অধিকার, ন্যায্যতা ও সুরক্ষার প্রশ্ন

বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলকে নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত দুটি ছবি সামনে আসে। একটি প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের, অন্যটি দুর্যোগ ও দারিদ্র্যের। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে হাওরের ভবিষ্যৎকে শুধু সৌন্দর্য কিংবা দুর্ভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে দেখলে বাস্তবতার পূর্ণ চিত্রটি আর ধরা পড়ে না। কারণ হাওর এখন এমন এক ভূখণ্ড, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সবচেয়ে আগে দৃশ্যমান হয় এবং যার প্রভাব সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভব করেন প্রান্তিক মানুষজন। অনেকে মনে করেন, হাওর তো বরাবরই পানিনির্ভর অঞ্চল। সেখানে বন্যা, জলাবদ্ধতা কিংবা মৌসুমি বিচ্ছিন্নতা নতুন কিছু নয়। অতএব জলবায়ু পরিবর্তনকে অতিরঞ্জিত করে দেখার প্রয়োজন নেই। এই যুক্তির একটি ভিত্তি আছে। সত্যিই হাওরবাসী শত শত বছর ধরে পানির সঙ্গে সহাবস্থান করে এসেছে। কিন্তু আজকের বাস্তবতা অতীতের পুনরাবৃত্তি নয়। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দই বদলে যাচ্ছে। আগাম পাহাড়ি ঢল, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট, মাছের প্রজনন ব্যাহত হওয়া এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় একই সঙ্গে ঘটছে। ফলে হাওরের ঐতিহ্যগত অভিযোজন কৌশলও ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়ছে।

এই বাস্তবতাকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত মানবাধিকারের প্রশ্ন। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে যখন একটি শিশু বিদ্যালয়ে যেতে পারে না, একজন গর্ভবতী নারী সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না, একজন কৃষক এক রাতের পাহাড়ি ঢলে বছরের একমাত্র ফসল হারান কিংবা একজন জেলে মাছের প্রজনন ধ্বংস হওয়ায় জীবিকা হারান, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, কর্মসংস্থান এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রকে এমন একটি সমাজ গঠনের নির্দেশ দিয়েছে, যেখানে সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে। সংবিধানের ১৫, ১৮ ও ১৯ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষা এবং অঞ্চলগত বৈষম্য দূর করে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করার দায়িত্ব দিয়েছে। তাই ভৌগোলিক বাস্তবতায় পিছিয়ে থাকা হাওরাঞ্চলের জন্য জলবায়ু সহনশীল বিশেষ পরিকল্পনা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

আন্তর্জাতিক আইনও একই বার্তা দেয়। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা (ইউডিএইচআর), অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ (আইসিইএসসিআর) এবং শিশু অধিকার সনদ (সিআরসি) জীবন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপদ জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেছে। একইভাবে প্যারিস চুক্তি ও ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ কাঠামো স্বীকার করে যে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি ভোগ করছে সেই জনগোষ্ঠী, যারা এই সংকট সৃষ্টিতে সবচেয়ে কম দায়ী। বাংলাদেশের হাওরবাসী তারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ। তাদের কার্বন নিঃসরণ নগণ্য, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের মূল্য তারাই সবচেয়ে বেশি দিচ্ছেন। এখানেই জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনায় প্রায়ই অভিযোজনের কথা বলা হয়। কিন্তু অভিযোজনের পুরো দায় যদি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি ন্যায়বিচার নয়। একজন ক্ষুদ্র কৃষক বা জেলের পক্ষে একা জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, বিকল্প জীবিকা তৈরি কিংবা দুর্যোগ মোকাবিলার ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। এটি রাষ্ট্র, উন্নয়ন অংশীদার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যৌথ দায়িত্ব।

হাওরের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় আরেকটি বিষয় প্রায় অনুপস্থিত থাকে। সেটি হলো অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসন। যদি কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জীবিকা ক্রমাগত অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাধ্য হয়ে শহরমুখী হবেন। তখন শুধু হাওর নয়, দেশের নগর এলাকাও নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়বে। তাই হাওরে বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে নয়, ভবিষ্যতের বৃহত্তর সংকট প্রতিরোধের বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। এখানে উন্নয়নের প্রচলিত ধারণাতেও পরিবর্তন আনা জরুরি। বহু ক্ষেত্রে উন্নয়ন বলতে শুধু রাস্তা বা অবকাঠামো নির্মাণকে বোঝানো হয়। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হলো মানুষের সক্ষমতা। এমন শিক্ষাব্যবস্থা দরকার, যা বর্ষাকালেও বন্ধ হয়ে যাবে না। এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা দরকার, যা নৌপথে দ্রুত সেবা পৌঁছে দিতে পারে। এমন কৃষি ও মৎস্যনীতি দরকার, যা পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এমন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দরকার, যা দুর্যোগের পর নয়, দুর্যোগের আগেই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে সুরক্ষা দেয়।

হাওরের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র রক্ষাও মানবাধিকারের অংশ। কারণ জলাভূমি ধ্বংস হলে শুধু পাখি, মাছ বা উদ্ভিদ হারায় না; মানুষের খাদ্য, আয় ও নিরাপত্তাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই জলাভূমি ভরাট, দূষণ, অপরিকল্পিত পর্যটন কিংবা জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি মানুষের জীবন ও জীবিকার অধিকার রক্ষারও পূর্বশর্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতের হাওর কেমন হবে, তার উত্তর শুধু বিজ্ঞানীদের গবেষণায় সীমাবদ্ধ নয়; সেটি নির্ভর করবে আমাদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং মানবাধিকারের প্রতি অঙ্গীকারের ওপর। যদি আমরা হাওরকে শুধু দুর্যোগের মৌসুমি সংবাদ হিসেবে দেখি, তাহলে সংকট আরও গভীর হবে। কিন্তু যদি হাওরকে জলবায়ু ন্যায়বিচারের পরীক্ষাগার হিসেবে দেখি, তাহলে এখান থেকেই টেকসই উন্নয়নের নতুন মডেল গড়ে তোলা সম্ভব। এখন সময় এসেছে হাওর উন্নয়নের ধারণাকে নিয়ে নতুন করে ভাবার। প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পে হিউম্যান রাইটস ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট ও ক্লাইমেট রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট বাধ্যতামূলক করা, হাওরাঞ্চলের জন্য পৃথক জলবায়ু অভিযোজন তহবিল গঠন, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং নারী, শিশু, প্রবীণ ও ভিন্ন সক্ষমতার ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। কারণ হাওরকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি অঞ্চল নয়; দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য, সংস্কৃতি এবং হাওরাঞ্চলের মানুষের সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষিত রাখা, দেশের ভবিষ্যৎকে আরও নিরাপদ করা। তাই হাওরকে অধিকার ও জলবায়ু ন্যায়বিচারের দৃষ্টিতে দেখাই উন্নয়নের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও অধিকারকর্মী

shahedkayes@gmail.com