পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে নতুন বাঁক

ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী আনসার আল্লাহ (হুতি) নিয়ন্ত্রিত বন্দরনগরী হোদেইদায় বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব। গত শুক্রবার গভীর রাতে এ হামলার জবাবে সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে গতকাল শনিবার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে পাল্টা জবাব দিয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। দুপক্ষের মধ্যে ক্রমশ বাড়তে থাকা এই উত্তেজনা উপসাগরীয় অঞ্চলের চলমান যুদ্ধে নতুন বাঁক এনেছে এবং সংঘাতের পরিধিও বিস্তৃত করছে। হুথিদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, হোদেইদার পার্শ্ববর্তী কামারান দ্বীপেও হামলা হয়েছে। হুতি-সংশ্লিষ্ট আল মাসিরাহ টিভিতে বলা হয়েছে, টেলিযোগাযোগ কর্র্তৃপক্ষের স্থাপনাগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

তবে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বন্দরে হামলা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে। হুতি-নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের অঞ্চলগুলোর জন্য হোদেইদাহ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী। এ বন্দর দিয়েই হুতি-নিয়ন্ত্রিত উত্তর ইয়েমেনে বাণিজ্যিক পণ্য ও মানবিক সহায়তার বেশির ভাগ চালান প্রবেশ করে।

প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় আসির প্রদেশের কিং খালিদ বিমানঘাঁটিতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনী। মেহর নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ইয়েমেনে তৈরি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সৌদি আরবের খামিস মুশাইত শহরের কাছে অবস্থিত কিং খালিদ বিমানঘাঁটির নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। রাজধানী রিয়াদ থেকে শহরটির দূরত্ব প্রায় ৮৮৪ কিলোমিটার। পাশাপাশি সৌদি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল ও গ্যাস কোম্পানি সৌদি আরামকোর জিজান অঞ্চলের একটি তেল স্থাপনায় একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানোর দাবি করেছে হুতি বিদ্রোহীরা। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর জিজানের কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘিœত হয়। পাশাপাশি সৌদি আরবের বন্দরনগরী ইয়ানবুতেও শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

হামলার বিষয়ে সৌদি কর্র্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে সৌদি কর্র্তৃপক্ষ ওই এলাকায় জরুরি সতর্কতা জারি করেছিল বলে জানিয়েছে বিবিসি। গ্রিসের নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়ানবু অঞ্চলের তেল শোধনাগার লক্ষ্য করে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। গ্রিক নিরাপত্তা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে নিয়োজিত ওই আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাটি মূলত গ্রিসের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা পরিচালনা করছিলেন। সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষায় সহায়তার অংশ হিসেবে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ‘প্যাট্রিয়ট’ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করে গ্রিস। ২০২১ সালের একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় করা হয় এ মোতায়েন। এদিকে, পাল্টাপাল্টি উত্তেজনার মধ্যেই সংলাপের মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। গতকাল শনিবার সরকারি গণমাধ্যম ইরান ডেইলিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ আহ্বান জানান তিনি। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, ইয়েমেন, বাব আল-মান্দেব এবং এ অঞ্চলের অন্যান্য সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই।’ আরাগচি দাবি করেন, ইয়েমেনের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ইরানকে দায়ী করা যায় না। তার ভাষ্য, বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মূল কারণ ইয়েমেন, সৌদি আরব এবং এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ ও অমীমাংসিত ইস্যু।

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহী ও সৌদি আরবের মধ্যে সংঘাত অনেকটাই স্থবির ছিল। তবে চলতি মাসে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ইরান-সমর্থিত হুতিরা সৌদি আরবের বন্দরগুলো অবরোধের ঘোষণা দেয় এবং তেলবাহী জাহাজে হামলার দাবি করে। এই অবরোধের ফলে বিশ্ববাজারে সৌদি আরবের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।