ওই মালতীলতা দোলে

গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে ঢাকা ফিরছি। এরই মধ্যে একটি খামারবাড়ি দেখতে যাওয়ার আমন্ত্রণ এলো। এই শেষ জ্যৈষ্ঠেও প্রকৃতিতে বর্ষার সুর। মাথার উপরে মেঘ বৃষ্টি রোদ। তার সঙ্গে ঘামঝরানো তাপ। মাওনা চৌরাস্তায় এসে রীতিমতো যানজটে পড়লাম। ত্রিশ মিনিটের মধ্যে শ্রীপুরের সিংগারদীঘি গ্রামে গিয়ে পৌঁছালাম। গ্রামের পথ অপেক্ষাকৃত নির্জন। চারপাশে গৃহস্থ বাড়ির সবজির মাচা আর বিচিত্র উদ্ভিদের ঠাসবুনন। গ্রামের এসব দৃশ্য প্রাণে শিহরণ ছড়ায়। পথের দুপাশ সবুজে মোড়ানো। এই সবুজ একেবারে ধোয়ামোছা পরিষ্কার।

কৃষিবিদ মোহাম্মদ আতিকুল ইসলাম মূল ফটকেই অপেক্ষা করছিলেন। বাড়িটি মূলত একটি বেসরকারি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের। ভেতরে যেতেই চোখে পড়ল নবীন লিচু আর আমবাগান। গাছে গাছে কাঁচা-মিঠে আম ঝুলছে। হাঁটাপথের দুপাশে দুরঙের নয়নতারা। এপথেই মিলল দৃষ্টিনন্দন ড্রাগন ফলের বাগান। পাশের এক টুকরো বাগানে পাওয়া গেল বিচিত্র রঙের জার্বেরা। উজ্বল রঙের এ ফুল সহজে নজরকাড়ে। জার্বেরার মোহ থেকে দৃষ্টি সরাতেই চোখে পড়ল একটি সুসজ্জিত অর্কিড ঘর। আলো ঝলমল অর্কিড ঘরে যাওয়ার আগে মায়ার বাঁধনে জড়াল প্রিয় মালতীলতা। এই  নিভৃত গ্রামে এমন যতেœরাখা আর্চ ভরতি মালতী দেখে রীতিমতো মুগ্ধ। কয়েকগুচ্ছ শুভ্র মালতী তার কোমল পাপড়ি মেলে ধরেছে। রবীন্দ্রনাথ অন্তত ১৭ বার এই ফুলের উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন ‘বাদলবাতাস মাতে মালতীর গন্ধে।’ অথবা ‘ওই মালতীলতা দোলে/পিয়াল তরুর কোলে, পূব হাওয়াতে।’

মালতী চমৎকার ভেষজগুণ সম্পন্ন। সুশ্রুত সংহিতার সূত্রস্থানের ৪৩ অধ্যায়ের ৩০৫ শ্লোকে বলা হয়েছে মালতী এবং মল্লিকা ফুল তিক্ত রসসম্পন্ন। তাই পিত্তবিকার দূর করে এবং সুগন্ধিযুক্ত। আবার চরকের সূত্রস্থানের পঞ্চম অধ্যায়ে মালতীর শক্ত ডাল দিয়ে দাঁতনের উপকারীতার কথাও বলা হয়েছে। কুষ্ঠ রোগেও ফুলের রসের প্রলেপ বেশ কার্যকর। এ ছাড়া নানান ধরনের চর্মরোগেও মালতীর পাতা ব্যবহার করা হয়। প্রসবকালে মায়েদের শরীরে জ্বালাপোড়া বাড়লে ৩ গ্রাম শুকনো ফুল বা ৬ গ্রাম তাজাফুল সামান্য চিনি দিয়ে এক কাপ শরবত তৈরি করে ৩০ মিনিট পর পর খাওয়ালে উপশম হয়। আবার প্রস্রাবের জ্বালায়ও মালতী গাছের শিকড়ের বাকল ও পাতার শরবত বেশ কার্যকর।

মালতী কাষ্ঠললতার গাছ। রমনা পার্ক, শিশু একাডেমি, ধানমন্ডির ছায়ানট ভবন প্রাঙ্গণ, সেগুনবাগিচা রিপোর্টাস ইউনিটি প্রাঙ্গণসহ সীমিত কয়েকটি স্থানেই চোখে পড়ে। গাছ বহুবর্ষজীবী। বয়স্ক অবস্থায় বৃহদাকৃতির। পাতা আয়তাকার, ৮ সেমি লম্বা, বোঁটা ও শিরা লালচে-বেগুনি। ফুল সাদা, সুগন্ধি, গড়নের দিক থেকে অনেকটা শিউলি ফুলের মতো, পাপড়ি মোড়ানো। বৃতি ৫, লম্বা ও চোখা। দলনলের আগায় ৫ পাপড়ি, সরু ও লম্বা। প্রধান প্রস্ফুটনকাল বর্ষা।

লেখক : প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক