‘আবার জন্ম নিলে এমন জীবনই চাইতাম’

দেশের আলোকিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম। শুধু অভিনেতাই নন, তিনি একাধারে একজন আবৃত্তিকার, সফল সংগঠক এবং সংগীতশিল্পী। একসময় নায়ক হিসেবেও অনেকগুলো সিনেমায় অভিনয় করেছেন। স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, আজীবন সম্মাননাসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিশেষ পুরস্কারে  ভূষিত হয়েছেন তিনি।  বহুমুখী এই প্রতিভা আজ পা রাখলেন জীবনের বিরানব্বই’তম বছরে। তার সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদনটি সাজিয়েছেন জাহাঙ্গীর বিপ্লব

জীবন্ত এই কিংবদন্তির দাবি, দেশের শোবিজ অঙ্গন কিংবা আবৃত্তিশিল্পী ও অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ। জীবনের বিশেষ এই দিনে বাংলাদেশে নেই সৈয়দ হাসান ইমাম।  গত কয়েক বছর ধরেই স্ত্রীসহ সুদূর আমেরিকায় বসবাস করেছেন এই কিংবদন্তি। তবে দেশের বাইরে থাকলেও প্রতি বছর তার জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানান আত্মীয়স্বজন, ভক্ত অনুরাগী ও শোবিজের মানুষজন। সবার ভালোবাসায় সিক্ত হন। এবারও সেরকমই হবে বলে মনে করছেন তিনি।

তার জন্মদিন উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানাতে ও খোঁজখবর জানাতে দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয় তার সঙ্গে। দেশ রূপান্তরকে ধন্যবাদ জানিয়ে সৈয়দ হাসান ইমাম বলেন, ‘জন্মদিন এলে আপনাদের মতো আরও অনেক সাংবাদিক ফোন করেন। আমিও প্রাণ খুলে কথা বলার চেষ্টা করি। সত্যি কথা বলতে, সময় যত সামনের দিকে এগোচ্ছে, আমার শারীরিক অবস্থাও ধীরে ধীরে বেশি অবনতি হচ্ছে। এই বয়সে পুরোপুরি ভালো থাকা না গেলেও যতটুকু আছি, ভালোই আছি। ভালো এবং সুস্থ থাকার জন্য মোটামুটি নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করি। ভালো লাগে অতীতের কথা মনে পড়লে।’

কথা যেন তাকে পেয়ে বসে। ভাঙা গলায় ধীর-স্বরে কথা বলতেই থাকেন তিনি।  বলেনÑ ‘দেখুন, একটা বিচিত্র জীবন কাটালাম আমি। বেঁচে থাকার চেয়ে সুন্দর আর কিছু হতে পারে না। বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে এখনো বেঁচে আছি। জীবন নিয়ে আমার কেবলই মনে হয় মানুষের বয়স বাড়ে, মানুষ বুড়ো হয়, কিন্তু, মন কখনো বুড়ো হয় না। মন চির যৌবনে থেকে যায়। আমি আমার জীবনটাকে নিয়ে গর্ব করি। নানা সংগ্রাম ও সংকটের মধ্যেও নিজের জীবনকে পুরোপুরি উপভোগ করে গেছি। আবার জন্ম নিলে আমি এমন জীবনই চাইতাম। সবার ভালোবাসা নিয়ে এখনো বেঁচে আছি এ আমার জন্য পরম পাওয়া।’

তিনি বলেন, ১৯৩৫ সালের আজকের এই দিনে ভারতের বর্ধমানে মামাবাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করে সেখানেই শৈশব কাটিয়েছেন তিনি। ১৯৫০ সালে কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠানের এক নাটিকায় অংশ নেওয়ার মাধ্যমে অভিনয় জীবন শুরু হয় হাসান ইমামের। ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় সংগঠক ছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলন ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ হাসান ইমামের জীবনের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী হিসেবে কাজ করেন তিনি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এ শিল্পী সভাপতি হিসেবে দীর্ঘসময় বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

শৈশব নিয়ে হাসান ইমাম বলেন, ‘আমার বাবার বাড়ি ছিল বাগেরহাটে। বাবার নাম ছিল সৈয়দ সোলেমান আলী ও মা সৈয়দা সায়ীদা খাতুন। ভারতের বর্ধমানে নানা বাড়িতে আমার জন্ম। আগেকার মায়েরা যখন অন্তঃসত্ত্বা হতেন, তখন সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে তাদের বাপের বাড়িতে অবস্থান নিতেন। আমার বেলায়ও এমনটি ঘটেছে। আমার শৈশব কেটেছে বর্ধমানে। বাবা মারা যাওয়ার আগে চেয়েছিলেন আমি যেন মামা বাড়িতে থেকেই পড়ালেখা করি। কারণ, সেখানে পড়ালেখার পরিবেশটা ভালো ছিল। পড়ালেখার পাশাপাশি ছাত্রজীবনে রাজনীতির সঙ্গেও আমার সম্পৃক্ততা গড়ে ওঠে।’

১৯৫৭ সালে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানে যোগ দেন সৈয়দ হাসান ইমাম । ১৯৬০ সাল থেকে হাসান ইমামের অভিনয় জীবন শুরু। এ বছর থেকে তিনি চলচ্চিত্রে এবং ১৯৬৪ সাল থেকে টেলিভিশনে অভিনয় শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে সমগ্র পাকিস্তানের চলচ্চিত্র উৎসবে হাসান ইমাম শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান লাভ করেন খান আতাউর রহমানের ‘অনেক দিনের চেনা’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য। তিনি ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র শতবর্ষের কেন্দ্রীয় উৎসবে ডামা সার্কেল প্রযোজিত ‘তাসের দেশ’, ‘রাজা ও রানী’ এবং ‘রক্তকরবী’ নাটকে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন। তিনি ১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় কর্মী ছিলেন। বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটকে জন্মলগ্ন থেকেই নিয়মিত অভিনয় করা এ বরেণ্য ব্যক্তির জন্মদিনে দেশ রূপান্তরের শুভেচ্ছা।