দেশের বেসরকারি উচ্চশিক্ষার অঙ্গনে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা এবং চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান। চট্টগ্রামের উচ্চশিক্ষার বর্তমান বাস্তবতা, গবেষণার সংকট, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দেশ রূপান্তর-এর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের ফটো সাংবাদিক আকমাল হোসেন
দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ভাবনা কীভাবে এলো?
সাঈদ আল নোমান : ২০০১ সালের দিকে উপলব্ধি করি, চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বড় ঘাটতি রয়েছে। আমার শিকড় এই অঞ্চলে, আমাদের পরিবারও প্রায় দেড়শ বছর ধরে শিক্ষা ও সমাজসেবার সঙ্গে যুক্ত। তাই মনে হয়েছে, চট্টগ্রামকে কিছু ফিরিয়ে দেওয়া আমার দায়িত্ব। আমি রাজনীতিকে কখনো পেশা হিসেবে দেখিনি; এটি মানুষের সেবার একটি মাধ্যম। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির যাত্রা।
দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রামের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
সাঈদ আল নোমান : সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার মান ধরে রাখা এবং গবেষণার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় রাখতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ সব সময় সহজ হয় না। তবু মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
দেশ রূপান্তর : গবেষণা ও প্রযুক্তিতে চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীরা এখনো কেন প্রত্যাশিত জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি?
সাঈদ আল নোমান : এটি শুধু চট্টগ্রামের নয়, দেশের উচ্চশিক্ষার একটি কাঠামোগত সমস্যা। দীর্ঘদিন আমরা পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও সনদনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে ছিলাম। ফলে অনেক শিক্ষার্থী ভালো ফল করলেও গবেষণা, উদ্ভাবন, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে না।
বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই গবেষণা, উদ্ভাবন, স্টার্টআপ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পায়। আমাদেরও সেই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীদের মেধার কোনো ঘাটতি নেই। প্রয়োজন আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, দক্ষ শিক্ষক এবং শিল্প খাতের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ। এই সুযোগ তৈরি করা গেলে আগামী এক দশকে চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও গবেষণার অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দেশ রূপান্তর : সরকার ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় একসঙ্গে কাজ করলে কী ধরনের পরিবর্তন সম্ভব?
সাঈদ আল নোমান : আমি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতিযোগী নয়, অংশীদার হিসেবে দেখি। উভয় খাতের লক্ষ্য এক দেশের জন্য দক্ষ, যোগ্য ও মানবিক জনশক্তি তৈরি করা। গবেষণা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ল্যাব সুবিধা, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব এবং শিল্প খাতের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ বাড়ানো গেলে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
দেশ রূপান্তর : শিক্ষার্থীদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা কমাতে কী করা প্রয়োজন?
সাঈদ আল নোমান : বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা ইতিবাচক। তবে আমাদের এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ দেশেই পায়। আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষক, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম এবং শিল্প-শিক্ষা সংযোগ শক্তিশালী করা গেলে অনেক মেধাবী তরুণ দেশেই নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারবে।
দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রাম দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। কিন্তু উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় এখনো ঢাকা-কেন্দ্রিকতা রয়েছে। এই বৈষম্য দূর করতে কী প্রয়োজন?
সাঈদ আল নোমান : চট্টগ্রামের সম্ভাবনা অপরিসীম। এখানে সমুদ্রবন্দর, শিল্পাঞ্চল, ব্লু-ইকোনমি, লজিস্টিকস ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুযোগ রয়েছে। এগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও পাঠক্রমের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সরকারি সহায়তা, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়লে চট্টগ্রাম শুধু দেশের নয়, পুরো অঞ্চলের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
দেশ রূপান্তর : গবেষণা কেন এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
সাঈদ আল নোমান : বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব শুধু জ্ঞান বিতরণ নয়, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। গবেষণাই একটি জাতিকে এগিয়ে নেয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প কিংবা প্রযুক্তি প্রতিটি ক্ষেত্রেই গবেষণা উন্নয়নের ভিত্তি। ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটিতে গত এক বছরে প্রায় ৪০টি আন্তর্জাতিক মানের ছ১ ও ছ২ গবেষণাপত্র প্রকাশ হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য শুধু নিজেদের উন্নয়ন নয়; চট্টগ্রামকে গবেষণার একটি শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
দেশ রূপান্তর : প্রযুক্তির এই সময়ে শিক্ষার্থীদের কোন দক্ষতাগুলো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন?
সাঈদ আল নোমান : প্রযুক্তিকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও), অটোমেশন, ডেটা সায়েন্স ও ডিজিটাল প্রযুক্তি এখন ভবিষ্যতের বিষয় নয়, বর্তমানের বাস্তবতা। তাই শুধু ভালো ফল করলেই হবে না; সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং আজীবন শেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় কতটা সম্ভাবনা দেখেন?
সাঈদ আল নোমান : আমি চাই চট্টগ্রামের একজন শিক্ষার্থী কানাডা, চীন কিংবা ইউরোপের একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে একই টেবিলে বসে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করুক। এজন্য আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, ইংরেজিতে যোগাযোগ দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং গবেষণামনস্কতা অপরিহার্য। আমি সবসময় বলি, শিক্ষা শুধু মেরুদ- নয়, শিক্ষাই অক্সিজেন। শিক্ষা ছাড়া ব্যক্তি, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রকোনোটিই টেকসইভাবে এগোতে পারে না।
দেশ রূপান্তর : বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে যে দূরত্ব রয়েছে, সেটি কীভাবে কমানো সম্ভব?
সাঈদ আল নোমান : আমাদের উচ্চশিক্ষার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো
ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া গ্যাপ। বিশ্ববিদ্যালয়ে যা শেখানো হয়, শিল্প খাতের চাহিদার সঙ্গে অনেক সময় তার পুরোপুরি মিল থাকে না। এই ব্যবধান কমাতে নিয়মিত সংলাপ, যৌথ গবেষণা, ইন্টার্নশিপ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা এবং বাস্তবভিত্তিক পাঠক্রম প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আগে সমস্যাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে হবে; তাহলেই কার্যকর সমাধান সম্ভব।
দেশ রূপান্তর : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে?
সাঈদ আল নোমান : আমি AI-কে হুমকি হিসেবে দেখি না; এটি একটি বড় সুযোগ। প্রযুক্তি অনেক প্রচলিত কাজের ধরন বদলে দেবে, আবার নতুন ধরনের পেশাও তৈরি করবে। যারা প্রযুক্তিকে ভয় পাবে, তারা পিছিয়ে পড়বে; আর যারা প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে শিখবে, তারাই এগিয়ে থাকবে। তাই এখন থেকেই AI Literacy, Data Analytics, Machine Learning, Cyber Security এবং Digital Ethics-এর মতো বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তুলতে হবে। পাশাপাশি সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব, সমালোচনামূলক চিন্তা ও মানবিকতার মতো গুণাবলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলোর বিকল্প কোনো প্রযুক্তি হতে পারে না।
দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রামকে দেশের অন্যতম উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ হিসেবে গড়ে তুলতে কী করা প্রয়োজন?
সাঈদ আল নোমান : চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় শক্তি এর বন্দর, শিল্পাঞ্চল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং ভৌগোলিক অবস্থান। এই সম্ভাবনাকে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা এবং সরকারের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে উঠলে চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের নয়, দক্ষিণ এশিয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। আমি চাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী ও গবেষকরা একদিন উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য চট্টগ্রামকে বেছে নিক।
দেশ রূপান্তর : আপনার দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্ন কী? আগামী ১০-১৫ বছরে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে কোথায় দেখতে চান?
সাঈদ আল নোমান : উন্নয়নের কোনো শেষ গন্তব্য নেই। প্রতিটি অর্জনই নতুন পথচলার শুরু। আমার স্বপ্ন, বাংলাদেশে এমন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠুক, যেগুলো শুধু জ্ঞান বিতরণ করবে না, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করবে। গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা হবে সেই পথচলার মূল শক্তি। আমি চাই, এই অঞ্চলের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক গবেষণা, উদ্ভাবন, স্টার্টআপ এবং শিল্প খাতের সহযোগিতার কেন্দ্র হয়ে উঠুক। আমি চট্টগ্রামকে শুধু বন্দরনগরী হিসেবে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার একটি Knowledge and Innovation Hub হিসেবে দেখতে চাই।