রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ ও শিক্ষার্থী মারধরের ঘটনায় নতুন মোড় এসেছে। মারধরের শিকার তিন শিক্ষার্থীর মধ্যে দুজনকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড-সংক্রান্ত একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। একই সময়ে প্রক্টর কার্যালয় ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ঘটে যাওয়া মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছে।
গ্রেপ্তার হওয়া দুই শিক্ষার্থী হলেন ইতিহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের মো. আনাস ও মাহমুদুল হাসান। মতিহার থানার পুলিশ সোমবার (২৭ জুলাই) রাতে তাঁদের গ্রেপ্তার করে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ গোলাম কবির জানান, আগে দায়ের হওয়া নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড-সংক্রান্ত একটি মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। বর্তমানে তারা চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সংস্কৃত বিভাগের এক ছাত্রীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে গত রবিবার রাতে প্রক্টরের কার্যালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অভিযোগে বলা হয়, একই বিভাগের এক শিক্ষার্থী প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ওই ছাত্রীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ক্যাম্পাস ছাড়ার হুমকি দেন। বৈঠকে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর পক্ষে উপস্থিত ছিলেন আনাস, হাসিব ও মাহমুদুল হাসান। আলোচনার একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে প্রক্টরের বাগ্বিতণ্ডা হয়।
পরদিন বিষয়টি নিয়ে আবার বৈঠক হলে সেখানে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মারসহ কয়েকজন আনাসকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী বলে দাবি করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর মোবাইল ফোনে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে তোলা ছবি দেখিয়ে তাঁকে মারধর করা হয়। পরে পরিস্থিতি শান্ত হলে সবাই প্রক্টর দপ্তর ত্যাগ করেন।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, কিছুক্ষণ পর রাকসু ভবনে গিয়ে আনাস, হাসিব, মাহমুদুলসহ কয়েকজন রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মার ও তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বি এম নাজমুস সাকিবের ওপর হামলা চালান। এতে নাজমুস সাকিব আহত হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এরপর আনাস, হাসিব ও মাহমুদুল কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষের সামনে অবস্থান নিলে সেখানে তাঁদের সঙ্গে রাকসু ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের বাগ্বিতণ্ডা এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তাঁরা পাঠকক্ষের ভেতরে আশ্রয় নেন। অভিযোগ রয়েছে, পরে সেখানে ঢুকে তাঁদের মারধর করা হয়। এ সময় হামলা ঠেকাতে গিয়ে কয়েকজন সাধারণ শিক্ষার্থীও আহত হন। আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও হামলার অভিযোগ ওঠে। পরে প্রক্টরিয়াল বডি, শিক্ষক, পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
ঘটনার পর রাকসু ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের বিচারের দাবি জানান। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পুরো ঘটনার তদন্তে একটি নিরপেক্ষ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।
এদিকে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনও পৃথক বিবৃতিতে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে। গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট প্রক্টর কার্যালয় ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে শিক্ষার্থীদের মারধরের ঘটনাকে 'মব সন্ত্রাস' আখ্যা দিয়ে সুষ্ঠু বিচার দাবি করে। একই সঙ্গে রাকসু ভবনে হামলার অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানানো হয়।
ছাত্র মঞ্চের পক্ষ থেকে বলা হয়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভেতরে প্রবেশ করে প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সংগঠনটির দাবি, রাকসু ভবনে হামলা এবং শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘটিত মারধরের দুটি ঘটনাই নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারসহ পুরো ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে মারধরের ঘটনায় জড়িতদের বিচারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের সামনে বিক্ষোভ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। সংগঠনটির সভাপতি সুলতান আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর ভাষ্য, যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়।