পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে নির্বাচনের আগে কেন এত প্রাণহানি?

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৮ এএম

পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে আইনসভা নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৩৪ জন বিক্ষোভকারী এবং ছয়জন পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য। সবচেয়ে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে রাওয়ালাকোট এলাকায়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, বিক্ষোভ, সরকারি দমন অভিযান এবং রাজনৈতিক অস্থিরতায় পুরো অঞ্চলজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

নিহতদের একজন ৩০ বছর বয়সী নাকাশ জারদাদ। তিনি শিক্ষা বিভাগের কর্মী ছিলেন। ঘটনার দিন তিনি রাওয়ালাকোটে নিজের মহিষের খামারে ছিলেন। ওই সময় কাছাকাছি এলাকায় পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।

সংঘর্ষের কারণে খামারের আশপাশের সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি বাড়ি ফিরতে পারেননি। একপর্যায়ে গুলিবর্ষণ শুরু হলে একটি ছুটে আসা গুলি তার শরীরে লাগে। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। বিবিসিকে এ তথ্য জানিয়েছেন তার চাচা আলতাফ হোসেন।

সমালোচকদের অভিযোগ, দীর্ঘ পদযাত্রা ও বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনী অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে। এসব কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল বিভিন্ন কর্মী সংগঠনের জোট জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি)।

১২টি সংরক্ষিত আসন নিয়ে বিরোধ

জেএএসি স্থানীয় আইনসভায় ১২টি সংরক্ষিত আসনের বিরোধিতা করছে। এসব আসন কয়েক দশক আগে ভারত–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানে চলে আসা শরণার্থীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকার জেএএসিকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে। তবে জেএএসি জানিয়েছে, তারা নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী নয়। ৫৩ সদস্যের আইনসভায় ১২টি সংরক্ষিত আসন দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়। এর বাইরে ৩৩টি আসনে সরাসরি ভোট হয় এবং আটটি আসন নারী ও অন্যান্য শ্রেণির জন্য সংরক্ষিত।

১৯৭০-এর দশকে করা আইনের মাধ্যমে এসব আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানে আশ্রয় নেওয়া মানুষদেরও অঞ্চলটির শাসনব্যবস্থায় মতামত দেওয়ার সুযোগ রাখা। তারা একসময় কাশ্মীর বিরোধের সমাধান হলে নিজ এলাকায় ফিরে যেতে পারবেন- এই প্রত্যাশায় পাকিস্তানে বসবাস শুরু করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে যাদের জন্য আসনগুলো সংরক্ষিত, তাদের অনেকেই পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে বসবাস করেন না। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা এসব আসনে নির্বাচন করার সুযোগ পান না।

জেএএসির দাবি, সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধিত্বকে দুর্বল করছে। তাই আইনসভার সব আসন ওই অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দাদের জন্য উন্মুক্ত করা উচিত।

অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ বলছে, সংরক্ষিত আসন প্রয়োজনীয়। সরকার জানিয়েছে, তিন ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং প্রথম ধাপ শুরু হবে ২৭ জুলাই।

অনিশ্চয়তায় নির্বাচনের ফল

২০২১ সালের আইনসভা নির্বাচনে ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। তবে ২০২২ সালে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গত চার বছরে এ অঞ্চলে চারজন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। এবার নির্বাচনের ফল কী হবে, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই।

আতঙ্কে প্রার্থী ও ভোটার

নির্বাচনের আগে রাজধানী মুজাফফরাবাদ ঘুরে বিবিসি দেখেছে, পুরো শহরে ভয় ও উত্তেজনার পরিবেশ বিরাজ করছে। অনেকেই নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে চাননি। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, নির্বাচন বা কোনো প্রার্থীর পক্ষে কথা বললে জেএএসি তাদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ বা ‘সহযোগী’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। আবার জেএএসির সমর্থকদের ভয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার হয়রানির মুখে পড়তে হতে পারে। এদিকে সহিংসতার ঘটনাও বেড়েছে। প্রার্থীদের গাড়ি ও অন্যান্য সম্পত্তিতে আগুন দেওয়া হয়েছে। কয়েকজন প্রার্থী হামলারও শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনার জন্য জেএএসিকে দায়ী করা হচ্ছে। এ কারণে প্রার্থীরা সীমিত পরিসরে প্রচার চালাচ্ছেন। রাজনৈতিক সভা এখন অনেকটাই ব্যক্তিগত ড্রইংরুম বা সড়কের ছোট ছোট কোণায় সীমাবদ্ধ। অনেকেই বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে চাইছেন না।

ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) একমাত্র নারী প্রার্থী নুরিন আরিফ বলেন, জেএএসির কর্মসূচির কারণে তিনি প্রকাশ্য সমাবেশের বদলে মানুষের বাড়িতে গিয়ে বৈঠক করছেন।

বিরোধী পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেতা সরদার মুখতার খান বলেন, তরুণদের মধ্যে জেএএসির আন্দোলনের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। তাই তাকেও সীমিত প্রচারণা চালাতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, একজন নির্বাচনী প্রার্থীকে তার এলাকার মানুষের মনোভাব বুঝেই চলতে হয়।

প্রচার অভিযানের শেষ সপ্তাহে গিয়ে পিপিপি ও পিএমএল-এনের শীর্ষ নেতারা সমাবেশ করেন। আগের নির্বাচনের তুলনায় এবার প্রচারণা ছিল অনেকটাই নিস্তেজ।

নির্বাচনই একমাত্র সমাধান

পাকিস্তানের কাশ্মীরবিষয়ক মন্ত্রী আমির মুকাম মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতেও নির্বাচন আয়োজনই একমাত্র সমাধান। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘মানুষ যাকে ভোট দেবে, সে-ই ক্ষমতায় এসে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। এই ক্ষমতা কয়েকশ বা কয়েক হাজার মানুষের হাতে থাকা উচিত নয়। কাশ্মীরে বসবাসকারী লাখো মানুষের হাতেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত।’

তবে সবাই এ মতের সঙ্গে একমত নন। মুজাফফরাবাদ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক প্রধান জাহিদ আমিনের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন হলেও ‘এর কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে না।’

আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ

এ অঞ্চলের সহিংসতা আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ১৭ জুলাই জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য- উভয় পক্ষের নিহতদের ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহ্বান জানান।

তিনি সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জেএএসিকে নিষিদ্ধ করারও সমালোচনা করেন। তার ভাষায়, ‘একটি নাগরিক সংগঠনকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা এবং সমাবেশের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ মতপ্রকাশ, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠন করার অধিকারের লঙ্ঘন নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে।’

ভারত এ সহিংসতার জন্য ‘দশকের পর দশক ধরে চলা পদ্ধতিগত শোষণ এবং মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার’ ঘটনাকে দায়ী করেছে।

পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রতিবেশী দুই দেশই পুরো কাশ্মীরের ওপর দাবি জানায়, যদিও উভয়েই অঞ্চলটির ভিন্ন ভিন্ন অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদে মদদ দেওয়ার অভিযোগ করে আসছে। ইসলামাবাদ সেই অভিযোগ অস্বীকার করে।

পিপিপির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো ভারতের বক্তব্যকে গুরুত্ব না দিয়ে বলেন, তিনি পরিস্থিতির ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সমাধান’ দেখতে চান। তিনি একটি সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন গঠনের আহ্বান জানান এবং বলেন, জেএএসি ও সরকার- উভয় পক্ষই দায়ী। সাধারণ মানুষকে শাস্তি দেওয়া বন্ধ করারও আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট সেবা এখনো বন্ধ। টানা ৪০ দিন হয়ে গেছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে সাময়িক বিধিনিষেধ প্রয়োজন হতে পারে, তা আমি বুঝি। কিন্তু পুরো অঞ্চলে ৪০ দিন ইন্টারনেট বন্ধ রাখা সম্মিলিত শাস্তি দেওয়ার ধারণা তৈরি করে।’

সূত্র: বিবিসি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত