পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবার এক অত্যন্ত বিপজ্জনক ও আশঙ্কাজনক মোড় নিয়েছে। আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে এতদিন যে লড়াই আলাদা আলাদা সামরিক জোট ও গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন এক অভূতপূর্ব রূপ ধারণ করেছে। মালি সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে ধরা জাতীয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়দার একটি আঞ্চলিক শাখা এবার হাত মিলিয়েছে। ভিন্ন আদর্শ ও সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী রাজনৈতিক লক্ষ্য থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধক্ষেত্রে এই দুটি শক্তিশালী গোষ্ঠীর সামরিক সমঝোতা আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলের নিরাপত্তা ও সামরিক শক্তিসমীকরণ এক ধাক্কায় বদলে দিয়েছে। এই নতুন পরিস্থিতিতে মালির সামরিক সংঘাত কেবল দীর্ঘায়িতই হচ্ছে না, বরং এই গৃহযুদ্ধ আদৌ কখনো আলোচনার মাধ্যমে শেষ করা সম্ভব হবে কি না- তা নিয়ে গভীর আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চলিত বছরের ২৫ এপ্রিল উত্তর মালির রণক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের দৃশ্যপট স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেদিন বিচ্ছিন্নতাবাদী দল আযাওয়াদ লিবারেশন ফ্রন্ট (এফএলএ) এবং আল-কায়দার অনুসারী সশস্ত্র সংগঠন জামাত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল-মুসলিমিন (জেএনআইএম) যৌথভাবে মালি সরকারি বাহিনীর ওপর একযোগে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। পূর্বে মালি সরকারের সৈন্যদের সাথে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর পৃথক পৃথক সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেলেও, ২৫ এপ্রিলের পর থেকে এই যুদ্ধ সম্পূর্ণ নতুন ও সমন্বিত রূপ ধারণ করে। কিডাল এবং আনেফিস থেকে শুরু করে তিলেমসি, গাও এবং সেবারে পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল ভৌগোলিক এলাকায় দুই বিদ্রোহী গোষ্ঠী অত্যন্ত সুসংগঠিত হামলা চালায়। এটি মালিয়ান সেনাবাহিনীর জন্য তো বটেই, এমনকি মালি সরকারের সুরক্ষায় নিয়োজিত রাশিয়ার সামরিক বাহিনী ‘আফ্রিকা কর্পস’-এর জন্যও বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও মারাত্মক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। উল্লেখ্য, এই আফ্রিকা কর্পস হলো ক্রেমলিন সমর্থিত সামরিক বলয়, যা মালিতে ক্রেমলিনের বিতর্কিত বেসরকারি সামরিক গোষ্ঠী ওয়াগনার গ্রুপের স্থলাভিছিক্ত হয়ে কাজ করছে।
এপ্রিল মাসের সেই যৌথ অভিযানের পর থেকে উত্তর মালির যুদ্ধক্ষেত্রে নিত্যদিনের চিত্র বদলে গেছে। পুরো অঞ্চলজুড়ে এখন প্রতিদিনের নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে বহুমুখী ও একই সাথে পরিচালিত হামলা, অতর্কিত অ্যামবুশ, অত্যাধুনিক ড্রোন হামলা এবং সরকারি সামরিক কনভয় বা বহরের ওপর প্রাণঘাতী আক্রমণ। যুদ্ধের ময়দানে উভয় পক্ষই প্রতিদিন বিশাল সামরিক জয়ের এবং প্রতিপক্ষকে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির মুখে ফেলার দাবি করে আসছে।
মালির রাজধানী বামাকোর সামরিক সরকার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, উত্তরাঞ্চলে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও কর্তৃত্ব পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে তারা বদ্ধপরিকর এবং এফএলএ ও জেএনআইএম-এর এই সমন্বিত ‘সন্ত্রাসী জোটকে’ তারা যেকোনো মূল্যে সম্পূর্ণভাবে গুঁড়িয়ে দিতে কাজ করছে।
অন্যদিকে, সংঘাতের মূল দুই বিদ্রোহী পক্ষের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হলেও তা পরস্পরবিরোধী। বিচ্ছিন্নতাবাদী জোট এফএলএ জানিয়েছে, তারা উত্তর মালির অঞ্চলটিকে ‘আযাওয়াদ’ নামে অভিহিত করে এবং এই আযাওয়াদের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই সশস্ত্র আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। অপরদিকে আল-কায়দা সমর্থিত জেএনআইএম এই যুদ্ধকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছে। তারা এই সংঘাতকে মালিকে ‘মুক্ত করার’ এবং রাশিয়ার সামরিক সহায়তার ওপর ভর করে চলা বর্তমান সামরিক জান্তা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার একটি ধর্মীয় অভিযান হিসেবে প্রচার করছে।
তবে যুদ্ধে কার কতটুকু ভূমি নিয়ন্ত্রণ বাড়ল বা কমল, তার চেয়েও বিশ্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বেশি উদ্বিগ্ন করছে এই সামরিক সহযোগিতা। একটি সিকুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতাবাদী দল এবং একটি উগ্রপন্থি আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সহযোগী শাখার মধ্যকার এই ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সমঝোতা একেবারেই নজিরবিহীন। উভয় দলের চূড়ান্ত রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও দর্শন সম্পূর্ণ ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও, সেনামঞ্চে তাদের এই ক্ষণিকের ঐক্য যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে, যা পুরো সাহেল এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই ঐতিহাসিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক ঐক্যের পটভূমি রচিত হয়েছিল ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক ‘আলজিয়ার্স শান্তি চুক্তি’ ভেঙে পড়ার মধ্য দিয়ে। বামাকোর মূল সরকার এবং উত্তর মালির সশস্ত্র বিদ্রোহীদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নিরসনে একটি রাজনৈতিক সমাধান হিসেবে ওই চুক্তি করা হয়েছিল। চুক্তির মূল শর্ত ছিল উত্তরাঞ্চলকে অধিকতর প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দেওয়া এবং কেন্দ্রীয় সরকারে তাদের উপযুক্ত রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে সরকারের সদিচ্ছার অভাব এবং সঠিক বাস্তবায়নের অভাবে সেই শান্তি প্রক্রিয়া বারবার হোঁচট খায় এবং একপর্যায়ে তা ভেস্তে যায়।
এরই মধ্যে ২০২০ সালের পর থেকে মালিতে একাধিক সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে, যা দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব, শাসনব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তানীতি পুরোপুরি বদলে দেয়। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করায় পশ্চিম আফ্রিকান দেশগুলোর অর্থনৈতিক জোট ‘ইকোওয়াস’ মালিকে জোট থেকে স্থগিত করে এবং তাদের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পশ্চিমা বিশ্বের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে মালির নতুন সামরিক জান্তা ক্রেমলিনের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং ২০২১ সালের শেষভাগে রাশিয়ার বেসরকারি সামরিক সংস্থা ওয়াগনার গ্রুপকে দেশের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়ে আসে। পরবর্তীতে রাশিয়া ওয়াগনারের পুরো কার্যক্রম নিজেদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ‘আফ্রিকা কর্পস’ নাম দিয়ে মালিতে কার্যক্রম চালাতে থাকে। কিন্তু এত শক্তি প্রয়োগের পরও উত্তর মালির পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি এবং নতুন করে রক্তক্ষয়ী লড়াই শুরু হলে সরকার বা বিদ্রোহী- কোনো পক্ষই স্থায়ী সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়।
কাগজে-কলমে বা নীতিগত দিক থেকে দেখলে এফএলএ এবং জেএনআইএম-এর মধ্যে কোনো ধরণের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠা অসম্ভব বলেই মনে হওয়ার কথা। এফএলএ-এর জন্ম মূলত ২০১২ সালের উত্তর মালির সেই ঐতিহাসিক বিদ্রোহীদের মাধ্যমে, যারা তৎকালীন সময়ে এককভাবে ‘আযাওয়াদ’ অঞ্চলের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। যদিও মালিয়ান রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কেউ কখনোই সেই স্বাধীন আযাওয়াদকে স্বীকৃতি দেয়নি। তারা শুরু থেকেই নিজেদের একটি ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন হিসেবে দাবি করে আসছে। অন্যদিকে জেএনআইএম-এর লক্ষ্য একদমই ভিন্ন। তারা মালি সরকারকে অবৈধ ও পুতুল সরকার মনে করে এবং বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থাকে উৎখাত করে তাদের নিজস্ব গোঁড়া ধর্মীয় আইনের শাসন কায়েম করতে চায়।
এমন চরম মতাদর্শগত বৈপরীত্য থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সাথে আলাপকালে উভয় সংগঠনের শীর্ষ কমান্ডাররা স্বীকার করেছেন যে, মাঠপর্যায়ের যুদ্ধের বাস্তবতায় তারা তাদের আদর্শিক পার্থক্য দূরে সরিয়ে রেখেছেন। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য- কমন এনিমি বা একই সাধারণ শত্রুকে পরাস্ত করা।
এফএলএ-এর জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা কর্নেল মোহাম্মদ ইসা জানান, স্বাধীন আযাওয়াদ রাষ্ট্র গঠনই তাদের একমাত্র মূল লক্ষ্য। অতীতের সমস্ত শান্তি চুক্তি ও আলোচনা ভেস্তে গেছে কারণ বামাকোর একের পর এক পরিবর্তন হওয়া সরকারগুলো আযাওয়াদবাসীদের সাথে প্রতারণা করেছে এবং প্রতিশ্রুতি রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি আরও সাফ জানিয়ে দেন, যেকোনো কূটনৈতিক আলোচনা তখনই সম্ভব হবে যখন মালি সরকার আযাওয়াদের বিচ্ছিন্ন হওয়ার বা পৃথক হওয়ার অধিকার মেনে নেবে। তবে আল-কায়দার সহযোগী সংগঠনের সাথে কোনো রাজনৈতিক বা আদর্শগত জোটের অস্তিত্বের কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন এই সেনা কর্মকর্তা। তিনি একে ‘যুদ্ধক্ষেত্রের সাময়িক সমঝোতা’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
কর্নেল ইসার দাবি, তাদের সাথে বর্তমানে জেএনআইএম-এর যেসব যোদ্ধা কাজ করছে, তারা বাইরের কোনো আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের সদস্য নয়; বরং তারা উত্তর মালিরই স্থানীয় ‘আযাওয়াদি’ সন্তান। মালিয়ান সেনাবাহিনী এবং রাশিয়ান ‘ভাড়াটে সৈন্যদের’ অন্যায় আগ্রাসন থেকে নিজেদের ঘরবাড়ি ও সমাজকে রক্ষা করতেই তারা এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছে।
অপরদিকে জেএনআইএম-এর জ্যেষ্ঠ ফিল্ড কমান্ডার সুলেমান, যিনি নিরাপত্তার স্বার্থে শুধু তার প্রথম নাম প্রকাশ করেছেন, তিনি পুরো বিষয়টি আরেকটু ভিন্ন ও ব্যাপকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি জানান, তাদের উচ্চপর্যায়ের অভ্যন্তরীণ আলোচনা ও পরামর্শের পরেই এফএলএ-এর সাথে যৌথ সামরিক অভিযানের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সুলেমানের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রের দুই পাশের যোদ্ধারাই মূলত ‘একই ভূমির ও একই উপজাতির সন্তান’, যারা একই ধরণের যুদ্ধের শিকার হয়েছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের মুক্তির লক্ষ্য ‘প্রায় একবিন্দুতে’ এসে মিলেছে।
কমান্ডার সুলেমান একটি চাঞ্চল্যকর দাবি করে আরও বলেন, এফএলএ তাদের আঞ্চলিক বিবাদ ও আইনি বিষ্যের ক্ষেত্রে স্থানীয় ধর্মীয় আলেমদের মধ্যস্থতা ও সিদ্ধান্ত মেনে নিতে সম্মত হয়েছে, যা জেএনআইএম-এর মূল রাজনৈতিক ও আদর্শিক এজেন্ডাগুলোর একটি। যদিও এফএলএ-এর পক্ষ থেকে এই দাবি সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
এদিকে মালির রাজধানী বামাকোর সামরিক জান্তা সরকার এই আখ্যানকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছে। তারা এফএলএ ও জেএনআইএম-এর এই যৌথ অবস্থানকে একটি ‘সন্ত্রাসী জোট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং বলছে এটি মালির ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের জন্য সরাসরি হুমকি। দুই সশস্ত্র গোষ্ঠীর এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে, এই অদ্ভুত ঐক্য কতটা যেমন শক্তিশালী, ঠিক তেমনই ততটাই ভঙ্গুর। আপাতত যুদ্ধক্ষেত্রের তাত্ক্ষণিক সুবিধা ও সাধারণ শত্রু পতন করার তাগিদ তাদের মতাদর্শগত দূরত্বকে ঢেকে রেখেছে। কিন্তু সংঘাতের গতিপথ যত সামনের দিকে এগোবে, তত এই ক্ষণস্থায়ী সামরিক সমঝোতা টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে বিশাল সংশয় রয়েছে।
দুই বিদ্রোহীদের এই অভাবনীয় অংশীদারিত্ব কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের ভৌগোলিক সীমানাই বদলায়নি, বরং পুরো সংঘাতের কৌশলগত ধরণও পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এফএলএ-এর কমান্ডাররা জানিয়েছেন, জেএনআইএম-এর সাথে যৌথভাবে কাজ করার ফলে তারা নিজেদের সামরিক অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বিনিময় করতে পারছেন। হামলা চালানোর ক্ষেত্রে তারা যৌথ দায়িত্ব ভাগ করে নিচ্ছেন; একটি দল যখন সরকারি সেনাবাহিনীর ঘাঁটিতে সরাসরি আক্রমণ চালাচ্ছে, অন্য দল তখন সেনা রসদ ও সরঞ্জাম সরবরাহকারী কনভয়ে অতর্কিত হামলা চালাচ্ছে।
যদিও মালি সরকার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর দাবি করা ক্ষয়ক্ষতির বিশাল পরিসংখ্যানকে অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দিয়েছে এবং দাবি করছে যে যুদ্ধের মূল নিয়ন্ত্রণ এখনো সেনাবাহিনী এবং রাশিয়ান আফ্রিকা কর্পসের হাতেই রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, যুদ্ধের আধুনিকতা ও ভয়াবহতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে মাইলের পর মাইল দূরের একাধিক স্থানে একই সময়ে সমন্বিত হামলা চালানো হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুখোমুখি লড়াই টানা কয়েক দিন ধরে চলছে এবং মূল যুদ্ধক্ষেত্রে সরকারি বাহিনীর শক্তিবৃদ্ধিকারী অতিরিক্ত সেনা পৌঁছানোর আগেই রাস্তার মাঝে অতর্কিত হামলা চালিয়ে সেগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে।
এই নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন বা চালকবিহীন নজরদারি ও আক্রমণকারী আকাশযানের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ড্রোনের ভূমিকা এখন আর শুধু শত্রুর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ড্রোন ব্যবহার করে সরাসরি সেনাসদস্যদের গাড়ি, সাঁজোয়া যান এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক আউটপোস্টগুলোতে নিখুঁত বোমা হামলা চালানো হচ্ছে। বিপরীতে, রাশিয়া সমর্থিত মালিয়ান সেনাবাহিনী বিদ্রোহীদের কৌশল মোকাবিলা করতে এখনও তাদের আকাশপথের বিমান শক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে যাচ্ছে। কিন্তু টানা কয়েক মাসের ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পরও কোনো পক্ষই যুদ্ধক্ষেত্রে চূড়ান্ত বা নির্ণায়ক কোনো সুবিধা আদায় করতে পারেনি, যার ফলে এক ধরণের রণকৌশলগত অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য যে পরিমাণ বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়, তার জোগান আসছে অঞ্চলটির বহু বছরের পুরোনো ও শক্তিশালী অবৈধ অর্থনীতির নেটওয়ার্ক থেকে। জেএনআইএম-এর অর্থায়নের উৎস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের অর্থনৈতিক কাঠামো অত্যন্ত সুসংগঠিত। তারা আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক, উপজাতীয় এলাকা থেকে আদায় করা ধর্মীয় জাকাত এবং আল-কায়দার বহু বছরের পুরোনো ‘অপহরণ ও মুক্তিপণ’ ব্যবসার জমানো বিশাল অর্থ তহবিল ব্যবহার করছে। অপরদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী এফএলএ মূলত উত্তর মালির প্রবাসী ব্যবসায়ী, স্থানীয় উপজাতীয় নেতা এবং আযাওয়াদি সামাজিক সংগঠনগুলোর কাছ থেকে পাওয়া অনুদানের ওপর ভিত্তি করে নিজেদের যুদ্ধ পরিচালনা করছে।
অর্থায়নের পাশাপাশি উভয় দলের শীর্ষ কর্মকর্তারা গোপনে স্বীকার করেছেন যে, তাদের আন্দোলনের সাথে যুক্ত অনেক ব্যক্তি সাহারা মরুভূমির প্রাচীন আন্তর্জাতিক চোরাচালান ও পাচারকারী চক্রের সাথে সরাসরি জড়িত। সাহারা অঞ্চল জুড়ে অবৈধ পণ্য ও মাদকের ব্যবসা থেকে সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ যে এই যুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা নিশ্চিত। তবে সেই অবৈধ অর্থের পরিমাণ কতখানি, তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা কঠিন।
অর্থের মতোই রণক্ষেত্রে অস্ত্রের সরবরাহ টিকিয়ে রাখা বিদ্রোহীদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। ২০১১ সালে প্রতিবেশী দেশ লিবিয়ায় গাদ্দাফি সরকারের পতনের পর থেকে পুরো সাহেল অঞ্চলজুড়ে অস্ত্রের একটি বিশাল অবৈধ বাজার ও অবাধ প্রবাহ তৈরি হয়, যা বিদ্রোহী দলগুলোকে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রেখেছে। তবে সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের লড়াইয়ে তাদের অস্ত্রের জোগানের এক নতুন উৎস উন্মোচিত হয়েছে। মালিয়ান সেনাবাহিনী এবং রাশিয়ার আফ্রিকা কর্পসের সাথে যুদ্ধ করার সময় বিদ্রোহী জোট যেসব আধুনিক সামরিক যান, ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ ছিনিয়ে নিচ্ছে, সেগুলোই এখন তাদের অস্ত্রাগারের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
সব তথ্য বিশ্লেষণ করে সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একমত যে, উত্তর মালির এই সংঘাত অদূর ভবিষ্যতে শেষ হওয়ার কোনো ইতিবাচক আলামত দেখা যাচ্ছে না। রাশিয়ার আফ্রিকা কর্পসের আধুনিক বিমান হামলা ও শক্তিশালী বিমান বাহিনীর কারণে মালি সেনাবাহিনীর বিমান শক্তিতে একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। কিন্তু সেই বিমান শক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এফএলএ এবং জেএনআইএম উত্তর মালির বিশাল অঞ্চলজুড়ে ধারাবাহিকভাবে তাদের সমন্বিত গেরিলা হামলা চালিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে।
যুদ্ধের এই কৌশলগত অচলাবস্থা আসলে দেশটির গভীর ও জটিল রাজনৈতিক অচলাবস্থারই একটি প্রতিচ্ছবি। রাজধানী বামাকোর জান্তা সরকার কোনো অবস্থাতেই মালির ভৌগোলিক অখণ্ডতা ক্ষুণ্ণ হতে দেবে না এবং কোনো ভূখণ্ড ছাড় দিতে নারাজ। অন্যদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী এফএলএ পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে ‘স্বাধীন আযাওয়াদ’ গঠন ছাড়া তারা অস্ত্র ফেলবে না। আর আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন জেএনআইএম দেশের বিদ্যমান পুরো শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করে তাদের নিজস্ব নিয়ম কায়েম করতে চায়। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই তিনটি মূল পক্ষের কেউই নিজেদের মূল দাবি থেকে একচুলও সরে আসেনি এবং সামরিক ময়দানেও এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি যা তাদের নতি স্বীকার করতে বাধ্য করতে পারে।
তিনটি পক্ষের এই সম্পূর্ণ ভিন্ন ও সংঘাতময় রাজনৈতিক অভিলক্ষ্যই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে- যে দুই বিদ্রোহী গোষ্ঠী আজ সাধারণ শত্রুর ভয়ে এক হয়েছে, তারা কতদিন একসাথে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে? এফএলএ এবং জেএনআইএম-এর এই অভূতপূর্ব অংশীদারিত্ব কোনো যৌথ রাজনৈতিক দর্শন বা সুন্দর ভবিষ্যতের ভাবনার ওপর দাঁড়িয়ে নেই; এর একমাত্র ভিত্তি হলো মালি সেনাবাহিনী ও রাশিয়ান বাহিনীর প্রতি যৌথ ঘৃণা ও শত্রুতা। ফলে যেকোনো সময় এই সম্পর্কের ফাটল ধরা এবং নিজেদের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়াটা কেবল সময়ের ব্যাপার।
২০২৬ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া এই ব্যাপক সামরিক অভিযানের পর সময় গড়িয়ে গেলেও উত্তর মালি এখনো এক অন্ধকার ও অনিশ্চিত গহ্বরে আটকে রয়েছে, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো সহজ পথ বা কৌশল দেখা যাচ্ছে না। এফএলএ এবং জেএনআইএম-এর এই জোড়া হামলা সাহেল অঞ্চলের সামরিক সমীকরণকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। অথচ বামাকোর সরকার এখনো এমন যেকোনো শান্তি প্রস্তাব বা সমঝোতা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করছে যা তাদের দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে বিন্দুমাত্র দুর্বল করতে পারে।
যা একসময় সেন্ট্রাল রাষ্ট্রীয় সরকার এবং ক্ষুব্ধ উত্তর অঞ্চলের প্রান্তিক বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যকার সাধারণ বিদ্রোহ হিসেবে শুরু হয়েছিল, তা আজ এক জটিল আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের রূপ নিয়েছে। এই সংঘাত এখন একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবধারা দ্বারা চালিত হচ্ছে- একদিকে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষার লড়াই, অন্যদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী জাতীয়তাবাদ, সাথে আল-কায়দা সমর্থিত গোঁড়া ধর্মীয় শাসন কায়েমের চেষ্টা এবং এই পুরো প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক পরাশক্তি রাশিয়ার প্রত্যক্ষ সামরিক উপস্থিতি।
সামরিক উপায়ে এই যুদ্ধের সমাধান খোঁজার চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। মালি ও সমগ্র সাহেল অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে যুদ্ধের পাশাপাশি আযাওয়াদের স্বাধীনতা, দেশের অখণ্ডতা এবং শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন- এই তিনটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী রাজনৈতিক চাওয়াকে আলোচনার টেবিলে এনে একটি কূটনৈতিক সমাধান খুঁজতে হবে। তা না হলে কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি অধরাই থেকে যাবে। পরবর্তী সময়ে এই যুদ্ধের পরিণতি যা-ই হোক না কেন, চলতি বছরের এপ্রিলে গঠিত বিচ্ছিন্নতাবাদী ও আল-কায়দার এই ঐক্য উত্তর মালির সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসকে এক নতুন মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে, যার ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া মালির সীমানা ছাড়িয়ে সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশ ও বিশ্ব নিরাপত্তায় দীর্ঘদিন ধরে অনুভূত হবে।
সূত্র: আলজাজিরা