লেখালেখির শত উপকার

লেখালেখি কারও কাছে শখ, আবার কারও কাছে সমাজের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার এক অনন্ত তাড়না। লেখনীর মাধ্যমে ব্যক্তির চিন্তাশীল সত্ত্বার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। একজন লেখক লেখার মাধ্যমে তুলে ধরেন সংকট, তেমনি বাতলে দেন সৃজনশীল সমাধানও। লেখার ফলে অতিচিন্তা কমে, যেকোনো বিষয় নিজের মধ্যে পরিষ্কার হয়, কর্মপরিকল্পনা সুগঠিত হয়। লেখালেখির মাধ্যমে বিকশিত হয় সুপ্ত প্রতিভা। লেখার উপকারিতা নিয়ে লিখেছেন নাহিদুল ইসলাম

ব্যক্তিত্বের বিকাশে সহায়ক

লেখালেখি একজন ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশে গভীর এবং বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। এর মাধ্যমে ব্যক্তি শুধু চিন্তাভাবনা প্রকাশ করে না, বরং আত্ম-আবিষ্কার এবং মেধার বিকা ঘটে। এটি আমাদের মননশীলতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, যা ব্যক্তিগত এবং পেশাগত জীবনে সফলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারুণ্যের বিকাশ এবং চিন্তাধারা গঠনে এর প্রভাব বহুমাত্রিক। লেখালেখি এমন একটি মাধ্যম, যার মাধ্যমে অভূতপূর্ব সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছানো যায়। এটি সমাজ সংস্কারের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। আত্মহত্যার প্রবণতা কমাতে লেখালেখি একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত। এটি আমাদের অভ্যন্তরীণ চিন্তা এবং অনুভূতিগুলো প্রকাশ করার সুযোগ দেয়, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।

জ্ঞান অন্বেষণের প্রেরণা জোগায়

যুগ পরম্পরায় জ্ঞানের বিকাশ ও সংরক্ষণের মাধ্যম হয়ে এসেছে লেখালেখি। নানা গ্রন্থে তা সংরক্ষিত রয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, অধিকাংশ মানবসমাজকে সুগঠিত করতে লেখা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। লেখা জ্ঞান-হস্তান্তরের প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ একটি রীতি। একজন দক্ষ লেখক হতে হলে ধৈর্য, সময় ও নিষ্ঠার সঙ্গে এবং লেখার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থেকে অবিচল চর্চা চালিয়ে যেতে হয়। তথ্য না জানলে ভালো লেখা তৈরি হয় না। ভাবনা অনেকের মধ্যেই থাকে। তার প্রকাশ না ঘটলে তা অনর্থক।

লেখা সৃষ্টিশীল হতে শেখায়

মানুষের চিন্তাগুলো হয় আকাশের মেঘের মতো। আকাশ যেমন সর্বদা মেঘকে ধরে রাখতে পারে না, তেমন মানুষও সর্বদা মনের চিন্তার মেঘকে ধরে রাখতে পারে না। তবে যারা চিন্তাগুলোকে কলম হতে নিঃসৃত বর্ণ, শব্দ এবং বাক্য দিয়ে গেঁথে ফেলতে জানে তারা তাদের মনের আকাশের মেঘকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তার যখন ইচ্ছা সেই আকাশের মেঘ ঝরিয়ে ভিজতে পারে, পারে অন্যকে ভেজাতে। মানুষের চিন্তা সৃষ্টিশীল। সে চিন্তা দিয়ে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করে, করে কাব্য রচনা। কখনো তার চিন্তার মেঘ থেকে হয় বজ্রপাত। সে বজ্রপাতে হয় দুষ্টের দমন, হয় শিষ্টের লালন। সে তার লেখনি দিয়ে যে অবদান রেখে যেতে পারে, তা স্মরণীয় হয়ে থাকে ইতিহাসের প্রতিটি পাতায়। আমাদের তরুণদের সৃষ্টিশীল চিন্তাগুলোকে ধরে রাখতে হলে নিয়মিত লিখতে হবে।

অতিচিন্তা দূর করে

অনেকেই অতিচিন্তায় ভোগেন। যেকোনো কাজের পরবর্তী প্রভাব কী হতে পারে সেটি নিয়ে অতিরিক্ত নেতিবাচক চিন্তা করে মনের ওপর অনর্থক চাপ ফেলে, অসুস্থ হয়ে যায়। এই অতিচিন্তার ফলে অনেক কাজই অসমাপ্ত থেকে যায়। মনোবিজ্ঞানীরা এই অতিচিন্তা থেকে পরিত্রাণ পেতে লিখতে উৎসাহিত করেন। কোনো বিষয় নিয়ে লেখার ফলে তা বিমূর্ত জগৎ থেকে মূর্ত জগতে আবির্ভূত হয়। ফলে তার প্রভাব সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে অবগত হওয়া সম্ভব হয়। এর ফলে অনর্থক চাপ বোধ করা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

গুছিয়ে চিন্তা করা যায়

অনেক সময় আমরা নানা চিন্তায় ভারাক্রান্ত থাকি। নানা কাজের ভেতরে কোনটি আগে করব কোনটি পরে করব বুঝতে পারি না। এ সময় নিজের করণীয় একটি সাদা কাগজের ওপর লিখলে কোন কাজটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, সেটি নিজের কাছেই পরিষ্কার হয়ে যায়। লেখালেখি এভাবে গুছিয়ে চিন্তা করতে সাহায্য করে।

লেখা সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার

 লেখালেখি শুধু কয়েকটি শব্দ নয়; বরং সমাজ ও দেশ পরিবর্তনের বড় একটি হাতিয়ার। লেখালেখির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন সমস্যা, সম্ভাবনা, আশা, ভাবনাকে দেশ ও বিবাসীর সামনে তুলে ধরা সম্ভব। লেখালেখির মাধ্যমে যেকোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং গঠনমূলক সমালোচনা করা যায়। সমাজকে বদলে দিতে লেখালেখির গুরুত্ব অপরিসীম। তাই তরুণ প্রজন্মকে লেখালেখির মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনে উদ্যোগী হতে হবে।

লেখা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে

তারুণ্যের মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় অমূল্য একটি হাতিয়ার হচ্ছে লেখালেখি। এটি সমাজে ইতিবাচক নানা পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবেও কাজ করে। তরুণ লেখকরা তাদের চিন্তা ও অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যমে সামাজিক অসমতা, বৈষম্য ও বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোকপাত করতে পারে, যা সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি ও নানা পরিবর্তন আনয়নে সহায়ক। লেখালেখি তরুণদের বিকাশ ও সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। তারুণ্যের সৃষ্টিশীলতাকে উৎসাহিত করতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত লেখালেখির চর্চা করতে হবে।

লেখক : ফিচার ও কলাম লেখক