মেসি-রোনালদোর পাশে নাম লিখিয়ে ফুটবলকে বিদায় ওচোয়ার

মেক্সিকোর সঙ্গে কোনো নাড়ির টান না থাকলেও, কেবল বিশ্বকাপে তার রোমাঞ্চকর দেয়াল হয়ে ওঠা দেখার জন্য চার বছর পর পর অপেক্ষায় থাকত পুরো ফুটবলবিশ্ব। বৈশ্বিক সমর্থকদের সেই অনুভূতির প্রতীক গিয়ের্মো ওচোয়া অবশেষে বিদায় জানালেন পেশাদার ফুটবলকে। 

মাত্র এক সপ্তাহ আগে জীবনের একচল্লিশ বছর পূর্ণ করা এই তারকা আগেই ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছিলেন, চলমান বিশ্বকাপের মেগা আসরটিই হতে যাচ্ছে তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ আসর। তবে গুঞ্জন উঠেছিল, হয়তো আরও কিছুদিন ক্লাব ফুটবলে নিজের জাদুকরী উপস্থিতি ধরে রাখবেন তিনি। কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্লাব ও দেশের হয়ে দীর্ঘ ২২ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সুদীর্ঘ পথচলা শেষে বুটজোড়া চিরতরে তুলে রাখার ঘোষণা দিলেন মেক্সিকান এই গোলপ্রহরী।

মঙ্গলবার অবসরের ঘোষণা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সেই পোস্টে ওচোয়া লিখেছেন, ‘আমি আমার সর্বস্ব দিয়েছি; ক্লাব এবং জাতীয় দলের হয়ে মাঠের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি, আর আজ আমি আমার গ্লাভস চিরকালের মতো তুলে রাখছি।’ ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে স্বাগতিকদের বিপক্ষে অসাধারণ পারফরম্যান্সে যিনি পেয়েছিলেন ‘চীনের প্রাচীর’ তকমা, সেই গোলরক্ষক পজিশনের পেছনের কঠিন বাস্তবতার কথা তুলে ধরে তিনি আরও যোগ করেন, ‘একজন গোলরক্ষক হওয়ার অর্থ হলো আপনাকে হয়তো পুরো ৯০ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে এমন একটি মুহূর্তের জন্য, যখন সবকিছু কেবল আপনার ওপর নির্ভর করবে। আর যখন সেই ক্ষণটি এসে হাজির হয়, তখন একটুও দ্বিধা করা চলে না।’

ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ৯৪২ ম্যাচে মাঠে নেমে ২৫৮ বার নিজের জাল অক্ষত রাখা ওচোয়ার দীর্ঘ এই ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অবিস্মরণীয় অর্জনগুলোর একটি হলো তাঁর অনন্য বিশ্বরেকর্ড।  ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসির মতো বিশ্বফুটবলের অমর নক্ষত্রদের পাশে নিজের নাম লিখিয়ে টানা ছয়টি বিশ্বকাপ স্কোয়াডে থাকার দুর্লভ গৌরব অর্জন করেছেন তিনি। ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্লাব আমেরিকার জার্সিতে শুর হয়েছিল পেশাদার ফুটবলে পা তার পথচলা। ইউরোপের মাটিতে প্রথম মেক্সিকান গোলরক্ষক হিসেবে ইতিহাস গড়ার পাশাপাশি ফ্রান্স, স্পেন, বেলজিয়াম ও ইতালির বিভিন্ন ক্লাবে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে বিশ্বজুড়ে এক অন্যতম কাল্ট হিরোতে পরিণত হয়েছিলেন এই গোলকিপার।

বিদায়ের এই ক্ষণটিকে আরও বেশি আবেগঘন করে তুলেছে তার দীর্ঘ কর্মজীবনের সূতিকাগার এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়াম। সদ্য সমাপ্ত আসরের শেষ গ্রুপ পর্বে চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে শেষ ১৩ মিনিটের জন্য মাঠে নামার সুযোগ পান তিনি। ম্যাচ শেষ হতেই আবেগে আপ্লুত ওচোয়া চুমু খান সেই গোলপোস্টে, যেখান থেকে একদিন শুরু হয়েছিল তার গোলরক্ষক হয়ে ওঠার গল্প। গ্যালারির আলো নিভে যাওয়ার পরও একা মাঠে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের চেনা মঞ্চকে শেষবারের মতো অভিবাদন জানান। ভক্তদের অকৃত্রিম ভালোবাসা আর দেশের জন্য সর্বস্ব উজাড় করে দেওয়ার মানসিকতাই তার এই সুদীর্ঘ যাত্রাকে দিয়েছে এক পরম সার্থকতা।

বিদায়বেলায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ওচোয়া বলেন, ‘একটি স্বপ্ন মানুষকে কতদূর নিয়ে যেতে পারে, তা আমি কখনো কল্পনাও করিনি। আজ কেবল গর্ব নিয়ে পেছনে ফিরে তাকাতে পারি এবং বলতে পারি—ধন্যবাদ।’ মেক্সিকোর গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে কোটি মানুষের প্রার্থনা আর আবেগ হৃদয়ে ধারণ করে পথ চলা এই তারকা আজ নিজের গ্লাভসগুলো তুলে দিচ্ছেন নতুন প্রজন্মের হাতে। মেক্সিকোর ফুটবল ইতিহাস ও বিশ্বমঞ্চের পাতায় তার এই নাম স্বর্ণাক্ষরে খচিত হয়ে থাকবে চিরকাল।