সাঁওতালপল্লীর একটি দোচালা মাটির ঘরের সামনে সহজ ভঙিতে দাঁড়িয়ে আছেন এক চাষি। পরনে কাছা করা লুঙ্গি আর কোমরে গামছা বাঁধা। তার কালচে পায়ে মাটির দাগ। হাড় খাটুনিতে শরীর কিছুটা অবসন্ন। পরিশ্রমী হাত দুটো পেছনে রেখে শক্ত দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। বিকেলের নরম আলোয় ছবিটা তোলা। ছবির শিল্পী হয়তো ইচ্ছে করেই কৃষকের পুরো শরীর ফ্রেমে ধরেননি। ধরেছেন বুকের নিচ থেকে পা পর্যন্ত। আর তাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে মেহনতি অভিব্যক্তি। আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগের এই ছবি তার নিজ ভূমির প্রাকৃতজনকে তুলে ধরবার এক জুতসই প্রকাশ যেন। ইতিহাস বলে, তেভাগা আন্দোলনের সূতিকাগার চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে বসেই ইলা মিত্র বাংলার শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। বরেন্দ্র অঞ্চলের রুক্ষ মাটির ভাগচাষিদের সেই মরণপণ লড়াইয়ের গল্পই যেন মনজুর আলম বেগের এই ছবিতে ফুঠে ওঠে।
মনজুর আলম বেগ এই ছবিটার নাম দিয়েছিলেন ‘শ্রম’। ১৯৭৮ সালে কানাডার এডমন্ড শহরে অনুষ্ঠিত প্রথম কমনওয়েলথ আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে তিনি ছবিটা পাঠান। ছবিটা সেই বছর সম্মানসূচক পুরস্কারে জেতে। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৭ সালের জুলাই মাসে পুরস্কারজয়ী ছবিটা বিপিএস নিউজলেটার-এ ছাপা হয়। ছবিটি কবে, কোথায় তোলা জানতে যোগাযোগ করি মনজুর আলম বেগের জীবনীকার জাহাঙ্গীর সেলিমের সঙ্গে। জাহাঙ্গীর সেলিম জানালেন, ‘ছবিটি নাচোলের সাঁওতালপল্লীর। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে রুর্যাল বাংলাদেশ নামে একটি ফটো অ্যালবাম প্রকাশ করেন মনজুর আলম বেগ। এই অ্যালবাম প্রকাশের আগে তিনি নাচোল, কানসাট, গোদাগাড়ীসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান ও ওখানকার জীবনঘনিষ্ঠ মানুষের ছবি ক্যামেরায় ধারণ করেন।’
মনজুর আলম বেগের জন্ম ১৯৩১ সালের ১ অক্টোবর চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর গ্রামের চৌধুরীপাড়ায়, মাতুলালয়ে। ফলে এই অঞ্চলের প্রতি তার জন্মগত টান কিংবা পক্ষপাতিত্ব থাকা স্বাভাবিক। ফলে বারবার তিনি ক্যামেরা নিয়ে ছুটে গেছেন, যেখানে তিনি জন্মেছেন। মানুষ আসলে তার শৈশবের স্মৃতি নিয়ে বড় হয়। পরবর্তী সময়ে বা পরিণত বয়সে নানাভাবে তার প্রতিফলনও ঘটে। বিশেষ করে শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে মানুষদের বেলায় এর প্রভাব বেশ পরিলক্ষিত হয়। বোধ করি, মনজুর আলম বেগের বেলায়ও এমনটি ঘটেছে। তার যত শক্তিশালী ছবি আমরা দেখি, এর বেশির ভাগ ছবিতেই ঘুরে ফিরে আসে বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষের সুখ-দুঃখের আখ্যান। সেই আখ্যানপর্বের এক কালজয়ী ছবি ‘শ্রম’।
নাঈম মোহায়মেন রচিত বাংলার আলোকচিত্রের বাস্তবতা অভিযান গ্রন্থের ২১ নম্বর পৃষ্ঠায় [নোকতা, ডিসেম্বর ২০২৫] এই ছবির সামান্য বর্ণনা আছে। ‘শ্রম’ শিরোনামের ছবিটা আনুমানিক সত্তর দশকে তোলা বলে ডিপার্ট পত্রিকায় বরাত দিয়ে তিনি তার বইয়ে উল্লেখ করেন। নাঈম মোহায়মেন লিখেছেন ‘একজন কৃষকের লুঙ্গি কাছা করে হাঁটুর অনেক উপরে ওঠানো, তার সারা পায়ে মাটির দাগ। লোকটা অনেকটা অ্যাটেনশান হয়েই দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু কোমরের পেছনে দুই হাত রাখা বলেই মিলিটারি পোজটা ভেঙে গেছে। কৃষক হয়তো বিশ্রাম করছে অথবা বেগের ক্যামেরার জন্য বিনয় সহকারে পোজ দিচ্ছে। এই ছবি দেখে ভাবি যে বেগ সাহেব হয়তো কোনো এক ক্লাসিক্যাল পেইন্টিং দ্বারা উদ্দীপিত হয়েছিলেন। কিন্তু সেই সৌন্দর্য চর্চা চলে এসেছে ব্যস্ত কৃষকের সীমিত-বিশ্রাম-সময়ের রূঢ় বাস্তবতার চিত্রায়ণে। আর ফটোগ্রাফি যেহেতু ‘আসল ঘটনা’ দেখাবার অঙ্গীকার করে, তাই এই বাস্তবতা দর্শককে ‘কিছু একটা করতে হবে’ চিন্তার দিকে ঠেলে দেয়।’
মনজুর আলম বেগের ‘শ্রম’ ছবিটা নিয়ে ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এর সাময়িকী ইজেল-এ একটি প্রবন্ধ লিখেন শিল্পী ও শিল্পসমালোচক মোস্তফা জামান। তার প্রবন্ধের শিরোনাম ‘আলোকচিত্রাচার্যের তিনটি ছবি’। ‘খ- থেকে অখ-ে’ উপ-শিরোনাম দিয়ে তিনি এই ছবি সম্পর্কে লিখেছেন, ‘রাজশাহীতে জন্ম আলোকচিত্রের এই মহাজনের, যিনি এমএ বেগ বা বেগ স্যার নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন, নিজ ভূমির এক প্রাকৃতজনকে ছবিতে ধারণ করেছেন। এই সাঁওতাল পুরুষ বা ভূমিপুত্রের উর্ধ্বাঙ্গ উহ্য রেখে নিম্নাঙ্গ তুল ধরে যে বাস্তবতা প্রকাশ করা গেল, তা অনেকটা জয়নুলের রেখার টানে গড়ে তোলা বাস্তবের অভিঘাত চাড়িয়ে দেওয়া চিত্রভাষার মতো। আলোকচিত্রাচার্যের এই ছবি কোনো প্রতিকৃতি নয়, এটি আলোছায়ার খেলা দেখে তা সবাইকে দেখানোর কোনো সূক্ষ্ম চাতুরিনির্ভর নান্দনিক প্রয়াসও নয়। এখানে দৃষ্টির সূক্ষ্ম তা দিয়ে দেখা যে জীবন, তার গল্প বলতে আলোকচিত্রী মানবমূর্তিকে খ-িত করেছেন, আলোকচিত্র-জগতের নিয়মকে এড়িয়ে গেছেন। এই ছবি জীবনের যে কাহিনি অলক্ষ্যে রয়ে যায়, অব্যক্ত থেকে যায়, তেমন এক কাহিনির প্রতীকী প্রকাশ। এমন প্রতীক বাস্তব থেকে বিযুক্ত না হয়ে, বাস্তবের খ-চিত্র তুলে ধরে প্রতীকধর্মী হয়ে ওঠে, যা দর্শককে বাস্তব ও প্রতীকের দ্বিমুখী তৎপরতার মাঝখানে নিক্ষেপ করে। বিশ্লেষণের পথে আরও দূর এগিয়ে এই চরিত্রের ছবিকে মেটনিমিক বা লাক্ষণিক বাস্তববাদ আখ্যা দেওয়া যায়। ইংরেজি মেটনিমি শব্দের অর্থ যদি হয় লক্ষণা, তবে এই আলোকচিত্রটি সাঁওতাল এক কর্মবীরের দেহের খন্ডি
ত অংশ বা লক্ষণার সূত্রে বাস্তবের সমগ্রতা তুলে ধরতে প্রয়াসী। খ-ের মধ্যে বৃহতের স্বাদ দিতে এই ছবির কারিগর এমএ বেগ সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত এক প্রক্রিয়ার প্রয়োগে মানবমূর্তি ভেঙে দিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, শ্রমশীলতা ও প্রকৃতিঘনিষ্ঠ প্রকৃত জীবন বিষয়ে এক নিরাবেগ বয়ান গড়ে তুলেছেন। পায়ের ধূলি-কাদার আন্তরিক এক পাঠ যেন এক জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক অবস্থার গল্প ও শক্তির আখ্যান বলবার বাসনার ফল।’