনের কিছু দেখা যাচ্ছিল না। গাড়ির গতি কমাতে হলো। একটা বাজারের কাছের হোটেলে নাস্তা করে আবার আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম গন্তব্যে। সময়ের ধারাপাতে আমরা এসে উপস্থিত হলাম মাধবকুন্ড জলপ্রপাত এলাকায়। গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেঁটেই এগিয়ে যেতে লাগলাম। ছোটবেলায় এসেছিলাম আর আজ এখন এলাম। অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। আগে অনেক দূর থেকেই ঝরনার জলের অবিরাম ছুটে চলার শব্দ পাওয়া যেত কিন্তু এখন কোনো শব্দ নেই। শুধু কোলাহল ছাড়া। পায়ে হেঁটে আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম, পৌঁছালাম প্রবেশ দ্বারে। টিকিট কেটে এগিয়ে যেতে লাগলাম। আগে মেঠোপথ থাকলেও এখন পাকা রাস্তা। আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চলছি। একপাশে ঘন বন, অন্য পাশে ঝিরির পানি বয়ে চলছে। আমরা যখন মাধবকুন্ড ঝরনার কাছে যাই তখন আবার তুমুল বৃষ্টি শুরু হলো। আর ঝরনার রূপ কিন্তু বৃষ্টিতেই বেশি সুন্দর, কেননা পানির প্রবাহ তখন বেশি থাকে। হাতের বাঁয়ে শিব মন্দির ঠিক আগের অবস্থায় আছে। এবার কানে ভেসে আসতে লাগল শোঁ শোঁ শব্দ। অল্প সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান হলো কাক্সিক্ষত মাধবকুন্ড জলপ্রপাত। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলাম। মাধবকু- ঝরনায় তখন জলের সেকি ঢল! কেউ একেবার ঝরনার নিচে যেতে পারছে না, সবাই ঝরনার জল যে পথে প্রবাহিত হয়ে বেরিয়ে আসে সেই পথে দাড়িয়ে মজা আনন্দ করছেন। আগে কু-ের জলে নৌকা করে ভেসে বেড়ানো যেত। কুন্ডের জলে এখন আর ভেসে বেড়ায় না নৌকা। কারণ কুন্ড এলাকা খুব গভীর। অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে তাই। যে পাহাড়টির গা বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে এ পাহাড়টি সম্পূর্ণ পাথরের যা পাথারিয়া পাহাড় নামে পরিচিত। এর বৃহৎ অংশজুড়ে রয়েছে ছড়া। এই পাহাড়ের ওপর দিয়ে গঙ্গামারা ছড়া বহমান। এই ছড়া মাধবকুন্ড জলপ্রপাত হয়ে নিচে পড়ে হয়েছে মাধবছড়া। অর্থাৎ গঙ্গামারা ছড়া হয়ে বয়ে আসা জলধারা প্রায় ১৬২ ফুট উঁটু থেকে নিচে পড়ে মাধবছড়া হয়ে প্রবহমান। সাধারণত একটি মূল ধারায় পানি সব সময়ই পড়তে থাকে, বর্ষাকাল এলে মূল ধারার পাশেই আরেকটা ছোট ধারা তৈরি হয় এবং ভরা বর্ষায় দুটো ধারাই মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় পানির তীব্র তোড়ে। জলের এই বিপুল ধারা পড়তে পড়তে নিচে সৃষ্টি হয়েছে বিরাট কুন্ডের। এই মাধবছড়ার পানি পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হতে হতে গিয়ে মিশেছে হাকালুকি হাওরে। মাধবকুন্ড ঝরনা থেকে ১৫-২০ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে রয়েছে আরেকটি ঝরনা যা পরিকুন্ড ঝরনা নামে পরিচিত। আমরা কুন্ডের জলে পা ডুবালাম। সে এক অন্যরকম অনুভূতি। এর পরে আমরা গেলাম পাশের মাধবকুন্ড- ইকোপার্কে। সিঁড়ি বেয়ে ওপরের দিকে উঠলাম। নানা রকমের গাছগাছালি ভরপুর।বেশ ভালোই লাগছিল পরিবেশ। এরপর আমরা গেলাম পাশের শিব মন্দিরে, অনেক পুরনো এই মন্দির। কথিত আছে যে মহাদেব বা শিবের পূর্বনাম মাধব এবং এর নামানুসারে তার আবির্ভাব স্থানের নাম মাধবকুন্ড। তাই কুন্ডের পাশেই স্থাপন করা হয় শিবমন্দির। যে পাহাড়টির গা বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে এ পাহাড়টি সম্পূর্ণ পাথরের। এর বৃহৎ অংশজুড়ে রয়েছে ছড়া। ছড়ার ওপরের অংশের নাম গঙ্গামারা ছড়া আর নিচের অংশের নাম মাধবছড়া। পাহাড়ের ওপর থেকে পাথরের ওপর দিয়ে ছুটে আসা পানির স্রোত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে হঠাৎ খাড়াভাবে উঁচু পাহাড় থেকে একেবারে নিচে পড়ে যায়। এতে দুটি ধারা সৃষ্টি হয়। একটি বড়, একটি ছোট। বর্ষাকালে ধারা দুটি মিশে যায়। শিবমন্দিরে দেবতা দর্শন শেষে আমরা ফিরে চললাম বাড়ির পথে।
যাবেন কীভাবে
ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে ‘ঢাকা-বিয়ানীবাজার’ রুটের অনেকগুলো ভালো মানের চেয়ার কোচ বাস আছে। বাসে আসলে বড়লেখার একটু আগে ‘কাঁঠালতলী’ নামের জায়গায় নামবেন। এখান থেকে মাধবকুন্ড বেশি দূর নয়। মাধবকু- চূড়ার কাছে যেতে সিএনজি বা রিকশা নিতে হবে। কমলাপুর থেকে ট্রেনেও আসতে পারেন। ঢাকা-সিলেটের আন্তঃনগর ট্রেনে উঠতে হবে এবং কুলাউড়া স্টেশনে নামতে হবে। আপনি এখান থেকে সিএনজি রিজার্ভ করে সরাসরি মাধবকুন্ড যেতে পারেন।