‘যার হাতে একটি মোবাইল ক্যামেরা আছে, সে-ই সাংবাদিক’: পিআইবির মহাপরিচালক

পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ বলেন, আমাদের সামনে আরেকটা নতুন চ্যালেঞ্জ এসেছে। পঞ্চম স্তম্ভ হিসেবে যেটাকে আমরা বলি সোশ্যাল মিডিয়া। এতদিন চতুর্থ স্তম্ভ নিয়েই আমরা বিপদে ছিলাম, এখন এসেছে পঞ্চম স্তম্ভ! যার হাতে একটা মোবাইল ক্যামেরা আছে, সেই সাংবাদিক! সেই ভিউ ব্যবসায়ী!

বুধবার (২২ জুলাই) দুপুরে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমিতে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-র আয়োজনে দুর্গাপুর উপজেলার সাংবাদিকদের নিয়ে তিন দিনব্যাপী মাল্টিমিডিয়া, ফ্যাক্ট চেক ও এআই ব্যবহার বিষয়ক প্রশিক্ষণে সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ফেসবুকের মনিটাইজেশন আছে বলে কেউ কেউ ভিউ-ব্যবসা করে মিথ্যা ছড়াচ্ছে। কারণ মিথ্যার কাটতি বেশি। এটাই সাংবাদিকতার পেশাকে চ্যালেঞ্জে ফেলছে। আপনারা যদি সত্য-মিথ্যার প্রভেদ করতে না পারেন। ফ্যাক্ট চেক করতে না পারেন, তবে পিছিয়ে পড়বেন। সাংবাদিক নিজেই একজন ফ্যাক্ট চেকার। তাকে আলাদা ফ্যাক্ট চেকিং শেখানোর প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু আজকে সত্য-মিথ্যা যেহেতু প্রযুক্তির মধ্য দিয়ে উৎপাদিত হচ্ছে। তাই ভেজালটা আপনাকেই চিনতে হবে। সেই জায়গা থেকেই এই প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। নিজেকে প্রযুক্তি দক্ষ করতে না পারলে আপনি শুভঙ্করের ফাঁকিতে পড়ে যাবেন। আমি বিশেষ করে তরুণ সাংবাদিকদের কথা বলছি।

সাংবাদিকতার ধরন ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, দুই বা তিন ধরনের সাংবাদিকতা রয়েছে শিকারি সাংবাদিকতা, চাকরির সাংবাদিকতা ও ভিখারি সাংবাদিকতা। ভিখারি সাংবাদিকতার কথা আগেই বলা হয়েছে। এছাড়া নতুন আরেকটা এসেছে সিনিয়র সাংবাদিকতা। যারা টকশোতে গিয়ে উল্টাপাল্টা বলেন। তবে এই শিকারি সাংবাদিকতা অত্যন্ত ভয়ংকর। যা একটি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এই সাংবাদিকতাই ছিল ফ্যাসিবাদের বাহন। তারা ফ্যাসিবাদের পক্ষে যুক্তি, নৈতিকতা ও সমর্থন তৈরি করত। সত্য গোপন করত এবং মিথ্যাকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করত। মানুষকে ধোঁকার মধ্যে রাখত, এমনকি ওই দলটাও এই সাংবাদিকদের মাধ্যমে ধোঁকার মধ্যে পড়েছিল। তারা বুঝতেই পারেনি যে পায়ের তলার মাটি সরে গেছে।

ফারুক ওয়াসিফ বলেন, শিকারি সাংবাদিকতা হলো কোনো ব্যক্তি, দল, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করে দিনের পর দিন সিরিজ রিপোর্ট করা। কখনও জঙ্গিবাদের নামে, কখনও দুর্নীতির নামে, আবার কখনও মুক্তিযুদ্ধের শত্রুর নামে। আমরা এমন এক জাতীয়তাবাদের কবলে ছিলাম, যার বন্ধু থাকত বিদেশে আর জনগণ হলো তার শত্রু। আর সেই জাতীয়তাবাদের প্রধান বাহন ছিল এই শিকারি সাংবাদিকতা। প্রথমে রিপোর্ট হতো, তারপর গুম করা হতো, চাকরি চলে যেত কিংবা দল নিষিদ্ধ হয়ে যেত। মানুষকে ফাঁসি দেওয়া হতো বা জেলে পুরে রাখা হতো। দেশের একটি বনেদি রাজনৈতিক পরিবার কী পরিমাণ নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছে! শিকারি সাংবাদিকতা ছিল সেই নির্যাতনকে আড়াল করার ঝালর। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভটি এমন নোংরামির পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে সেখান থেকে বের করে আনা এখনো কঠিন।

পরিবেশ ও প্রাকৃতির প্রতি দায়িত্ববোধের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ফুলবাড়ীর এক কৃষক বলেছিলেন, ১৮ হাজার মাখলুকাতের দায়িত্ব কে নেবে? শুধু মানুষের তো দায়িত্ব নয়। একজন সাংবাদিক, একজন রাজনীতিবিদ বা একজন প্রশাসক কেবল এলাকার মানুষের প্রতিনিধি নন। প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং ওই ১৮ হাজার মাখলুকাতের দায়িত্বও আপনার। আপনি তাদেরও সাংবাদিক। মহাকাশে পাঠানো ভয়েজার উপগ্রহ যেমন পৃথিবীর সংবাদ পাঠায়, তেমনি আপনি আপনার অঞ্চলের সমস্ত কিছুর সাংবাদিক। এই বোধ যদি থাকে, তবে আপনার মর্যাদাবোধ এত উঁচুতে উঠে যাবে যে আপনাকে কেউ ভিখারি সাংবাদিকতার দিকে ঠেলে দিতে পারবে না।

সাংবাদিকতার মূল চেতনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাংবাদিকতা হচ্ছে মহাকাশে মানবজাতির পাঠানো সেই ভয়েজার উপগ্রহের মতো। সে যতদিন চলবে, ততদিন মহাবিশ্বের খবর পাঠাবে। একজন সাংবাদিকও আমৃত্যু তার অঞ্চলের সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করে যান। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমরা দক্ষতা দিতে পারি, কিন্তু সাংবাদিকতার এই চেতনা পিআইবি বা কোনো প্রশিক্ষক তৈরি করতে পারবে না। আমাদের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রের সংগ্রামে সাংবাদিকদের অপরিসীম অবদান রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে ১৩ জন সাংবাদিক শহীদ হয়েছেন। আর গত জুলাই আন্দোলনের শেষ দিনগুলোতে ৬ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৫ জনকে আমরা শহীদ হিসেবে ঘোষণা করেছি। জুলাইয়ের শহীদদের ছেড়ে যাওয়া নিঃশ্বাসের বাতাস থেকেই আজ আমরা স্বাধীনভাবে অক্সিজেন নিচ্ছি। এই ত্যাগের কথা আমাদের কোনোভাবেই ভোলা চলবে না।

তিন দিনব্যাপী এই মাল্টিমিডিয়া, ফ্যাক্ট চেক ও এআই ব্যবহার বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি স্পিকার ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান, পুলিশ সুপার তরিকুল ইসলাম এবং দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আহমেদ সাদাত। কর্মশালায় দুর্গাপুর প্রেস ক্লাবসহ উপজেলার বিভিন্ন গণমাধ্যমের মোট ৩৫ জন সাংবাদিক অংশগ্রহণ করেন।