কেন বিদেশের চিকিৎসায় আস্থা বিসিবির

গ্রেড-২ সাইড স্ট্রেইনের চোটে আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সফর শেষ হয়ে গেছে বাংলাদেশের নাহিদ রানার। তবু সবার আগে অস্ট্রেলিয়ায় গেছেন তিনি। গতকাল পার্থের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন এই ডানহাতি পেসার। তার সঙ্গে গেছেন তাসকিন আহমেদ। তবে নাহিদের মতো সিরিজ থেকে ছিটকে যাননি তিনি। দুজন অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসার জন্য গেছেন। সেখান থেকে নাহিদ দেশে ফিরে আসবেন, তাসকিন যোগ দেবেন ডারউইনে টেস্ট দলের সঙ্গে। দুই ম্যাচের এই সিরিজ শেষ হলে টেস্ট দলের অধিনায়ক নাজমুল হোসেনও অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসা নেবেন। বিসিবির মেডিক্যাল বিভাগ থেকে জানা গেছে, পুরনো চোটের জন্য এই তিন ক্রিকেটার সেখানকার ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন।

অর্থাৎ, সাইড স্ট্রেইনের চোট সারাতে যাননি নাহিদ। দুই পায়ে ক্রনিক শিনবোন আছে এই গতি তারকার। এতে পায়ের শিনবোন বা টিবিয়ার ভেতরের অংশে সবসময় ব্যথা অনুভব করেন তিনি। এটা অবশ্য তার পুরনো রোগ। জাতীয় দলে আসার আগে থেকেই এসব ‘ম্যানেজ করে’ চলছেন নাহিদ। অস্ট্রেলিয়ায় এই সমস্যার জন্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে গেছেন। তাসকিন গেছেন তার ‘ওল্ড ক্রনিক অ্যাঙ্কেল পেইন’ সমস্যা নিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে গোড়ালির সমস্যায় ভুগছেন তিনি। এজন্য টানা খেলার মধ্যে থাকতে পারেন না। বিশ্রাম দিয়ে খেলাতে হয় তাসকিনকে। এদিকে শান্ত অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসককে পুরনো হাঁটুর চোট দেখিয়ে আসবেন। এসবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, যারা অনেক দিন ধরে একই রোগে ভুগছেন, তারা অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।’

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, কেন সবকিছুতেই বিদেশমুখী হতে হয় ক্রিকেটারদের? বিসিবির মেডিক্যাল বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডাক্তার মাহবুব আহমেদ শামীম বলেন, ‘সবার ধারণা যে, ক্রিকেট বোর্ডের কোটি কোটি টাকা আছে। সুতরাং বিদেশে যেতে অসুবিধা কী!’ কিন্তু লিটন দাসের কাফ মাসলের চোট নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটে রীতিমতো লঙ্কাকাণ্ড হয়ে গেল। সংবাদমাধ্যমে এমন খবরও এসেছে যে, দেশে করানো দুটি পরীক্ষায় লিটনের চোট ধরা পড়েনি। অথচ সিঙ্গাপুরে গিয়ে স্পষ্ট হয়, সূক্ষ্ম চোট আছে লিটনের। এমন দাবিকেও উড়িয়ে দেন শামীম, ‘আমাদের মেডিকেল দিক থেকে কোনো সমস্যা হয়নি। সিঙ্গাপুরে গেছে কেন, এখন সেটা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে তো, এজন্য এগুলো (দেশে কিছু পাওয়া যায়নি) বলছে। আমি নিজেও ডাক্তার। আমার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আছে।’

বিসিবির একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দেশে করানো স্ক্যানেও সমস্যা ধরা পড়ে লিটনের। মেডিক্যাল বিভাগের এক সদস্য বলেন, ‘দুই জায়গায়ই চোটের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। স্ক্যানিংয়ের রিপোর্ট তো ভুল হয় না। সমস্যা যেটা হয়, এমআরআই টেকনিশিয়ানদের পজিশনিং ঠিক থাকে না।’ তবে দেশে করানো পরীক্ষার ফল অনুযায়ী ৮ জুলাইয়ের মধ্যে সেরে ওঠার কথা ছিল এই উইকেটরক্ষক ব্যাটারের। এজন্য একমাত্র টেস্ট ও প্রথম ওয়ানডেতে তাকে খেলানোর ঝুঁকি নেয় টিম ম্যানেজমেন্ট। পরের দুই ওয়ানডে খেলে লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগে যাওয়ার কথা ছিল তার। টিম ম্যানেজমেন্টের এক সদস্য বলেন, ‘কোনো খেলোয়াড়ই শতভাগ ফিট থাকে না। মাঝেমধ্যে দেশের স্বার্থে, দলের স্বার্থে হিসাব-নিকাশ করে ঝুঁকি নিতে হয়। লিটনের ক্ষেত্রেও একই ঝুঁকি নেওয়া হয়। টিম ম্যানেজমেন্ট, মেডিক্যাল বিভাগ, ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগ, প্রধান কোচ, নির্বাচক প্যানেল সবার সঙ্গেই আলোচনা হয়।’ নাম প্রকাশ করতে না চেয়ে ভিন্ন দাবি করেন আরেকজন, ‘লিটন জিম্বাবুয়েতে খেলতেই চাননি। চোট থেকে সেরে ওঠাই লক্ষ্য ছিল তার। এর আগে ২টি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলতে পারেনি। এবার ৩ নম্বরটা মিস করতে চাচ্ছিল না। কিন্তু বোর্ড চেয়েছিল, শুধু সম্ভব হলে ওয়ানডেতে খেলানোর। চাইলে লিটন জিম্বাবুয়েতে খেলতে পারত। কিন্তু ইনজুরি আরও বেড়ে যেত।’

দেশে ফিরে সিঙ্গাপুরে যাওয়ার পর দেখা যায়, যে চোট ৮ জুলাই ভালো হওয়ার কথা, সেটা আরও ২ সপ্তাহ পরও ঠিক হয়নি। এজন্য নতুন করে চিকিৎসা শুরু করতে হয়েছে লিটনের। এতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সিরিজের প্রথম টেস্ট থেকে বাদ পড়েছেন, শেষ টেস্টেও তাকে নিয়ে শঙ্কা আছে।

ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট বোর্ডের মেডিকেল বিভাগে আলাদা আলাদা চোটের জন্য আলাদা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আছেন। কাঁধের চোট সারাতে একজন কাজ করেন, হাঁটুর চোট ঠিক করেন আরেকজন ডাক্তার। কিন্তু বিসিবিতে কোনো বিশেষজ্ঞা ডাক্তার নেই, সবাই স্পোর্টস ফিজিশিয়ান। এজন্য সমস্যা খুঁজে বের করতে দেশের বাইরে ছুটতে হয়। এমনকি চোটের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বিসিবির নিজস্ব কোনো ল্যাব নেই, আলাদা স্পোর্টস রেডিওলজিস্টও নেই, যিনি এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআই এর ছবিগুলো পর্যালোচনা করবেন। অর্থাৎ, খেলোয়াড়দের চোট পরীক্ষার জন্য সাধারণ হাসপাতালে ছুটতে হয় মেডিক্যাল বিভাগকে। সেখানে আর দশজন সাধারণ রোগীর মতোই ক্রিকেটারদের চোটগুলো পরীক্ষা করা হয়। খুব গভীরে বা আলাদা করে কিছু শনাক্ত করা যায় না। এজন্য বেশিরভাগ সময় ক্রিকেটারদের ছোট চোট নিয়েও বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয় বিসিবিকে, যেখানে খেলোয়াড়দের জন্য আলাদা চিকিৎসাব্যবস্থা আছে।

আগামীতে যেন বিসিবিতেই এসব সমাধান করা যায়, সে প্রতিশ্রুতি মেডিকেল বিভাগের চেয়ারম্যান শামীমের কণ্ঠে, ‘বিসিবির মেডিকেল বিভাগ নিয়ে আমার অনেক পরিকল্পনা আছে। ছেলেদের জাতীয় দল, মেয়েদের দল বা অন্যান্য খেলোয়াড়রা ভালো সুযোগ-সুবিধা তো পাবেই। পাশাপাশি অন্যান্য খেলোয়াড়রাও যাতে ভালো চিকিৎসা পায়, স্পোর্টস মেডিসিন এগিয়ে যায়, দেশের উপকার হয় এমন চিন্তাভাবনা করছি।’