দেশ ছেড়ে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে নতুন জীবনের শুরু। চারপাশে অচেনা মানুষ, অজানা ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি। প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজও তখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
বাসে ওঠা, সন্তানের স্কুলে যাওয়া, হাসপাতালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, কিংবা সরকারি কাগজপত্র বুঝে ওঠা, সবকিছুই যেন নতুন করে শেখার বিষয়। ফ্রান্সে আসা অনেক বাংলাদেশি নারীর গল্পের শুরুটা এমনই। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই গল্পগুলো বদলাচ্ছে।
অনিশ্চয়তার জায়গা দখল করছে আত্মবিশ্বাস, নির্ভরতার জায়গা নিচ্ছে স্বনির্ভরতা। আর এই পরিবর্তনের পেছনে কাজ করছে নারীকেন্দ্রিক বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ, যেখানে ভাষা শিক্ষা থেকে শুরু করে মানসিক সুস্থতা এবং প্রশাসনিক সহায়তা পর্যন্ত নানা ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি প্যারিসের উপকণ্ঠের একটি সবুজ পার্কে এমনই এক মিলনমেলায় একত্রিত হয়েছিলেন শতাধিক বাংলাদেশি নারী ও তাঁদের পরিবার।
কেউ ঐতিহ্যবাহী শাড়িতে, কেউ সালোয়ার-কামিজে, আবার কেউ পশ্চিমা পোশাকে। শিশুদের হাসি, আড্ডা আর পারিবারিক পরিবেশে দিনটি যেন হয়ে উঠেছিল প্রবাসজীবনের বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। তবে এটি শুধু একটি পিকনিক ছিল না। এটি ছিল অভিজ্ঞতা বিনিময়ের একটি মঞ্চ। এখানে কেউ বলছিলেন নিজের ভাষা শেখার গল্প, কেউ চাকরি পাওয়ার অভিজ্ঞতা, আবার কেউ শেয়ার করছিলেন নতুন দেশে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম।
ফ্রান্সে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চাইলে ফরাসি ভাষা শেখা প্রায় অপরিহার্য। চাকরি, উচ্চশিক্ষা, সরকারি সেবা কিংবা নাগরিক জীবনের প্রতিটি ধাপেই ভাষার গুরুত্ব স্পষ্ট। তাই অনেক বাংলাদেশি নারী এখন ঘরের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি নিয়মিত ভাষা শেখার চেষ্টা করছেন।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুরুতে তাঁরা বাজার করা কিংবা চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতেও সংকোচ বোধ করতেন। কিন্তু ভাষা শেখার পর সেই ভয় অনেকটাই কেটে গেছে। এখন কেউ পেশাগত জীবনে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কেউ উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছেন, আবার কেউ নিজের দক্ষতাকে নতুনভাবে কাজে লাগাতে চান।
ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাও এখন বড় একটি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে নতুন দেশে এসে অনেকেই একাকীত্ব, উদ্বেগ কিংবা মানসিক চাপে ভোগেন। আগে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলার প্রবণতা কম থাকলেও এখন ধীরে ধীরে সচেতনতা বাড়ছে।
অনেক নারী প্রয়োজন হলে পরামর্শ নিচ্ছেন এবং একে অপরের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ফরাসি প্রশাসনিক ব্যবস্থা। স্বাস্থ্য বিমা, পারিবারিক ভাতা, কর, আবাসন কিংবা বিভিন্ন সরকারি আবেদন, সবকিছুই নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে করতে হয়। নতুন আসা অনেকের কাছেই বিষয়গুলো জটিল মনে হয়। ফলে অভিজ্ঞদের সহযোগিতা তাঁদের জন্য অনেকটাই স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই পরিবর্তনের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতি। যারা আগে নিজেরা সংগ্রাম করে পথ খুঁজে পেয়েছেন, তারাই এখন নতুনদের হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কেউ ভাষা শেখাচ্ছেন, কেউ চাকরির তথ্য দিচ্ছেন, আবার কেউ প্রশাসনিক বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। প্রবাসজীবনে এমন উদ্যোগ শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি পরিবার, সমাজ এবং নতুন প্রজন্মের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ভাষায় দক্ষ একজন মা সন্তানের শিক্ষাজীবনে আরও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারেন। কর্মজীবনে যুক্ত হলে তিনি অর্থনৈতিকভাবেও পরিবারকে শক্তিশালী করেন। একই সঙ্গে সমাজে তাঁর অংশগ্রহণও বাড়ে। বিশ্বায়নের এই সময়ে অভিবাসনের গল্প আর শুধু সীমান্ত পেরোনোর গল্প নয়। এটি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার গল্পও। ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি নারীদের অনেকেই সেই নতুন পরিচয়ের পথে হাঁটছেন। তাঁদের যাত্রা এখনও চলমান।
কিন্তু প্রতিটি শেখা শব্দ, প্রতিটি অর্জিত সনদ, প্রতিটি নতুন দক্ষতা যেন সেই পথচলারই এক একটি দৃঢ় পদক্ষেপ। হয়তো এ কারণেই প্রবাসের কোনো পার্কে কয়েক ঘণ্টার একটি মিলনমেলা শুধু আনন্দের আয়োজন হয়ে থাকে না। সেখানে জন্ম নেয় নতুন পরিচয়, নতুন সম্পর্ক এবং নতুন স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নই বলে দেয়, ভিনদেশেও আত্মবিশ্বাস, শিক্ষা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে নতুন জীবন গড়ে তোলা সম্ভব।