শিবালয়ে বিধবা ভাতার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৩ এএম

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার উলাইল ইউনিয়নের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিধবা, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য মনোনীতদের নির্বাচন করা ও ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভাতার তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য প্রতিজনের কাছ থেকে উৎকোচ গ্রহণ করা হয়েছে। টাকা দিয়ে তালিকাভুক্ত হয়েও বছর শেষ হওয়ার পরও নির্ধারিত কোনো ভাতা পাননি বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উলাইল ইউনিয়নে বিধবা ভাতার জন্য নতুন অন্তর্ভুক্ত হন ১৭ জন। এই ১৭ জনের মধ্যে ১০ জনের তথ্য মাঠপর্যায়ে যাচাই করে দেখা গেছে, তিনজন কোনো ভাতাই পাননি। চারজনের কেউ পেয়েছেন অর্ধেক, কেউ পেয়েছেন তারও কম। তবে তিনজন সরকার নির্ধারিত বার্ষিক বরাদ্দ ৭ হাজার ৮০০ টাকা করে পেয়েছেন।

জানা গেছে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিধবা, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য নির্বাচিতদের প্রতি মাসে ৬৫০ টাকা করে তিন মাস অন্তর ভাতা দেওয়ার কথা। অর্থাৎ, ১২ মাসে একজন ভাতাভোগী বছরে পাবেন মোট ৭ হাজার ৮০০ টাকা। গত জুন মাসে অর্থ বছর শেষ হওয়ার আগেই সমুদয় টাকা পাওয়ার কথা। অনলাইন বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে যার যার অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল নম্বরে সরাসারি টাকা জমা হওয়ার কথা। কিন্তু ব্যত্যয় ঘটেছে।

অনুসন্ধানে বিধবা ভাতার জন্য নির্বাচিতদের তালিকা সংগ্রহ করে তথ্য যাচাই করা হয়। মুক্তানগর গ্রামের তালিকাভুক্ত রাজিয়া বেগম জানান, আবেদন করার পর থেকে এক বছরে উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় বেশ কয়েকবার তাকে নেওয়া হয়েছে, ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো টাকা পাননি।

চাড়িপাড়া গ্রামের চায়না বেগম জানান, স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে বিভিন্ন বাসায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। বিধবা ভাতার জন্য তালিকায় তার নাম উঠলেও এখনো কোনো টাকা পাননি।

৮নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা সুফিয়া বেগম জানান, ভাতার জন্য আবেদন করার পর মেম্বার জানিয়েছেন টাকা মোবাইলে চলে যাবে। কিন্তু এখনো কোনো টাকা পাননি তিনি।

একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন, ভাতার কার্ড পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে ৫ হাজার করে টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিয়ম : উলাইল ইউনিয়নের প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। দড়িকয়ড়া গ্রামের আসমা জানান, তার শাশুড়ি সখিনা বেগম বয়স্ক ভাতা হিসেবে ৭ হাজার ৮০০ টাকা পাওয়ার কথা থাকলে পেয়েছেন ৩ হাজার ৯০০ টাকা। স্থানীয় মেম্বারকে জানানো হলে তিনি জানিয়েছেন পরবর্তীতে আবারও টাকা আসবে কিন্তু আসেনি।

আমডালা গ্রামের রোকেয়া বেগম জানান, স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি বিভিন্ন বাসায় কাজ করে দুই ছেলে নিয়ে কোনো রকম করে জীবন পার করছেন। তিনিও মোবাইলে মাত্র ৩ হাজার ৯০০ টাকা পেয়েছেন। 

দড়িকয়ড়ার আব্দুল হামিদ প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য আবেদন করে তালিকাভুক্ত হলেও কোনো টাকা পাননি। একই গ্রামের প্রতিবন্ধী ওজিফা বেগমের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিবন্ধী কার্ডের জন্য তারা প্রত্যেকে স্থানীয় মহিলা মেম্বারকে ৫ হাজার টাকা করে দিয়েছেন বলে জানান। এ ব্যাপারে মহিলা মেম্বার রিনা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবন্ধী কার্ড করে দেওয়ার বিনিময়ে টাকা নেওয়ার এবং ভাতাভোগীদের টাকা না পাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। অবশ্য যোগাযোগের দুুই দিন পর দুই প্রতিবন্ধী ব্যক্তি তাদের ভাতার টাকা পেয়ে গেছেন বলে এ প্রতিবেদকে জানান তিনি।

যোগাযোগ করা হলে উলাইল ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা কারিগরি প্রশিক্ষক আব্দুল হান্নান বলেন, তিনি চলতি বছরের জুন মাসের ১৫ তারিখে এলপিআরএ গিয়েছেন। তালিকার সবাকেই সরকারি ভাতা দিয়ে দেওয়ার কথা। টাকা কম পেয়েছে বা পায়নি এ রকম কেউ তার কাছে আসেননি। কেউ টাকা না পেয়ে থাকলে তাড়াতাড়ি পেয়ে যাবেন।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জয় কৃষ্ণ সরকার জানান, তিনি কয়েক দিন হলো এখানে যোগ দিয়েছেন। তবে নতুন ভাতাভোগীরা শতভাগ টাকা পেয়ে যাওয়ার কথা। কেউ না পেয়ে থাকলে কয়েক দিনের মধ্যেই সমাধানে করা চেষ্টা করবেন।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মনিষা রানী কর্মকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিনি ভাতা-সংক্রান্ত মৌখিক বা লিখিত কোনো অভিযোগ পাননি। অভিযোগ এলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অনিয়ম তদন্তে কমিটি গঠন : শিবালয় উপজেলায় ভাতা বিতরণে অনিয়মের একটি খবর গত ১৭ জুলাই দেশ রূপান্তরের অনলাইনে প্রকাশিত হলে এ নিয়ে সমাজসেবা বিভাগ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। আগামী সোমবার এ তদন্ত হবে বলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (সামাজিক নিরাপত্তা-০৩) শিলা রানী দাসের স্বাক্ষরিত এক পত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত