অল্প বয়সে দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পেয়েছেন চট্টগ্রামের কিশোরী উম্মে মাইসুন। কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ইংরেজি শিক্ষক ও ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখো মানুষের কাছে পরিচিত মুখ। ইংরেজি শিক্ষাকে জটিল ও ভীতিকর বিষয় থেকে বের করে সহজ, আনন্দময় এবং ব্যবহারিকভাবে উপস্থাপন করাই তার মূল লক্ষ্য। ছোট ছোট ভিডিওর মাধ্যমে তিনি হাজারো শিক্ষার্থীকে ইংরেজি শেখার প্রতি আগ্রহী করে তুলেছেন এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলতে উৎসাহ জুগিয়েছেন।
চট্টগ্রাম থেকেই নিজের কাজকে বিশ্বপরিসরে পৌঁছে দিয়ে তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করেছেন মাইসুন। প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা ও জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়, তারও অনন্য উদাহরণ তিনি। সম্প্রতি দেশ রূপান্তর-এর সঙ্গে আলাপকালে নিজের পথচলা, ইংরেজি শেখানোর উদ্যোগ, কনটেন্ট তৈরির অভিজ্ঞতা, চট্টগ্রাম নিয়ে স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের ফটো সাংবাদিক আকমাল হোসেন
দেশ রূপান্তর : আপনার ইংরেজি শেখার শুরুটা কীভাবে?
উম্মে মাইসুন : আমার বয়স তখন সাত বছর। ইংল্যান্ডে থাকা দুই কাজিন খুব ভালো ইংরেজি বলতে পারত। কিন্তু আমি তাদের সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলতে পারতাম না। সেই অক্ষমতাই আমার মধ্যে এক ধরনের জেদ তৈরি করে। এরপর ইউটিউব, গল্পের বই এবং বিভিন্ন ইংরেজি কনটেন্ট দেখে নিজে নিজেই শেখা শুরু করি। ধীরে ধীরে ইংরেজিতে কথা বলার আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়।
দেশ রূপান্তর : মাত্র নয় বছর বয়সে ইংরেজি শেখানো শুরু করেছিলেন। তখন কি ভেবেছিলেন, এটি একদিন এত বড় প্ল্যাটফর্মে পরিণত হবে?
উম্মে মাইসুন : একেবারেই না। করোনাকালে বাসায় বসে মনে হলো, আমাদের দেশের অনেক শিক্ষার্থী ইংরেজি ভীতির কারণে পিছিয়ে থাকে। বাবা পরামর্শ দিলেন, এমন কিছু করতে যা অন্যদের উপকারে আসে। তখন বার্বি ডল ব্যবহার করে সহজ ইংরেজি কথোপকথনের একটি ভিডিও তৈরি করি। সেটিই ছিল আমার প্রথম ভিডিও। পরে সেটি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় সাড়ে চার কোটি ভিউ পায়। তখনো ভাবিনি, এটি একদিন এত বড় একটি প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠবে।
দেশ রূপান্তর : ইংরেজি ভীতি দূর করতে ‘মাইসুন ওয়ার্ল্ড’-এর ভূমিকা কী বলে মনে করেন?
উম্মে মাইসুন : আমি সব সময় ছোট ছোট শব্দ, বাক্য এবং দৈনন্দিন জীবনের উদাহরণ দিয়ে শেখানোর চেষ্টা করি। এতে সব বয়সের মানুষ সহজেই বিষয়গুলো বুঝতে পারে। অনেকে জানিয়েছেন, শুধু আমার ভিডিও দেখে তারা ইংরেজিতে কথা বলার সাহস পেয়েছেন। কোথাও দেখা হলে অনেক শিক্ষার্থী এসে সেই অভিজ্ঞতার কথা বলে। এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
দেশ রূপান্তর : কোনো কোচিং বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই এত ভালো ইংরেজি শিখলেন কীভাবে?
উম্মে মাইসুন : আমার সবচেয়ে বড় শিক্ষক ছিল ইউটিউব। কার্টুন দেখতাম, বিদেশি কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ভিডিও দেখতাম, তারপর সেগুলো বাবা, ভাই কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে অনুশীলন করতাম। নিয়মিত শুনেছি, বলেছি এবং ভুল করতে ভয় পাইনি। এভাবেই শেখা।
দেশ রূপান্তর : আমাদের দেশে ইংরেজি শেখানোর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা কোথায়?
উম্মে মাইসুন : আমরা ইংরেজিকে এখনো পরীক্ষার বিষয় হিসেবে দেখি। ফলে শুরু থেকেই শিশুদের ওপর গ্রামারের চাপ দেওয়া হয়। এতে তারা ভাষাটিকে ভয় পেতে শুরু করে। অথচ ভাষা শেখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো শুনে, দেখে এবং কথোপকথনের মাধ্যমে শেখা। ইংরেজি যদি আনন্দের সঙ্গে শেখানো যায়, তাহলে শিশুরা অনেক দ্রুত শিখবে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলতে পারবে।
দেশ রূপান্তর : এখন অনেকেই আপনার মতো ইংরেজি শেখানোর কনটেন্ট তৈরি করছেন। বিষয়টি কীভাবে দেখেন?
উম্মে মাইসুন : আমি বিষয়টি খুব ইতিবাচকভাবে দেখি। কারণ আমাদের সবার লক্ষ্য একটাইআরও বেশি মানুষকে ইংরেজিতে দক্ষ করে তোলা। যদি আমার কাজ অন্যদের অনুপ্রাণিত করে, সেটি আমার জন্য আনন্দের। যত বেশি মানসম্মত কনটেন্ট তৈরি হবে, তত বেশি মানুষ উপকৃত হবে।
দেশ রূপান্তর : আপনি জনপ্রিয় শিক্ষাবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম টেন মিনিট স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক হিসেবেও কাজ করেছেন। অভিজ্ঞতাটি কেমন ছিল?
উম্মে মাইসুন : আমার প্রথম ভিডিও জনপ্রিয় হওয়ার পর টেন মিনিট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা আয়মান সাদিক ভাইয়া সেটি দেখেন। পরে তিনি আমার বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং অনলাইন ক্লাসের জন্য আমাকে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দেন। করোনাকালে তাদের নির্ধারিত বিষয় নিয়ে ভিডিও তৈরি করতাম। সে সময় মুনজেরিন আপুর সঙ্গে সমন্বয় করেও কাজ করেছি। ২০২২ সাল পর্যন্ত টেন মিনিট স্কুলের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। পরে নিজের কনটেন্ট তৈরিতে বেশি মনোযোগ দেওয়ার জন্য সেখান থেকে সরে আসি।
দেশ রূপান্তর : অনেক অভিভাবক সন্তানদের অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। আপনার ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্নভাবে কাজে লেগেছে। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
উম্মে মাইসুন : আসলে প্রযুক্তির ভালো ও খারাপদুই দিকই আছে। নিয়ন্ত্রিত ও সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে স্ক্রিন টাইম শিক্ষার একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। আমি ছোটবেলা থেকে ইউটিউব, কার্টুন এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক কনটেন্ট দেখে ইংরেজি শেখা শুরু করি। অভিভাবকরা চাইলে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ব্যবহার করে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও শিক্ষামূলক কনটেন্ট বেছে দিতে পারেন।
দেশ রূপান্তর : কনটেন্ট তৈরির শুরুতে নেতিবাচক মন্তব্য বা সাইবার বুলিংয়ের মুখে পড়েছেন?
উম্মে মাইসুন : হ্যাঁ, পড়েছি। আমার প্রথম ভিডিও যখন প্রকাশ করি, তখন আমার বয়স মাত্র নয় বছর। সে সময় অনেকে বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে উপহাস করেছেন। এমনকি কেউ কেউ ভিডিও নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তবে আমি মনে করি, ভালো কোনো কাজ করতে গেলে বাধা আসবেই। সেগুলোকে ইতিবাচক শক্তিতে পরিণত করে সামনে এগিয়ে যেতে হয়।
দেশ রূপান্তর : মাত্র ১১ বছর বয়সে বই প্রকাশ করেছেন। লেখালেখির আগ্রহ কীভাবে তৈরি হলো?
উম্মে মাইসুন : ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার প্রতি আমার আগ্রহ ছিল। হ্যারি পটার সিরিজসহ অনেক গল্প ও উপন্যাস পড়েছি। বিভিন্ন লেখকের বই পড়ে আমার মনে হয়েছে, নিজের চিন্তাগুলোও পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া উচিত। সেই ভাবনা থেকেই ‘ছোটদের স্পোকেন ইংলিশ’ বই লেখা শুরু করি। পরে এর চারটি খ- প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি ইংরেজিতে দুটি উপন্যাসও লিখেছি‘দ্য এমারেলেন্ড স্টোন’ এবং ‘আনওয়ান্টেড রিভেঞ্জ’।
দেশ রূপান্তর : লেখক নাকি শিক্ষককোন পরিচয়টি আপনার কাছে বেশি প্রিয়?
উম্মে মাইসুন : আমি দুটো পরিচয়ই উপভোগ করি। শেখানো এবং লেখালেখিদুটিই মানুষের কাছে জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম। তাই দুটোকেই সমানভাবে এগিয়ে নিতে চাই।
দেশ রূপান্তর : কিশোরীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়েও আপনার কিছু উদ্যোগ রয়েছে। সে বিষয়ে বলবেন?
উম্মে মাইসুন : আমাদের সমাজে নারীদের স্বাস্থ্য নিয়ে অনেক বিষয় এখনো ট্যাবু হিসেবে দেখা হয়। বিশেষ করে মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে। সেই জায়গা থেকে কাজ করার চেষ্টা করেছি। ফয়’স লেক এলাকার একটি বস্তিতে গাইনি চিকিৎসকের সহযোগিতায় প্রায় ৩৫ জন নারীকে মাসিক স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে সচেতন করেছি এবং স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারে উৎসাহ দিয়েছি। ভবিষ্যতেও এ ধরনের কাজ চালিয়ে যেতে চাই।
দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রামকে আপনার কাজের মাধ্যমে কোথায় দেখতে চান?
উম্মে মাইসুন : আমার স্বপ্ন, চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীরা যেন ভয় নয়, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলতে পারে। এ জন্য চট্টগ্রাম থেকেই একটি আধুনিক শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চাই। একটি নিজস্ব স্টুডিও ও লাইভ ক্লাসরুমের মাধ্যমে দেশের আরও বেশি শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছাতে চাই।
এ ছাড়া ইংরেজি শেখাকে আরও সহজ করতে একটি ওয়েবসাইট তৈরির কাজ করছি। সেখানে শিক্ষার্থীরা ইংরেজি শেখার বিভিন্ন উপকরণ ও প্রয়োজনীয় তথ্য পাবে। তবে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পাশাপাশি পড়াশোনা শেষ করাকেও আমি সমান গুরুত্ব দিচ্ছি। কারণ জ্ঞানার্জনই ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ তৈরি করবে।