রাজধানীতে খুনের ছায়া

রাজধানী ঢাকায় অপরাধের চিত্র দিন দিন উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ছিনতাই, ডাকাতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড নগরবাসীর নিরাপত্তাবোধে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। প্রকাশ্যে গুলি, কুপিয়ে হত্যা, রাজনৈতিক আধিপত্যের সংঘর্ষ, ব্যক্তিগত শত্রুতা এবং পারিবারিক বিরোধ যেমন প্রকট হচ্ছে, ঠিক তেমনি বাড়ছে এর নৃশংসতাও। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, গ্রেপ্তার অভিযান চললেও তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে অপরাধীদের মধ্যে আইনের ভয় কমে গেছে। 

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। মোহাম্মদপুরে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে বাসায় ফেরার পথে পুলিশের এক উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ওসমান গনির ওপর প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে। মারাত্মক জখম ওই এসআইয়ের শরীরে ৪৩ সেলাই দেওয়া হয়েছে। তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) ঢাকার ইমিগ্রেশনে শাখায় কর্মরত। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর আগে কদমতলীতে রাজনৈতিক নেতার ওপর ছুরিকাঘাত এবং সম্প্রতি কাফরুলে সশস্ত্র হামলায় এক যুবদলকর্মী নিহত ও দুই পথচারী গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি কতটা বেড়েছে, সেটিও সামনে নিয়ে এসেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কাফরুলের ঘটনাটিতে কেবল ব্যক্তিগত বিরোধ নয়, এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও স্থানীয় নির্বাচনী সমীকরণের বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে। হামলার মূল লক্ষ্য অন্য একজন রাজনৈতিক কর্মী হলেও গুলিতে নিহত হন ইউসুফ আলী ওরফে পারভেজ। ঘটনাস্থল থেকে এক সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে এবং অস্ত্র উদ্ধারের দাবি করেছে পুলিশ। তদন্তকারীদের ধারণা, হামলায় একাধিক অস্ত্রধারী অংশ নিয়েছিল এবং তাদের সহযোগীরাও আশপাশে অবস্থান করছিল।

এদিকে রাজধানীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে মতিঝিল এলাকায় একটি শক্তিশালী ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) উদ্ধারের ঘটনা। পুলিশ জানায়, একটি ছাতার সঙ্গে এমনভাবে বিস্ফোরকটি সংযুক্ত ছিল যে, ছাতা খুললেই বিস্ফোরণ ঘটতে পারত। ওই সময় একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রা ওই পথ অতিক্রম করে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্ভাব্য বড় দুর্ঘটনা অল্পের জন্য এড়ানো গেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন এই ছয় মাসে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ১২২টি হত্যা মামলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ২০ জনেরও বেশি মানুষ হত্যার শিকার হয়েছেন। এসব মামলায় ১৭৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও আদালতে অভিযোগপত্র জমা পড়েছে মাত্র ৯টি মামলায়। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এ চিত্রই বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজধানীতে হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বড় কারণ পূর্বশত্রুতা। এরপর রয়েছে পারিবারিক কলহ, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, রাজনৈতিক সংঘাত, আধিপত্য বিস্তার, ছিনতাই, ধর্ষণের পর হত্যা, পরকীয়াজনিত বিরোধ এবং যৌতুকসংক্রান্ত সহিংসতা। চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন মাসে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে জুনে ২৫টি হত্যার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

গত ছয় মাসে কয়েকটি হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। শিশু হত্যা থেকে শুরু করে লাশ টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলার মতো ঘটনাও ঘটেছে রাজধানীতে। তদন্তে পারিবারিক বিরোধ, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, কোথাও পরিকল্পিত অপরাধচক্রের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, অপরাধের ধরন আগের তুলনায় আরও সংগঠিত ও পরিকল্পিত রূপ নিচ্ছে।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়। সংঘাতপ্রবণ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে আগভাগে শনাক্ত করা, গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত এবং দ্রুত বিচার করা না গেলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জন কঠিন হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি (অপরাধ-বিজ্ঞান) বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজধানীতে এখন অপরাধের চরিত্র বদলে গেছে। আগে অর্থনৈতিক সংকট বা মাদককেন্দ্রিক অপরাধের প্রাধান্য থাকলেও বর্তমানে পেশাদার অপরাধী চক্রের সক্রিয়তা বেড়েছে। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে অপরাধ দমন আর কার্যকর হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার, আধুনিক তদন্তব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।’

অন্যদিকে পুলিশ বলছে, প্রতিটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযুক্তদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। তবে ফরেনসিক বিশ্লেষণ, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং প্রযুক্তিগত তদন্ত সম্পন্ন করতে সময় লাগছে। তদন্তের স্বার্থে অনেক তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। তবে নাগরিকদের প্রশ্ন ভিন্ন। তাদের মতে, একের পর এক হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে অপরাধীরা এখনো প্রকাশ্যে সহিংসতা চালাতে সাহস পাচ্ছে। রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক, আবাসিক এলাকা কিংবা জনসমাগমপূর্ণ স্থানে গুলিবর্ষণ ও হামলার ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে স্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, রাজধানীতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযানে নয়, প্রতিরোধমূলক কৌশলেই এখন বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। দ্রুত তদন্ত, সময়মতো অভিযোগপত্র, কার্যকর বিচার এবং সংঘাতের উৎস চিহ্নিত করে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া গেলে হত্যাকাণ্ডের প্রবণতা কমতে পারে।