হঠাৎ কেন ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি চাইছে সিরিয়া?

দীর্ঘদিনের বৈরিতা কাটিয়ে এবার কি তবে ইসরায়েলের সাথে কোনো নিরাপত্তার চুক্তিতে যাচ্ছে সিরিয়া? মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এমন এক অভাবনীয় ও অবিশ্বাস্য মোড়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা। একাধিক দেশের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সাথে একটি নিরাপত্তা চুক্তিতে পৌঁছাতে দামেস্ক সক্রিয়ভাবে কাজ করছে বলে তিনি নিজে নিশ্চিত করেছেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় আসা এই রাষ্ট্রপ্রধানের মুখ থেকে এমন ঘোষণা আসার পর বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র গুঞ্জন ও জল্পনা। কিন্তু দশকের পর দশক বৈরিতা চলার পর হঠাৎ কেন এই উদ্যোগ?

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার ফ্ল্যাগশিপ অনুষ্ঠান ‘আল মুকাবালা’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা অঞ্চলটির নিরাপত্তা, লেবানন সংকট এবং নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। সাক্ষাৎকারে শারা আশা প্রকাশ করেন, তেল আবিবের সাথে হতে যাওয়া এই নিরাপত্তা চুক্তিটি পরবর্তীতে একটি স্থায়ী ও সার্বিক শান্তির দ্বার উন্মোচন করতে পারে।

তবে প্রশ্ন উঠছে, এই সমঝোতার মাধ্যমে কি সিরিয়া তার ঐতিহাসিক অবস্থান থেকে সরে আসছে? আন্তর্জাতিক মহলের এমন সংশয় উড়িয়ে দিয়ে আল-শারা আশ্বাস দেন, এ ধরনের কোনো চুক্তি ১৯৭১ সাল থেকে অবৈধভাবে দখল করে রাখা ‘গোলান মালভূমি’র ওপর সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব বা অধিকারকে বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ করবে না। তিনি স্পষ্ট জানান, সিরিয়া বর্তমানে ইসরায়েলের সাথে যেকোনো ধরনের সামরিক সংঘাত এড়িয়ে চলছে। আর একটি কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমেই এই গভীর সংকটের ব্যাপক ও স্থায়ী সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। ২০২৪ সালের শেষে শারা ক্ষমতায় আসার পর থেকে দক্ষিণ সিরিয়া অঞ্চলে বারবার ইসরায়েলি বিমান হামলা ও অনুপ্রবেশের খবর পাওয়া গেছে, আর ঠিক সেই পটভূমিতেই উঠে এলো এমন চাঞ্চল্যকর চুক্তির কথা।

অন্যদিকে লেবানন সংকট এবং প্রতিবেশী দেশে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রসঙ্গেও মুখ খুলেছেন প্রেসিডেন্ট শারা। গুঞ্জন উঠছিল সিরিয়া হয়তো প্রতিবেশী দেশটিতে ফের সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারে। তবে সব জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে তিনি নিশ্চিত করেন, লেবাননে কোনো ধরনের সামরিক অভিযান চালানের ইচ্ছা সিরিয়ার নেই। তার সরকার মূলত বৈরুতকে বর্তমান তীব্র সংকট থেকে বের করে আনতে এবং নিরাপদ রাখতে লিবানিজ কর্তৃপক্ষকে কীভাবে সহায়তা করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করছে।

উল্লেখ্য, বর্তমানে দক্ষিণ লেবানন ইসরায়েলি বাহিনীর দখলে রয়েছে এবং সেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সাথে ইসরায়েলি বাহিনীর মাসের পর মাস লড়াই চলছে। লেবানন সরকার চাচ্ছে নিজেদের দখলকৃত ভূখণ্ড উদ্ধার করতে এবং দেশের মধ্যকার সকল অস্ত্রের ওপর কেবল রাষ্ট্রের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে। শারা দামেস্কের অবস্থান পরিষ্কার করে জানান, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করা এবং যুদ্ধ বা শান্তির সিদ্ধান্ত কেবল লেবানন রাষ্ট্রের হাতেই সীমাবদ্ধ রাখার বিষয়ে সিরিয়ার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। কেবল নিরাপত্তা জোরদার করে লেবানন সংকটের সমাধান হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর জন্য সমন্বিত সামাজিক ও রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন। লেবাননে কোনো অরাজকতা দেখা দিলে তার সরাসরি ও তাৎক্ষণিক প্রভাব সিরিয়ার ওপর পড়বে। এমনকি এ অঞ্চলে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধের ব্যাপ্তি ঘটলে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে সতর্ক করেন তিনি।

সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ সংকট ও অর্থনীতি নিয়েও কথা বলেছেন নতুন এই সিরীয় প্রেসিডেন্ট। তিনি যুক্তি দেন, কেবল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুললেই সিরিয়ার অর্থনীতি সচল হবে না; যতক্ষণ না তার দেশকে আন্তর্জাতিক ‘সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক’ রাষ্ট্রের তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে।

একই সাথে তিনি কুর্দি নেতৃত্বাধীন ‘সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস’ (এসডিএফ)-এর সাথে অভ্যন্তরীণ চুক্তির বিলম্বের বিষয়টি স্বীকার করে নেন। উত্তর ও পূর্ব সিরিয়ার একাংশ নিয়ন্ত্রণকারী এই সশস্ত্র জোটের সাথে চুক্তি বাস্তবায়নে কিছু দেরি হলেও সরকার এতে পুরোপুরি অঙ্গীকারবদ্ধ এবং এই চুক্তির সফলতার বিষয়ে শতভাগ আশাবাদী বলে জানান তিনি।

এ ছাড়া ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের গৃহযুদ্ধে নিখোঁজ হওয়া হাজার হাজার মানুষের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে শারা সরকার। তাদের সন্ধানে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, যুদ্ধ চলাকালে প্রায় ১ লাখ মানুষ গুম হয়েছেন, যদিও সিরিয়ার নিখোঁজ সংক্রান্ত জাতীয় কমিশনের ধারণা এই সংখ্যা প্রায় ৩ লাখের কাছাকাছি। প্রেসিডেন্ট শারা নিশ্চিত করেছেন, গঠিত এই বিশেষ কমিটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে কাজ করবে এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা নিয়ে নিখোঁজদের স্বজনদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেবে।

সূত্র: আলজাজিরা