কাঁটাতার কেটে অবাধ চলাচল

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরের ভেতর ও বাইরের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের নেওয়া কোটি কোটি টাকার প্রকল্প এখন ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। ক্যাম্পের চারপাশের সুরক্ষায় নির্মিত কাঁটাতারের বেড়া কেটে তৈরি করা হয়েছে একাধিক অবৈধ যাতায়াতের পথ। এসব কাটা পথ ব্যবহার করে রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের বাইরে অবাধে যাতায়াত করছে, যা স্থানীয় বাসিন্দা এবং সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করেছে।

পরিকল্পিতভাবে কাঁটাতারের বেড়া ধ্বংস : স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালী এবং টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদাসহ বিভিন্ন ক্যাম্পের কাঁটাতারের বেড়া পরিকল্পিতভাবে একাধিক অংশে কেটে ফেলা হয়েছে। দিনের আলোতে সাধারণ যাতায়াতের জন্য এবং রাতের অন্ধকারে অপরাধীদের পারাপারের সুবিধার্থে এই রুটগুলো তৈরি করা হয়েছে। নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকার পরও কীভাবে এবং কাদের মদদে এসব বেড়া দিনের পর দিন কাটা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

অপরাধ ও চোরাচালানের ‘গোপন পথ’ : অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই কাটা পথগুলো এখন কেবল সাধারণ রোহিঙ্গাদের যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং অপরাধীচক্রের নিরাপদ করিডরে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের আশঙ্কা, সীমান্ত দিয়ে আসা মরণনেশা ইয়াবা ও আইস পাচার, অস্ত্র চোরাচালান, অপহরণ, চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো মারাত্মক অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িতদের প্রধান গোপন রুট এগুলো। অপরাধীরা ক্যাম্পের বাইরে এসে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটন করে অতি সহজেই এই কাটা পথ দিয়ে পুনরায় ক্যাম্পে ঢুকে পড়ছে।

কাঁটাতারের বেড়া উধাও শত স্থানে : টেকনাফে এমএসএফ হাসপাতালের সামনের সড়কের দুই পাশ ধরে রোহিঙ্গা ক্যাম্প। অভিযোগ রয়েছে, অবাধ চলাচলের সুবিধা করে নিতে রোহিঙ্গারা এই ক্যাম্পের চারদিকের কাঁটাতারের বেড়া কেটে ফেলেছে। কেটে ফেলা বেড়ার অংশ দিয়ে চলাফেরা করছে ছোট-বড় সবাই।

ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক (পুলিশ সুপার) রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ‘ক্যাম্পের কাঁটাতারের বেড়া রক্ষণাবেক্ষণ বা সংস্কারের কাজটি সরাসরি আমাদের অধীনে না থাকলেও, আমরা বসে নেই। ক্যাম্প থেকে বাইরে বের হওয়ার সম্ভাব্য পথ এবং সংযোগ সড়কগুলোতে আমাদের তল্লাশিচৌকি বা চেকপোস্টের কার্যক্রম অত্যন্ত কঠোর করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘লোকালয় এবং ক্যাম্পের মধ্যবর্তী ফাঁকফোকরগুলো বন্ধ করতে আমরা নিয়মিত টহল জোরদার করেছি। তল্লাশিচৌকিতে কড়াকড়ির মাধ্যমে ক্যাম্পকে সুরক্ষিত রাখতে এবং অপরাধীদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি ও বাহিনী সম্পূর্ণ বদ্ধপরিকর।’

নিরাপত্তা বেষ্টনী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং পুরো প্রক্রিয়ার তদারকি নিয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান জানান, কাঁটাতারের বেড়াটি মূলত বাইরের কোনো অনাকাক্সিক্ষত অনুপ্রবেশ রোধ এবং রোহিঙ্গাদের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে তৈরি করা হয়েছিল। কিছু জায়গায় দুষ্কৃতকারীরা বেড়া কাটছে বলে অভিযোগ আমরা পেয়েছি। এ বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করছি, যাতে দ্রুততম সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো স্থায়ীভাবে মেরামত করা যায়।’

চ্যালেঞ্জের মুখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী : অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অপরাধীরা দ্রুত ঘিঞ্জি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। অনেক ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হলেও অপরাধীদের তাৎক্ষণিক অবস্থান চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর ফলে পুরো অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটছে। 

উদ্যোগী হতে হবে স্থানীয়দের : সচেতন মহল বলছে, রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের মধ্যে রাখতে হলে শুধু পুলিশ নয়, স্থানীয়দের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। স্থানীয়রা যদি রোহিঙ্গাদের কাজ দিত তাহলে রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের বাইরে যেত না বলে দাবি করেছেন পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা। তারা জানান, উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্প কাঁটাতারের বেষ্টনীতে ঘেরা। নিরাপত্তায় নিয়োজিত এপিবিএনের ৮, ১৪ ও ১৬ ব্যাটালিয়ন। ৩৩টি ক্যাম্পের ভেতর ৮ হাজারের বেশি ইজিবাইক (টমটম), ৩ হাজারের বেশি অটোরিকশা চলাচল করে, যার চালকও রোহিঙ্গা। থাকা-খাওয়াসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা ভেতরে থাকার পরও রোহিঙ্গারা বাইরে চলাচল করছে অহরহ। একাধিক রোহিঙ্গা জানায়, ক্যাম্পে মাঝেমধ্যে পুলিশ এলেও রোহিঙ্গাদের চলাচলে কখনো বাধা দেওয়া হয় না। যেকোনো প্রয়োজনে টেকনাফ থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত তারা নিয়মিত অবাধে যাতায়াত করতে পারে।

অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপের দাবি : উখিয়া-টেকনাফের সচেতন নাগরিক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, শুধু কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করলেই হবে না, এর সুরক্ষায় সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও কঠোর টহল ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। দ্রুত এই কাটা অংশগুলো মেরামত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জনগণ।