গুজবের রাজনৈতিক অর্থনীতি: কে লাভবান, কার ক্ষতি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়  আহত সানজিদা ইসলাম তন্বীর একটি ভুয়া মন্তব্য সংবলিত সম্পাদিত ফটোকার্ড ছড়ায় আওয়ামী প্রোপাগান্ডিস্ট এ-টিম ও সিপি গ্যাংয়ের সদস্যরা। সেই ফটোকার্ডে উল্লেখ আছে, হলের বড়ভাইয়ের কথায় মুখে টমেটোর সস মেখেছিলেন তন্বী। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় লাঠি হাতে মুখে রক্তের দাগ, এই ছবিটি অনেকের মনে দাগ কেটেছে। সেই ছবি নিয়ে গুজব ছড়ায় আওয়ামী প্রোপাগাণ্ডা টিম। সেই ভুয়া মন্তব্যের ফটোকার্ডের কথা উল্লেখ করে ‘এও সত্যি? বলে প্রশ্ন জুড়ে দিয়ে গুজবের পুনঃপ্রচার করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এক অধ্যাপক। শুধু তিনি একা নন, সেই গুজব ছড়ানোর তালিকায় আছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গণমাধ্যমের সাংবাদিকও।

যারা গুজব ছড়াচ্ছে তাদের জানা থাকার কথা যে, নারী শিক্ষার্থীদের হলে কোন ‘বড়ভাই’ থাকেন না। সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক যিনি তাঁর শিক্ষার্থীদের তথ্য যাচাইয়ের নানান বিষয়ে শিক্ষিত করে তুলবেন, তিনিও ছড়াচ্ছেন গুজব, এমন কেন হয়? এ ক্ষেত্রে ‘মোটিভেটেড রিজনিং থিওরি’র কথা বলা যেতে পারে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষ আবেগকে গুরুত্ব দেয়। আবেগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। কোনো রকম ফ্যাক্ট, যুক্তি ও সত্যের ধারে না। রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পছন্দ করেন। ইয়েল ল’ স্কুলের গবেষক ড্যান কাহান ‘মোটিভেটেড রিজনিং’ নিয়ে এক নতুন চিন্তায় আসেন, তিনি তাঁর গবেষণায় দেখতে পান, যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশি তারা মোটিভেটেড রিজনিং করার সামর্থ্যও বেশি। সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপকসহ বাকিরা সম্ভবত সেই কাজটাই করলেন।

গুজবকে কেবল মনস্তাত্ত্বিক প্রপঞ্চ নয় বরং রাজনৈতিক অর্থনীতির কাঠামো হিসেবে দেখতে হবে যেখানে লাভ ও ক্ষতি অসমভাবে বণ্টন হয়। অর্থনীতিবিদ এডওয়ার্ড গ্লেইসার বলেছেন, রাজনীতিবিদ, ধর্মীয় নেতা ও ব্যবসায়ীরা তখনই সমাজে কোনো বিশ্বাসের জোগান দেন, যখন সেই বিশ্বাস তাঁদের রাজনৈতিক ও আর্থিক লাভের নিশ্চয়তা দেয়। সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবসায়িক মডেল মূলত বিজ্ঞাপন-নির্ভর, যেখানে ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখাই মূল লক্ষ্য। একটি গোষ্ঠী, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করে মূলত গুজব ছড়ানো হয়।

ডিজিটালি রাইটের নির্বাচনী ভুল তথ্য নিয়ে গবেষণা দেখায়, রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় গোষ্ঠী ও প্রবাসী প্রভাবশালীরা এআই-নির্মিত কনটেন্ট ও সংগঠিত প্রচারণা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একধরনের ‘ডিজিটাল প্রতিযোগিতা’য় লিপ্ত। ডিজিটালি রাইট ও গ্লোবাল ডিসইনফরমেশন ইনডেক্সের যৌথ গবেষণা দেখায যায়, বাংলাদেশের ডিজিটাল সংবাদ বাজার বিজ্ঞাপন-নির্ভর কাঠামো ভুয়া বা নিম্নমানের কনটেন্টের প্রসারকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করছে। ভুল তথ্য বা গুজব রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের মধ্যে সাংগাঠনিকভাবে উৎপাদিত হয়। মেরুকরণ থেকে যে পক্ষ সাংগঠনিক সুবিধা পায়, ভুল তথ্য তাদের জন্য কার্যকর হাতিয়ার। ফলে ‘ক্লিকবেইট’ প্রকাশনা সংস্থাও লাভবান হয়, যাদের আয় সরাসরি ভিউ-নির্ভর। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিভ্রান্তিকে নিয়ন্ত্রণের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করাও এক সুপরিচিত কৌশল।

ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ: যাদের ওপর বোঝা চাপে

সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক গুজব সরাসরি সহিংসতার জন্ম দিতে পারে। যাকে বা যাদেরকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়ানো হয় তাঁরা বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সামষ্টিকভাবে সাধারণ নাগরিক ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তথ্যের ওপর আস্থা ভেঙে পড়লে গণমাধ্যম, বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি সামগ্রিক অনাস্থা তৈরি হয়। প্রান্তিক ও দুর্বল জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে, কারণ তাদের হাতে যাচাইয়ের সময়, সম্পদ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা তুলনামূলক কম রয়েছে। ভুল তথ্য বা গুজবের প্রচার নিছক বিভ্রান্তি হিসেবে দেখলে ভুল হবে, পেছনে কাজ করে জটিল রাজনৈতিক অর্থনীতি; যেখানে নির্দিষ্ট পক্ষ লাভবান হয়। আর সেই লাভের মূল্য পরিশোধ করে লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তি, সাধারণ নাগরিক ও দুর্বল জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশের বাস্তব উপাত্তও এই অসম বণ্টনকেই সমর্থন করে। এই জটিলতা বোঝা ছাড়া কোনো কার্যকর নীতিগত সমাধান সম্ভব নয়।

ছিদ্দিক ফারুক
গবেষক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)