ভবদহে জলাবদ্ধতা

এই দুর্ভোগ নিয়তি হতে পারে না

যশোরের ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা আর মৌসুমি দুর্ভোগ নতুন নয়। সমস্যাটি কেবল প্রাকৃতিক নয়। এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অদূরদর্শিতার ফল। ভবদহ পাড়ের লক্ষাধিক মানুষের জলে ডুবে থাকার এই মর্মস্পর্শী চিত্র সাক্ষ্য দেয়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভুল নীতি আর অদূরদর্শিতার। ২৭ জুলাই দেশ রূপান্তরে এর যে চিত্র উঠে এসেছে তাতে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলগুলোর জবাবদিহি ও দায়বদ্ধহীনতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। বলা হয়েছে, টানা বর্ষণে যশোর-খুলনার ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা এবার আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে শতাধিক গ্রাম, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কয়েক হাজার মাছের ঘের ও পুকুর। প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ২০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। ভবদহের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে পানিসম্পদমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি।

ভবদহে সৃষ্টি হয়েছে চরম মানবিক সংকট। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদল ভবদহ পরিদর্শনের পর আমডাঙ্গা খাল সংস্কার, হরি নদীসহ সংশ্লিষ্ট নদ-নদী খনন এবং জনগণের মতামতের ভিত্তিতে টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) বাস্তবায়নের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবায়নে নেই কোনো অগ্রগতি! বিস্ময়কর হলেও সত্য, অভয়নগরের আমডাঙ্গা খাল সংস্কারের কার্যাদেশ দেওয়া হলেও প্রায় দুই বছর ধরে কাজই শুরু হয়নি! এ ব্যাপারে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর ভাষ্য, জলাবদ্ধতা নিরসনে খর্ণিয়া এলাকায় দুটো ভাসমান এস্কেভেটর নামানো হয়েছে। সহসাই ভালো ফল পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা করেন। ভবদহ পাড়ের মানুষ দায়িত্বশীলদের আশ্বাসে কতটা বিশ্বাস রাখতে পারেন, আমরা এ প্রশ্ন রাখি। তারা বছরের পর বছর যে সংকটে নিমজ্জিত তা টোটকা দাওয়াইয়ে যে সমাধান হওয়ার নয় এটি বুঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার পড়ে না। তারা ক্রমাগত যে আশ্বাসবাণী শুনছেন এমনটি পরিহাস ছাড়া আর কী হতে পারে?

টিআরএম পদ্ধতি চালু এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভুল নীতি সংশোধন ছাড়া এই জনদুর্ভোগ দূর করা সম্ভব নয়, এ বিষয়টি অবগত থাকার পরও কেন তা করা হচ্ছে না, এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় সংশ্লিষ্ট মহলগুলোর এড়ানোর কোনো অবকাশ নেই। ভবদহ অঞ্চলে অন্তত ৫২টি ছোট-বড় বিল রয়েছে। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে এসব বিলের পানি ওঠানামা করার কথা। কিন্তু বছরের পর বছর পলি জমে নদীগুলো নাব্য হারানোয় সেই পথ রুদ্ধ হয়ে আছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিতে বিলগুলো প্লাবিত হলেও পানি দ্রুত নামতে পারে না। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, গত বর্ষায় দেড় শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে দুই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি ছিলেন। বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধিত্ব নিয়ে উচ্চশিক্ষাধারী, প্রতিবন্ধী শিশুদের অধিকারের জন্য আজীবন লড়াকু, খ্যাতিমান লেখক ও রাজনৈতিক কর্মী হেলেন কেলার বলেছেন, ‘দুর্ভোগ-দুঃখ থাকবেই, কিন্তু সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া এবং তা জয় করার মধ্যেই মানুষের প্রকৃত সার্থকতা’।

প্রশ্ন হচ্ছে, ভবদহ পাড়ের দুঃখ-দুর্ভোগ নিরসনের দায়দায়িত্ব যাদের তাদের এই ব্যর্থতা আমরা কোন দৃষ্টিকোণ থেকে কোন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিশ্লেষণ করব? তর্কাতীতভাবেই বলা যায়, ভবদহের বিদ্যমান সংকট কেবল ওই অঞ্চলের বিবর্ণ চিত্রই নয়, তা পানি ব্যবস্থাপনা ও কৃষি পরিকল্পনার সমন্বয়হীনতার উৎকট প্রতিচ্ছবি। নদীর নাব্য রক্ষা, স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সøুইসগেটের কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং সময়মতো খননকাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে যে গাফিলতি দৃশ্যমান হয়ে আছে তা নিরসনের পাশাপাশি দায়িত্বশীলদের ব্যর্থতার প্রতিবিধানও জরুরি। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, এই মানবিক দুর্যোগের নিরসন করতে হবে সময়ক্ষেপণ না করে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকসহ সবার জন্য স্বল্পসুদে ঋণ, প্রণোদনা ও বিকল্প ফসলের সহায়তা বিবেচনা করাও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। ফিরে ফিরে ভবদহ পাড়ের মানুষের যে  দুর্দশা-চিত্র সামনে আসছে তা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়, সোজাসাপ্টা প্রশাসনিক ব্যর্থতা। ভবদহের সংকট নিয়ে আমরা আর আশ্বাস শুনতে চাই না, চাই টেকসই সমাধান। জরুরিভিত্তিতে সমন্বিত ও বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ নেওয়া হোক, যাতে ভবদহের দুঃখগাথার পরিসমাপ্তি ঘটে।